সন্ধ্যার সময় সে একটা নতুন বাংলা থিয়েটারে গেল শুধু বাংলা গান শোনার লোভে। বেশি দামের টিকিট কিনিয়া রঙ্গমঞ্চের ঠিক সম্মুখের সারির আসনে বসিয়া পুলকিত ও উৎসুক চোখে সে চারিদিকের দর্শকের ভিড়টা দেখিতেছিল। একটা অঙ্কের শেষে সে বাহিরে আসিল, ফুটপাতে একজন বুড়ি পান বিক্রি করিতেছে, অপুকে বলিল, বাবু, পান নেবেন না? নেন না! অপু ভাবিল, সবাই মিঠে পান কিনছে বড়ো আয়নাওয়ালার দোকান থেকে। এ বুড়ির পান বোধ হয় কেউ কেনে না-আহা, নিই এর কাছ থেকে।
সকলেরই উপর কেমন একটা করুণার ভাব, সবারই উপর কেমন একটা ভালোবাসা, সহানুভূতির ভাব-অপুর মনের বর্তমান অবস্থায় বুড়ি পানওয়ালী হাত পাতিয়া দশটা টাকা চাহিয়া বসিলেও সে তৎক্ষণাৎ তাহা দিতে পারিত।
দ্বিতীয় অঙ্কের শেষে সে বাহির হইয়া বুড়িটার কাছে পান কিনিতে যাইতেছে, এমন সময় পিছনের আসনের দিকে তাহার নজর পড়িল।
সে একটু আগাইয়া গিয়া কাঁধে হাত দিয়া বলিল—সুরেশ্বরদা, চিনতে পারেন?
কলিকাতায় প্রথম ছাত্র-জীবনের সেই উপকারী বন্ধু সুরেশ্বরদা, সঙ্গে একটি তরুণী মহিলা। সুরেশর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল-গুডনে গ্রেসাদ। আমাদের সেই অপূর্ব না?
অপূর্ব হাসিয়া বলিল—কেন, সন্দেহ হচ্ছে নাকি? ওঃ, কত দিন পরে আপনার সঙ্গে, ওঃ?
—দেখে সন্দেহ হবার কথা বটে। মুখের চেহারা বদলেছে, রঙটা একটু তামাটে—যদিও you are as handsome as ever—ও, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিইনি আমার বেটার-হাফআর ইনি আমার বন্ধু অপূর্ববাবু–কবি, ভাবুক, লেখক, ভবঘুরে অ্যান্ড হোয়াট নট-তারপর, কোথায় ছিলে এতদিন?
-কোথায় ছিলুম না তা বরং জিজ্ঞেস করুন—in all sorts of places—তবে সভ্যজগৎ থেকে দুরে দুবছর পর কাল কলকাতায় এসেছি। ও ড্রপ উঠল বুঝি, এখন থাক, বলব এখন।
-মোস্ট বাজে প্লে। তার চেয়ে চলল, তোমার সঙ্গে বাইরে যাই
অপু বন্ধুকে সিগারেট দিয়া নিজে সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে বলিল—আপনার এ-সব দেখে একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে, তাই ভালো লাগছে না বোধ হয়। আমার চোখ নিয়ে যদি দেখতেন, তবে ছবছর বনবাসের পর উড়িয়াদের রামযাত্রাও ভালো লাগত। জানেন সুরেশ্বরদা, সেখানে আমার ঘর থেকে কিছু দূরে এক জায়গায় একটা গিরগিটি থাকত—সেটা এবেলা-ওবেলা রঙ বদলাত, দুটি বেলা তাই শখ করে দেখতে যেতুম—তাই ছিল একমাত্র তামাশা, তাই দেখে আনন্দ পেতুম।
রাত সাড়ে নটায় থিয়েটার ভাঙিল। তারপর সে থিয়েটার-ঘর হইতে নিঃসৃত সুবেশ নরনাবীব স্রোতের দিকে চাহিয়া রহিল—এই আলো, লোকজন, সাজানো দোকান-পসার—এসব সে ছেলেমানুষের মতো আনন্দে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতেছিল।
স্ত্রীকে মানিকতলায় শ্বশুরবাড়িতে নামাইয়া দিয়া সুরেশ্বর অপুর সহিত কর্পোরেশন স্ট্রীটের এক রেস্তোরাঁয় গিয়া উঠিল। অপুর কথা সব শুনিয়া বলিল—এই পাঁচ বছর ওখানে ছিলে? মন-কেমন করত না দেশের জন্য?
