ওঝাজী সুস্বরে রামায়ণের বনবর্ণনা পড়িতেছিল। কি অদ্ভুতভাবে যে চারিপাশের দৃশ্যের সঙ্গে খাপ খায়। নির্জন শালবনে অস্পষ্ট জ্যোৎস্না উঠিয়াছে, তেন্দু ও তিরঞ্জী গাছের পাতাগুলি এক এক জায়গায় ঘন কালো দেখাইতেছে, বনের মধ্যে শিয়ালের দল ডাকিয়া উঠিয়া প্রহর ঘোষণা করিল।
কোথায় রেল, মোটর, এরোপ্লেন, ট্রেড-ইউনিয়ন? ওঝাজীর মুখে আরণ্যকাণ্ডের শ্লোক শুনিতে শুনিতে সে যেন অনেক দূরের এক সুপ্রাচীন জাতির অতীত সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে গিয়া পড়িল একেবারে। অতীতের গিরিতরঙ্গিণী-তীরবর্তী তপোবন, হোমধূমপবিত্র গোধুলির আকাশতলে বিস্তৃত অগ্নিশালা, সুগভাণ্ড, অজিন, কুশ, সমি, জলকলস, চীর ও কৃষ্ণাজিন পবিহিত সজপা মুনিগণের বেদপাঠধ্বনি…ােন্ত গিরিসানু…বনজ কুসুমের সুগন্ধ…গোদাবরীতটে পুন্নাগ নাগকেশরের বনে পুষ্পআহরণরতা সুমুখী আশ্রমবালিকাগণ-কৃশাঙ্গী রাজবধূগণ—ক্ষীণজ্যোৎস্নায় নদীজল আলো হইয়া উঠিযাছে, তীরে স্থলবেতসের বনে ময়ুর ডাকিতেছে,
সে যেন স্পষ্ট দেখিল, এই নিবিড় অজানা অরণ্যানীর মধ্য দিয়া নির্ভীক, কবাটবক্ষ, ধনুষ্পণি প্রাচীন রাজপুত্রগণ সকল বিপদকে অক্রিম করিয়া চলিযাছেন। দূরে নীল মেঘের মতো পরিদৃশ্যমান ময়ুর-নিনাদিত ঘন বন, দুর্গম পথের নানা স্থানে শ্বাপদ রাক্ষসে পূর্ণ খন্দ, গুহা, গহুর, মহাগজ ও মহাব্যাঘ্র দ্বারা অধ্যুষিত-অজানা মৃত্যুসংকুলচারিধারে পর্বতরাজির ধাতুরঞ্জিত শৃঙ্গসকল আকাশে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে—কুন্দগুল্ম, সিন্দুবার, শিরীষ, অর্জুন, শাল, নীপ, বেতস, তিনিশ ও তমাল তরুতে শ্যামায়মান গিরিসানু…শৱদ্বারা বিদ্ধ বুরু ও পৃষত মৃগ আগুনে ঝলসাইযা খাওয়া, বিশাল ইহূদী তবুমূলে সতর্ক রাত্রি যাপন …
ওঝাজী উৎসাহ পাইযা অপুকে একটা পুঁটলি খুলিযা একরাশ সংস্কৃত কবিতা দেখাইলেন, গর্বের সহিত বলিলেন, বাবুজী, ছেলেবেলা থেকেই সংস্কৃত কবিতায় আমার হাত আছে, একবার কাশী-নরেশের সভায় আমার গুরুদেব ঈশ্বরশরণ আমায় নিয়ে যান। একজোড়া দোশালা বিদায় পেয়েছিলাম, এখনও আছে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা। তারপর তিনি অনেকগুলি কবিতা শুনাইলেন, বিভিন্ন ছন্দের সৌন্দর্য ও তাহাতে তাহার রচিত শ্লোকের কৃতিত্ব সকল উৎসাহে বর্ণনা করিলেন। এই ত্রিশ বৎসর ধরিয়া ওঝাজী বহু কবিতা লিখিয়াছেন, ও এখনও লেখেন, সবগুলি সযত্নে সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াও দিয়াছেন, একটিও নষ্ট হইতে দেন নাই, তাহাও জানাইলেন।
