দেবব্রত পাশে বসিয়া বলিল-রাত জেগে কষ্ট হচ্ছে খুব-না?
–কি এমন কষ্ট, তা ছাড়া দুপুরবেলা আমি ঘুমিয়েছি খুব।
–আচ্ছা, তুমি কনে-চন্দন পরো নি কেন সুনীতি? এখানে সে চলন নেই?
মেয়েটি সলজ্জমুখে বলিল–মা পরাতে বলেছিলেন–
-তবে?
জ্যাঠাইমা বললেন, তুমি নাকি পছন্দ করবে না। দেবব্রত হাসিয়া উঠিয়া বলিল—কেন বল তো—বিলেত-ফেরত বলে? বা তো
পরে সে বলিল—আমি সাত তারিখে পাটনায় যাব, বুঝলে, তোমাকে আর মাকে এসে নিয়ে যাব মাস-দুই পরে, সুনীতি। তোমার বাবাকে বলে রেখেছি।
মেয়েটি নতমুখে বলিল—আচ্ছা একটা কথা বলব? কিছু মনে করবে না?…
–বলো না, কি মনে করব?–
—আচ্ছা, আমার এই পা নিয়ে তুমি যে বিয়ে করলে, যদি আমার পা না সারে? দ্যাখো, তোমার গা ছুঁয়ে সত্যি বলছি আমার ইচ্ছে ছিল না বিয়ের। মাকে কতবার বুঝিয়ে বলেছি, মা, এই তো আমার পায়ের দশা, পরের ওপর অনর্থক কেন বোঝা চাপানো সারাজীবন—তা মা বললেনতুমি নাকি খুব—তোমার নাকি খুব ইচ্ছে। আচ্ছা কেন বলো তো এ মতি তোমার হল?
দেবব্রত বলিল—স্পষ্ট কথা বললে তুমিও কিছু মনে করবে না তো সুনীতি? তাহলে বলি শোন, তোমার এই পায়ের দোষ যদি না হত তবে আমি অন্য জায়গায় বিয়ে করে ফেলতুম—যেদিন থেকে শুনেছি পায়ের দোষের জন্য তোমার বিয়ে এই তিন বছরের মধ্যে হয় নি—সেদিন থেকে আমার মন বলেছে ওখানেই বিয়ে করব, নয় তো নয়। অন্য জায়গায় বিয়ে করলে মনে শান্তি পেতাম না সুনীতি। সেই যে তোমাকে দেখে গিয়েছিলুম, তারপর বিয়ে তখন ভেঙে গেল, কিন্তু তোমার মুখখানা কতবার যে মনে হয়েছে!…কেন কে জানে—আমি কাব্যি করছি নে সুনীতি, ওসব আমার আসে না, আমি সত্যি কথা বলছি।
তারপর সে আজ ওবেলার চাটুজ্যে-বাড়ির বিধবা মেয়েটির কথা বলিল। বলিল—দ্যাখ, এও তো কাব্যের কথা নয়—আজ বিয়ের আসনে বসে কেবলই সেই ছোট মেয়েটার কথা মনে হয়েছে। ছোট পিসিমা তাকে তাড়িয়ে দিয়ে আজ আমার অর্ধেক আনন্দ মাটি করেছেন সুনীতি—তোমার কাছে বলছি, আর কাউকে বোলো না যেন! এ কেউ বুঝবে না, আমার মা-ও বোঝেন নি।
ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া রাত্রি দুইটা বাজিল।
কাজলের মুশকিল বাধে বোজ সন্ধ্যার সময়। খাওয়া-দাওয়া হইয়া গেলে তাহার মামিমা বলেন, ওপরে চলে যাও, শুয়ে পড়ে গিয়ে। কাজল বিপন্নমুখে রোয়াকের কোণে দাঁড়াইয়া শীতে ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে থাকে। ওপরে কেউ নাই, মধ্যে একটা অন্ধকার সিঁড়ি, তাহার উপর দোতলার পাশের ঘবটাতে আলনায় একরাশ লেপকথা বাঁধা আছে। আধ-অন্ধকারে সেগুলো এমন দেখায়!
