ভারি পছন্দ হয় এ জীবন, গল্পের বইয়ে-টুইয়ে যে রকম পড়িত, এ যেন ঠিক তাহাই। খোলা জায়গা পাইলেই ঘোড়া ছাড়িয়া দেয়, গতির আনন্দে সারাদেহে একটা উত্তেজনা আসে; খানাখন্দ, শিলা, পাইওরাইটের স্তুপ কে মানে? নত শালশাখা এড়াইয়া দোদুল্যমান অজানা লতার পাশ কাটাইয়া পৌরুষভরা উদ্দামতার আনন্দে তীরবেগে ঘোড়া উড়াইয়া চলে।
ঠিক এই সব সময়েই তাহার মনে পড়ে—প্রায়ই মনে পড়ে—শীলেদের অফিসের সেই তিনবৎসরব্যাপী বদ্ধ, সংকীর্ণ, অন্ধকার কেরানী-জীবনের কথা। এখনও চোখ বুজিলে অফিসটা সে দেখিতে পায়, বাঁয়ে নৃপেন টাইপিস্ট বসিয়া খটখট করিতেছে, রামধন নিকাশনবিস বসিয়া খাতাপত্র লিখিতেছে, সেই বাঁধানোমোটা ফাইলের দপ্তরটানিকাশনবিসের পিছনের দেওয়ালের চুন-বালি খসিয়া দেখিতে হইয়াছে যেন একটি পূজানিরত পুরুতঠাকুর। রোজ সে ঠাট্টা করিয়া বলিত, ও রামধনবাবু, আপনার পুরুতঠাকুর আজ ফুল ফেললেন না? উঃ, সে কি বদ্ধতা—এখন যেন সেসব একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর সে বাংলোয় ফিরিয়া পাতকুয়ার ঠাণ্ডা জলে স্নান করিয়া এক প্রকার বন্য লেবুর রস মিশানো চিনির শরবত খায়—-গরমের দিনে শরীর যেন জুড়াইয়া যায় তার পরই রামচরিত মিশ্র আসিয়া রাত্রের খাবার দিয়া যায়-আটার রুটি, কুমড়া বা উঁড়সের তরকারি ও অড়হরের ডাল। বারো-তেরো মাইল দূরের এক বস্তি হইতে জিনিসপত্র সপ্তাহ অন্তর কুলিরা লইয়া আসে—মাছ একেবারেই মেলে না, মাঝে মাঝে অপু পাখি শিকার করিয়া আনে। একদিন সে বনের মধ্যে এক হরিণকে বন্দুকের পাল্লার মধ্যে পাইয়া অবাক হইয়া গেল-বড়শিঙ্গা কিংবা সম্বর হরিণ ভারি সতর্ক, মানুষের গন্ধ পাইলে তার ত্রিসীমানায় থাকে না কিন্তু তাহার ঘোড়ার বারোগজের মধ্যে এ হরিণটা আসিল কিরূপে? খুশি ও আগ্রহের সহিত বন্দুক উঠাইয়া লক্ষ করিতে গিয়া সে দেখিল লতাপাতার আড়াল হইতে শুধু মুখটা বাহিব করিয়া হরিণটিও অবাক চোখে তাহার দিকে চাহিয়া আছে-ঘোড়ায় চড়া মানুষ দেখিয়া ভাবিতেছে হয়তো, এ আবার কোন জীব! হঠাৎ অপুর বুকের মধ্যটা ছাঁৎ করিয়া উঠিল–হরিণের চোখ দুটি যেন তাহার খোকার চোখের মতো! অমনি ডাগর ডাগর, অমনি অবোধ, নিষ্পাপ; সে উদ্যত বন্দুক নামাইয়া তখনই টোটাগুলি খুলিয়া লইল। এখানে যতদিন ছিল, আর কখনও শিকারের চেষ্টা করে নাই।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হয় সন্ধ্যার পরেই, তার পরে সে নিজের খড়ের বাংলোর কম্পাউন্ডে চেয়ার পাতিয়া বসে।–অপূর্ব নিস্তব্ধতা! অস্পষ্ট জ্যোৎস্না ও আঁধারে পিছনকার পাহাড়ের গম্ভীরদর্শন অনাবৃত গ্রানাইট প্রাচীরটা কি অদ্ভুত দেখায়। শালকুসুমের সুবাসভরা অন্ধকার, মাথার উপরকার আকাশে অগণিত নৈশ নক্ষত্র। এখানে অন্য কোন সাথী নাই, তাহার মন ও চিন্তার উপর অন্য কাহারও দাবিদাওয়া নাই, উত্তেজনা নাই, উৎকণ্ঠা নাই—আছে শুধু সে, আর এই বিশাল অরণ্যপ্রকৃতির কর্কশ, বন্ধুর বিরাট সৌন্দর্য আর আছে এই নক্ষত্ৰভরা নৈশ আকাশটা।
