লীলার পত্র পাইবার দিন-বারো পরে তাহার যাইবার দিন আসিয়া গেল।
ছেলেরা সভা করিয়া তাহাকে বিদায় সম্বর্ধনা দিবার উদ্দেশ্যে চাঁদা উঠাইতেছিল—হেডমাস্টার খুব বাধা দিলেন। যাহাতে সভা না হইতে পারে সেইজন্য দলের চাইদিগকে ডাকিয়া টেস্ট পরীক্ষার সময় বিপদে ফেলিবেন বলিয়া শাসাইলেন—পরিশেষে স্কুল-ঘরে সভার স্থানও দিতে চাহিলেন না, বলিলেন তোমরা ফেয়ারওয়েল দিতে যাচ্ছ, ভালো কথা, কিন্তু এসব বিষয়ে আয়রন ডিসিপ্লিন চাই—যার চরিত্র নেই, তার কিছুই নেই, তার প্রতি কোনও সম্মান তোমরা দেখাও, এ আমি চাই নে, অন্তত স্কুল-ঘরে আমি তার জায়গা দিতে পাবি নে।
সেদিন আবার বড়ো বৃষ্টি। মহেন্দ্র সাঁবুই-এর আটচালায় জনত্রিশেক উপবেব ক্লাসের ছেলে হেডমাস্টারের ভয়ে লুকাইয়া হাতে লেখা অভিনন্দনপত্র পড়িয়া ও গাঁদাফুলের মালা গলায় দিয়া অপুকে বিদায়-সম্বর্ধনা জানাইল, সভা ভঙ্গের পর জলযোগ কবাইল। প্রত্যেকে পায়ের ধুলা লইযা, তাহার বাড়ি আসিয়া বিছানাপত্র গুছাইয়া দিয়া, নিজেবা তাহাকে বৈকালে ট্রেনে তুলি দিল।
অপু প্রথমে আসিল কলিকাতায়।
একটা খুব লম্বা পাড়ি দিবে—যেখানে সেখানে যেদিকে দুই চোখ যায়—এতদিনে সত্যিই মুক্তি। আর কোনও জালে নিজেকে জড়াইবে না—সব দিক হইতে সতর্ক থাকিবে-শিকলের বাঁধন অনেক সময় অলক্ষিতে জড়ায় কিনা পায়ে!
ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে গিয়া সাবা ভারতবর্ষের ম্যাপ ও অ্যাটলাস কয়দিন ধরিয়া দেখিয়া কাটাইল-ডানিয়েলের ওরিয়েন্টাল সিনারি ও পিঙ্কার্টনের ভ্রমণ-বৃত্তান্তের নানাস্থান নোট করিয়া লইল-বেঙ্গল নাগপুর ও ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলের নানাস্থানের ভাড়া ও অন্যান্য তথ্য জিজ্ঞাসা করিয়া বেড়াইল। সত্তর টাকা হাতে আছে, ভাবনা কিসের?
