বন্ধু হাসিয়া বলিল—এসো এসো, তারপর এতদিন কোথায় ছিলে? কিছু মনে কোরো না ভাই, খারাপ হাত, মাজন তৈরি করছি—এই দ্যাখ না ছাপানো লেবেল–চন্দ্রমুখী মাজন, মহিলা হোম ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিন্ডিকেট—আজকাল মেয়েদের নাম না দিলে পাবলিকের সিমপ্যাথি পাওয়া যায় না, তাই ওই নাম দিয়েছি। বোসো বোসো—ওগো, বার হয়ে এসো না! অপূর্ব এসেছে, একটু চা-টা করো।
অপু হাসিয়া বলিল, সিন্ডিকেটের সভ্য তো দেখছি আপাতত মোটে দুজন, তুমি আর তোমার স্ত্রী এবং খুব যে অ্যাকটিভ সভ্য তাও বুঝছি।
হাসিমুখে বন্ধু-পত্নী ঘর হইতে বাহিরে আসিলেন, তাহার অবস্থা দেখিয়া অপুর মনে হইল, অন্য শিলখানাতে তিনিও কিছু পূর্বে মাজন-পেষা-কার্যে নিযুক্ত ছিলেন। তাহার আসিবার সংবাদ পাইয়া শিল ছাড়িয়া ঘরের মধ্যে পলাইয়াছিলেন। হাত-মুখের গুঁড়া ধুইয়া ফেলিয়া সভ্য-ভব্য হইয়া বাহির হইলেও মাথার এলোমেলো উড়ন্ত চুলে ও কপালের পাশের ঘামে সে কথা জানাইয়া দেয়।
বন্ধু বলিল—কি করি বলল ভাই, দিনকাল যা পড়েছে, পাওনাদারের কাছে দুবেলা অপমান হচ্ছি, ঘোট আদালতে নালিশ করে দোকানের ক্যাশবাক্স সীল করে রেখেছে। দিন একটা টাকা খরচ—বাসায় কোন দিন খাওয়া হয়, কোন দিন
বন্ধু-পত্নী বাধা দিয়া বলিলেন, তুমি ও-কাঁদুনি গেয়ো অন্য সময়। এখন উনি এলেন এতদিন পর, একটু চা খাবেন, ঠাণ্ডা হবেন, তা না তোমার কাঁদুনি শুরু হল।
—আহা, আমি কি পথের লোককে ধরে বলতে যাই? ও আমার ক্লাসফ্রেন্ড, ওদের কাছে। দুঃখের কথাটা বললেও—ইয়ে, পাতা চায়ের প্যাকেট একটা খুলে নাও না? আটা আছে নাকি? আর দ্যাখো, না হয় ওকে খানচারেক রুতি অন্তত—
–আচ্ছা, সে ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না। পরে অপুর দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেনআপনি সেই বিজয়া দশমীর পর আর একদিনও এলেন না যে বড়ো?
চা ও পরোটা খাইতে খাইতে অপু নিজের কথা সব বলিল—শীঘ্রই বাহিরে যাইতেছে সে কথাটাও বলিল। বন্ধু বলিল—তবেই দ্যাখো ভাই, তবু তুমি একা আর আমি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এই কলকাতা শহরের মধ্যে আজ পাঁচ-পাচটি বছর যে কি করে দিন কাটাচ্ছি তা আর—এই সব নিয়ে একরকম চালাই, পয়সা-প্যাকেট চা আছে, খদিরাদি মোক আছে। মাজনের লাভ মন্দ না, কিন্তু কি জানো, এই কৌটোটা পড়ে যায় দেও পয়সার ওপর, মাজনে, লেবেলে, ক্যাপসুলে তাও প্রায় দুপয়সা-তোমার কাছে আর লুকিয়ে • কবব, স্বামী-স্ত্রীতে খাটি কিন্তু মজুরী পোষায় কি? তবুও তো দোকানীর কমিশন ধরি নি হিসেবের মধ্যে। এদিকে চার পয়সার বেশি দাম করলে কমপিট করতে পারব না।
খানিক পরে বন্ধু বলিল—ওহে তোমার বৌঠাকরুন বলছেন, আমাদের তো একটা খাওয়া পাওনা আছে, এবার সেটা হয়ে যাক না কেন? বেশ একটা ফেয়ারওয়েল ফিস্ট হয়ে যাবে এখন, তবে উলটো, এই যা