-Oh, at times। felt so terribly homesick-homesick for Bengal–শেষ দু-বছর দেশ দেখবার জন্য পাগল হয়েছিলুম।
ফুটপাত বাহিয়া কয়েকটি ফিরিঙ্গি মেয়ে হাসি কলরব করিতে করিতে পথ চলিতেছে, অপু সাগ্রহে সেদিকে চাহিয়া রহিল। মানুষের গলার সুর মানুষের কাছে এত কাম্যও হয়। রাস্তাভরা লোকজন, মোটর গাড়ি, পাশের একটি একতলা বাড়িতে সাজানো ােেনো ছোট্ট ঘরে কয়েকটি সাহেবের ছেলেমেয়ে দুটোছুটি করিয়া খেলা করিতেছে—সবই অদ্ভুত, সবই সুন্দর বলিয়া মনে হয়। আলোকোজ্জ্বল রেস্তোরাঁটায় অনবরত লোকজন ঢুকিতেছে, বাহির হইতেছে, মোটর হর্নের আওয়াজ, মোটর বাইকের শব্দ, একখানা রিকশা গাড়ি ঠুং ঠুং করিতে করিতে চলিয়া গেল—অপু চাহিয়া চাহিয়া দেখিতেছিল—যেন এসব সে কখনও দেখে নাই।
সুরেশ্বরকে বলিল—দেখুন জানলার ধারে এসে-ওই যে নক্ষত্রটা দেখছেন, আজ কবছর ধরে ওটাকে উঠতে দেখেছি ঘন বন-জঙ্গল-ভরা পাহাড়ের মাথার ওপরে। আজ ওটাকে হোয়াইটওয়ে লললর বাড়ির মাথার ওপরে উঠতে দেখে কেমন নতুন নতুন ঠেকছে। এই তো পৌনে দশটা রাত? এ সময় গত পাঁচ বৎসর শুধু আমি জঙ্গল পাহাড়—আর ভেড়িয়ার ডাক, কখনও কখনও বাঘের ডাকও। আর কি loneliness! শহরে বসে সে সব বোঝা যাবে না।
সুরেশ্বরও নিজের কথা বলিল। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোন কলেজের অধ্যাপক, বিবাহ করিয়াছে কলিকাতায়। সম্প্রতি শালীর বিবাহ উপলক্ষে আসিয়াছে। বলিল—দ্যাখো ভাই, তোমার ও জীবন একবার আস্বাদ করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু তখন কি জানতুম বিয়ে এমন জিনিস হয়ে দাঁড়াবে? যদি কিছু করতে চাও জীবনে, বিয়ে কোরো না কখনও, বলে দিলুম। বিয়ে করো নি তো?
অপু হাসিয়া বলিল-ওঃ, আমি ভাবছি আপনার এ লেকচার যদি বউদি শুনতেন!…
-না না, শোনো। সত্যি বলছি, সে উনিশ-শো পনেরো সালের সুরেশ্বর আর নই আমি। সংসারের হাড়িকাঠে যৌবন গিয়েছে, শক্তি গিয়েছে, স্বপ্ন গিয়েছে, জীবনটা বৃথা খুইয়েছি কত কি করবার ইচ্ছে ছিল—ওঃ, যেদিন এম.এ. ডিপ্লোমাটা নিয়ে কনভোকেশন হল থেকে বেরুলাম, মনে আছে মাঘের শেষ, গোলদিঘির দেবদারু গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে, সবে দখিনা হাওয়া শুরু হয়েছে, গাউন সমেত এক দোকানে গিয়ে ফটো ওঠালুম, কি খুশি! মনে হল, সারা পৃথিবীটা আমার পায়ের তলায়! ফটোখানা আজও আছে—চেয়ে দেখে ভাবি, কি ছিলুম, কি হয়ে দাঁড়িয়েছি! পাড়াগাঁয়ের কলেজে তিনশো চব্বিশ দিন একই কথা আওড়াই, দলাদলি করি, প্রিন্সিপালের মন জোগাই, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করি, ছেলেদের ডাক্তার দেখাই, এর মধ্যে মেয়ের বিয়ের ভাবনাও ভাবি না না, তুমি হেসো না, এসব ঠাট্টা নয়।