বাল্যকাল হইতেই সে আকাশ ও গ্রহনক্ষত্রের প্রতি আকৃষ্ট। কিন্তু এখানে তাদের এ কি বুপ! কুলিরা সকাল সকাল খাওয়া সারিয়া ঘুমাইয়া পড়ে-রামচরিত মিশ্র মাঝে মাঝে অপুকে সাবধান করিয়া দেয়, তাম্বুকা বাহার মৎ বৈঠিয়ে বাবুজী—শেরকা বড়া ডর হ্যায়-পরে সে কাঠকুটা জ্বালিয়া প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড করিয়া গ্রীষ্মের রাত্রেও বসিয়া আগুন পোহায়—অবশেষে সেও যাইয়া শুইয়া পড়ে, তাহার অগ্নিকুণ্ড নিভিয়া যায়—স্তব্ধ রাত্রি, আকাশ অন্ধকার…পৃথিবী অন্ধকার… আকাশে বাতাসে অদ্ভুত নীরবতা, আবলুসের তালপাতার ফাঁকে দু-একটা তারা যেন অসীম রহস্যভরা মহাবব্যামের বুকের স্পন্দনের মতো দিদিপ করে, বৃহস্পতি স্পষ্টতর হন, উত্তর-পূর্ব কোণের পর্বতসানুর বনের উপরে কালপুরুষ উঠে, এখানে-ওখানে অন্ধকারের বুকে আগুনের আঁচড় কাটিয়া উল্কাপিণ্ড খসিয়া পড়ে। রাত্রি গভীর হইবার সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রগুলো কি অদ্ভুতভাবে স্থান পরিবর্তন করে! আবলুস ডালের ফাঁকে তারাগুলা ক্রমশ নিচে নামে, কালপুরুষ ক্ৰমে পর্বতসানুর দিক হইতে মাথার উপরকার আকাশে সরিয়া আসে, বিশালকায় ছায়াপথটা তেরছা হইয়া ঘুরিয়া যায়, বৃহস্পতি পশ্চিম আকাশে ঢলিয়া পড়ে। রাত্রির পর রাত্রি এই গতির অপূর্ব লীলা দেখিতে দেখিতে এই শান্ত সনাতন জগৎটা যে কি ভয়ানক রুদ্র গতিবেগ প্রচ্ছন্ন রাখিয়াছে তাহার মিগ্ধতা ও সনাতনত্বের আড়ালে, সে সম্বন্ধে অপুর মন সচেতন হইয়া উঠিল-অতভাবে সচেতন হইয়া উঠিল।…জীবনে কখনও তাহার এত ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় নাই বিশাল নক্ষত্রজগৎটার সঙ্গে, এ-ভাবে হইবার আশাও কখনও কি ছিল?
অপুর বাংলো-ঘরের পিছনে ও দক্ষিণে পাহাড়, পিছনকার পাহাড়তলী আধ মাইলের কম, দক্ষিণের পাহাড় মাইল দূই দূরে। সামনের বহুদূর বিস্তৃত উঁচুনিচু জমিটা শাল ও পপরেল চারা ও একপ্রকার অর্ধশুষ্ক তৃণে ভরা–অনেক দূর পর্যন্ত খোলা। সারা পশ্চিম দিকচক্রবাল জুড়িয়া বহুদুরে, বিন্ধ্য পর্বতের নীল অস্পষ্ট সীমারেখা, ছিলওয়ারা ও মহাদেও শৈলশ্রেণী–পশ্চিমা বাতাসের ধুলাবালি যেদিন আকাশকে আবৃত না করে, সেদিন বড়ো সুন্দর দেখায়। মাইল এগারো দুরে নর্মদা বিজন বনপ্রান্তরের মধ্য দিয়া বহিয়া চলিয়াছে, খুব সকালে ঘোড়ায় উঠিয়া স্নান করিতে গেলে বেলা নয়টার মধ্যে ফিরিয়া আসা যায়।