আগে আগে দিদিমা সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া ঘুম পাড়াইয়া রাখিয়া আসিতেন। দিদিমা আর নাই, মামিমারা খাওয়াইয়া দিয়াই খালাস। সেদিন সে সেজ দিদিমাকে বলিয়াছিল। তিনি ঝংকার দিয়া বলিয়া উঠিলেন, আমার তো আব খেয়েদেয়ে কাজ নেই, এখন তোমায় যাই শোওয়াতে! একা এটুকু আর যেতে পারেন না, সেদিন তো পীরপুরের হাটে একা পালিয়ে যেতে পেরেছিলে? ছেলের ন্যারা দেখে বাচিনে!
নিরুপায় হইয়া ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি বাহিয়া সে উপরে উঠে। কিন্তু ঘরে ঢুকিতে আর সাহস না করিয়া প্রথমটা দোরের কাছে দাঁড়াইয়া থাকে। কোণে কড়ির আলনার নিচে দাদামহাশয়ের একরাশ পুরোনো হুঁকার খোল ও কাদান। এককোণে মিটমিটে তেলের প্রদীপ, তাতে সামান্য একটুখানি আলো হয় মাত্র, কোণের অন্ধকার তাহাতে আরও যেন সন্দেহজনক দেখায়। এখানে একবার আসিলে আর কেহ কোথাও নাই, ছোটমামিমা নাই, ছোটদিদিমা নাই, দলু নাই, টাটি নাই—শুধু সে আর চারিপাশের এই সব অজানা বিভীষিকা। কিন্তু এখানেই বা সে কতক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিবে? ছোটমাসিমা ও বিন্দু ঝি এ ঘরে শোয়, তাহাদের আসিতে এখনও বহু দেরি, শীতের হাওয়ায় হাড়-কাপুনি ধরিয়া যায় যে! অগত্যা সে অন্যান্য দিনের মতো চোখ বুজিয়া ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া নিজের বিছানার উপর উঠিয়া ছোট লেপটা একেবারে মুড়ি দিয়া ফেলে। কিন্তু বেশিক্ষণ লেপ-মুড়ি দিয়া থাকিতে পারে নাঘরের মধ্যে কোন কিছু নাই তো? মুখ খুলিয়া একবার ভীতচোখে চারিধারে চাহিয়া দেখিয়া আবার লেপমুড়ি দেয়—আর যত রাজ্যের ভূতের গল্প কি ঠিক ছাই এই সময়টাতেই মনে আসে?
দিদিমা থাকিতে এসব কষ্ট ছিল না। দিদিমা তাহাকে ঘুম না পাড়াইয়া নামিতেন না। কাজল উপরে আসিয়াই বিছানার উপরকার সাজানো লেপাথার স্তুপের উপর খুশি ও আমোদর সহিত বার বার লাফাইয়া পড়িয়া চেঁচাইতে থাকিত—আমি জলে ঝাপাই—হি-হি-আমি জলে ঝাঁপাই–ও দিদিমা–হি-হি–
কোনোরকমে দিদিমা তাহার লাফানো হইতে নিবৃত্ত করিয়া শোয়াইতে কৃতকার্য হইলে সে দিদিমার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিত,—এইবার এতা গ-গ-অ-ল্প-কথার শেষের দিকে পাতলা রাঙা ঠোঁট দুটি ফুলের কুঁড়ির মতো এক জায়গায় জড়ো করিয়া না আনিলে কথা মুখ দিয়া বাহির হইত না। তাহার দিদিমা হাসিয়া বলিত—যে গুড় খাস, খেয়ে খেয়ে এমনি তোতলা। গল্প বলব, কিন্তু তুমি পাশ ফিরে চুপটি করে শোবে, নড়বেও না, চড়বেও না। কাজল ভূ কুঁচকাইয়া ঘাড় সামনের দিকে নামাইয়া থুতনি প্রায় বুকের উপর লইয়া আসিত। পরে চোখের ভুরু উপবের দিকে উঠাইয়া হাসি-ভরা চোখে চুপ করিয়া দিদিমার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিত। দিদিমা বলিত, দুষ্টুমি কোরো না দাদাভাই, আমার এখন অনেক কাজ, তোমার দাদু আবার এখুনি পাশার আড্ডা থেকে আসবেন, তাকে খেতে দেব। ঘুমোও তত লক্ষ্মী ভাইটি!