একটি অদ্ভুত ধরনের দুঃখ ও বিষাদ অপুর হৃদয় অধিকার করিল। কত কথা মনে আসিল, তাহার বাবা এই রকম গান ও পাঁচালি লিখিতেন তাহার ছেলেবেলায়। কোথায় গেল সে সব? যুগ যে বদল হইয়া যাইতেছে, ইহারা তাহা ধরিতে পারে না। ওঝাজীর এত আগ্রহের সহিত লেখা কবিতা কে পড়িবে? কে আজকাল ইহার আদর করিবে? কোন্ আশা ইহাতে পুরিবে ওঝাজীর? অথচ কত ঐকান্তিক আগ্রহ ও আনন্দ ইহাদের পিছনে আছে। চাঁপদানির পোস্টাফিসে কুড়াইয়া পাওয়া সেই ছোট মেয়েটির নামঠিকানা-ভুল পত্ৰখানার মতোই তাহা ব্যর্থ ও নিরর্থক হইয়া যাইবে।
সকালে উঠিয়া সে ওঝাজীকে একখানা দশটাকার নোেট দিয়া প্রণাম করিল। নিজের একখানা ভালো বাঁধানো খাতা লিখিবার জন্য দিলকাছে আর টাকা বেশি ছিল না, থাকিলে হয়তো আরও দিত। তাহার একটা দুর্বলতা এই যে, যে একবার তাহার হৃদয় স্পর্শ করিতে পারিয়াছে তাহাকে দিবার বেলায় সে মুক্তহস্ত, নিজের সুবিধা-অসুবিধা তখন সে দেখে না।
ডাকবাংলো হইতে মাইল খানেক পরে পথ ক্রমে উপরের দিকে উঠিতে লাগিল, ক্রমে আরও উপরে, উচ্চ মালভূমির উপর দিয়া পথ—শাল, বাঁশ, খয়ের, আবলুসের ঘন অরণ্য-ডাইনে বামে উঁচুনিচু ছোট বড়ো পাহাড় ও টিলা-শালপুষ্পসুরভি সকালের হাওয়া যেন মনের আয়ু বাড়াইয়া দেয়। চতুর্থ দিন বৈকালে অমরকন্টক হইতে কিছু দূরে অপরূপ সৌন্দর্যভূমির সঙ্গে পরিচয় হইল— পথটা সেখানে নিচের দিকে নামিয়াছে, দুই দিকে পাহাড়ের মধ্যে সিকি মাইল চওড়া উপত্যকা, দুধারের সানুদেশের বন অজস্র ফুলে ভরা-পলাশের গাছ যেন জ্বলিতেছে। হাত দুই উঁচু পাথরের পাড়, মধ্যে গৈরিক বালু ও উপল-শয্যায় শিশু শোণ—নির্মল জলের ধারা হাসিয়া খুশিয়া আনন্দ বিলাইতে বিলাইতে ছুটিয়া চলিয়াছে—একটা ময়ুর শিলাখণ্ডের আড়াল হইতে নিকটের গাছের ডালে উঠিয়া বসিল। অপুর পা আর নড়িতে চায় না—তার মুগ্ধ ও বিস্মিত চোখের সম্মুখে শৈশব কল্পনার স্বৰ্গকে কে আবার এভাবে বাস্তবে পরিণত করিয়া খুলিয়া বিছাইয়া দিল!
এত দূরবিসর্পিত দিগবলয় সে কখনও দেখে নাই, এত নির্জনতার কখনও ধারণা ছিল না তাহার—বহুদূরে পশ্চিম আকাশের অনতিস্পষ্ট সুদীর্ঘ নীল শৈলরেখার উপরকার আকাশটাতে সে কি অপরূপ বর্ণসমুদ্র!
কি অপূর্ব দৃশ্য চোখের সম্মুখে যে খুলিয়া যায়। এমন সে কখনও দেখে নাই—জীবনে কখনও দেখে নাই।
এ বিপুল আনন্দ তাহার প্রাণে কোথা হইতে আসে।
এই সন্ধ্যা, এই শ্যামলতা, এই মুক্ত প্রসারের দর্শনে যে অমৃত মাখানো আছে, সে মুখে তাহা কাহাকে বলিবে?…কে তাহার এ চোখ ফুটাইল, এক সাঁঝ-সকালের, সূর্যাস্তের, নীল বনানীর শ্যামলতার মায়া কাজল তাহার চোখে মাখাইয়া দিল?
দূরবিসর্পিত চক্রবালরেখা দিগন্তের যতটুকু ঘিরিয়াছে, তাহারই কোন কোন অংশে, বহুদূরে নেমির শ্যামলতা অনতিস্পষ্ট সান্ধ্যদিগন্তে বিলীন, কোন কোন অংশে ধোঁয়া ধোঁয়া দেখা-যাওয়া বনরেখায় পরিস্ফুট, কোন দিকে সাদা সাদা বকের দল আকাশের নীলপটে ডানা মেলিয়া দূর হইতে দূরে চলিয়াছে…মন কোথাও বাধে না। অবাধ উদার দৃষ্টি, পরিচয়ের গণ্ডি পার হইয়া অদৃশ্য অজানার উদ্দেশে ভাসিয়া চলে…