অপু মনে মনে ভারি কৃতজ্ঞ হইয়া উঠিল বন্ধু-পত্নীর প্রতি। ইহাদের মলিন বেশ ছেলেমেয়েগুলির শীর্ণ চেহারা হইতে ইহাদের ইতিহাস সে ভালোই বুঝিয়াছিল। কিছু ভালো খাবার আনাইয়া খাওয়ানো, একটু আমোদ আহ্লাদ করা—কিন্তু হয়তো সেটা দরিদ্র সংসারে সাহায্যের মতো দেখাইবে। যদি ইহারা না লয় বা মনে কিছু ভাবে? ও-পক্ষ হইতে প্রস্তাবটা আসাতে সে ভারি খুশি হইল।
ভোজের আয়োজনে ছ-সাত টাকা ব্যয় করিয়া অপু বন্ধুর সঙ্গে ঘুরিয়া বাজার করিল। কইমাছ, গলদা-চিংড়ি, ডিম, আলু, ছানা, দই, সন্দেশ।
হয়তো খুব বড়ো ধরনের কিছু ভোজ নয়, কিন্তু বন্ধু-পত্নীর আদরে হাসিমুখে তাহা এত মধুর হইয়া উঠিল। এমন কি এক সময়ে অপুর মনে হইল আসলে তাহাকে খাওয়ানোর জন্যই বন্ধুপত্নীর এ ছল। লোকে ইষ্টদেবতাকেও এত যত্ন করে না বোধ হয়। পিছনে সব সময় বন্ধুর বৌটি পাখা হাতে বসিয়া তাহাদের বাতাস করিতেছিলেন, অপু হাত উঠাইতেই হাসিমুখে বলিলেন–ও হবে না, আপনি আর একটু ছানার ডালনা নিন—ও কি, মোর্চার চপ পাতে রাখলেন কার জন্যে? সে শুনব না–
এই সময় একটি পনেরো-ষোল বছরের ছেলে উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল। বন্ধু বলিল—এসো, এসো কুঞ্জ, এসো বাবা, এইটি আমার শালীর ছেলে, বাগবাজারে থাকে। আমার সে ভায়েরা-ভাই মারা গেছে গত শ্রাবণ মাসে। পাটের প্রেসে কাজ করত, গঙ্গার ঘাটে রেললাইন পেরিয়ে আসতে হয়। তা রোজই আসে, সেদিন একখানা মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তা ভাবলে, আবার অতখানি ঘুরে যাবে? যেমন গাড়ির তলা দিয়ে গলে আসতে গিয়েছে আর অমনি গাড়িখানা দিয়েছে ছেড়ে। তারপর চাকায় কেটে-কুটে একেবারে আর কি-দুটি মেয়ে, আমার শালী আর এই ছেলেটি, একরকম করে বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে চলছে। উপায় কি?…তাই আজ ভালো খাওয়াটা আছে, কাল স্ত্রী বললে, যাও কুঞ্জকে বলে এসো–ওরে বসে যা বাবা, থালা না থাকে পাতা একখানা পেতে। হাত মুখটা ধুয়ে আয় বাবা—এত দেরি করে ফেললি কেন?
বেলা বেশি ছিল না। খাওয়াদাওয়ার পর গল্প করিতে করিতে অনেক রাত হইয়া গেল। অপু বলিল, আচ্ছা, আজ উঠি ভাই, বেশ আনন্দ হল আজ অনেকদিন পরে–
বন্ধু বলিল, ওগো, অপূর্বকে আলোটা ধরে গলির মুখটা পার করে দাও তো? আমি আর উঠতে পারি নে—
একটা গেট কেরোসিনের টেমি হাতে বউটি অপুর পিছনে পিছনে চলিল।
অপু বলিল, থাক বৌ-ঠাকরুন, আর এগোবেন না, এমন আর কি অন্ধকার, যান আপনি
–আবার কবে আসবেন?
—ঠিক নেই, এখন একটা লম্বা পাড়ি তো দি—
-কেন, একটা বিয়ে-থা করুন না? পথে পথে সন্ন্যাসী হয়ে এ রকম বেড়ানো কি ভালো? মাও তো নেই শুনেছি। কবে যাবেন আপনি?…যাবার আগে একবার আসবেন না, যদি পারেন।