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ছেলেকে চোখের দেখা দেখিয়া যাওয়া দরকার না? সেই দিনই বিকালের ট্রেনে সে শশুরবাড়ি রওনা হইল। অপর্ণার মা জামাইকে এতটুকু তিরস্কার করিলেন না, এতদিন হেলেকে না দেখিতে আসার দরুন একটি কথাও বলিলেন না। বরং এত আদর-যত্ন করিলেন যে অপু নিজেকে অপরাধী ভাবিয়া সংকুচিত হইয়া রহিল। অপু বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা কহিতেছে, এমন সময়ে তাহার খুড়শাশুড়ি একটি সুন্দর খোকাকে কোলে করিয়া সেখানে আসিলেন। অপু ভাবিল—বেশ খোকাটি তত! কাদের? খুড়শাশুড়ি বলিলেন–যাও তো খোকন, এবার তোমার আপনার লোকের কাছে। ধন্যি যা হোক, এমন নিষ্ঠুর বাপ কখনও দেখি নি! যাও তো একবার কোলে–
ছেলে তিন বৎসর প্রায় ছাড়াইয়াছে–ফুটফুটে সুন্দর গায়ের রং—অপর্ণার মতো ঠোঁট ও মুখের নিচেকার ভঙ্গি, চোখ বাপের মতো ডাগর ডাগর। কিন্তু সবসুদ্ধ ধরিলে অপর্ণার মুখের আদলই বেশি ফুটিয়া উঠে খোকার মুখে। প্রথমে সে কিছুতেই বাবার কাছে আসিবে না, অপরিচিত মুখ দেখিয়া ভয়ে দিদিমাকে জড়াইয়া রহিল—অপূর মনে ইহাতে আঘাত লাগিল। সে হাসিমুখে হাত বাড়াইয়া বার বার খোকাকে কোলে আনিতে গেল—ভয়ে শেষকালে খোকা দিদিমার কাঁধে মুখ লুকাইয়া রহিল। সন্ধ্যার সময় খানিকটা ভাব হইল। তাহাকে দু-একবার বাবা বলিয়া ডাকিলও। একবার কি একটা পাখি দেখিয়া বলিল-ফাখি, ফাখি, উই এত্তা ফাখি নেবো বাবা
প’কে কচি জিব ও ঠোঁটের কি কৌশলে ফ বলিয়া উচ্চারণ করে, কেমন অদ্ভুত বলিয়া মনে হয়। আর এত কথাও বলে থোকা!
কিন্তু বেশির ভাগই বোঝা যায় না—উলটো-পালটা কথা, কোন্ কথার উপর জোর দিতে গিয়া কোন্ কথাব উপর দেয় কিন্তু অপুর মনে হয় কথা কহিলে খোকার মুখ দিয়া মানিক ঝরে— সে যাহাই কেন বলুক না, প্রত্যেক ভাঙা, অশুদ্ধ, অপূর্ণ কথাটি অপুর মনে বিস্ময় জাগায়। সৃষ্টি আদিম যুগ হইতে কোন শিশু যেন কখনও বাবা বলে নাই, জল বলে নাই,—কোন্ অসাধ্য সাধনই না তাহার খোকা করিতেছে!
পথে বাবার সঙ্গে বাহির হইয়াই খোকা বকুনি শুরু করিল। হাত পা নাড়িয়া কি বুঝাইতে চায় অপু না বুঝিয়াই অন্যমনস্ক সুরে ঘাড় নাড়িযা বলে—ঠিক ঠিক। তারপর কি হল বে খোকা?
একটা বড়ো সাঁকো পথে পড়ে, খোকা বলে-বাবা যাব–ওই দেখব।
অপু বলে—আস্তে আস্তে নেমে যা—নেমে গিয়ে একটা কু-উ করবি–
খোকা আস্তে আস্তে ঢালু বাহিয়া নিচে নামে-জলনিকাশের পথটার ফাঁকে ওদিকের গাছপালা দেখা যাইতেছেনা বুঝিযা বলে-বাবা, এই মধ্যে একতা বাগান–
–কু করো তত খোকা, একটা কু করো।
খোকা উৎসাহের সহিত বাঁশির মতো সুরে ডাকে—কু-উ-উ–পরে বলে—তুমি কলুন বাবা?
অপু হাসিয়া বলে-কু-উ-উ-উ-উ–
খোকা আমোদ পাইয়া নিজে আবার করে—আবার বলে—তুমি কলুন?বাড়ি ফিরিবার পথে বলে, খবিছাক এনো বাবা-দিদিমা খবিছাক আঁড়বে—খবিছাক ভালো—
সন্ধ্যাবেলা খোকা আরও কত গল্প করে। এখানকার চাঁদ গোল। মাসিমার বাড়ি একবার গিয়াছিল, সেখানকার চাদ ছোট্ট—এতটুকু! অতটুকু চাদ কেন বাবা? শীঘ্রই অপু দেখিল, খোকা দুষ্টও বড়ো। অপু পকেট হইতে টাকা বাহির করিয়া গুনিতেছে, খোকা দেখিতে পাইয়া চিৎকার করিয়া সবাইকে বলে—দ্যাখ, কত তাকা!—আয় আয়–
পরে একটা টাকা তুলিয়া লইয়া বলে—এতা আমি কিছুতি দেবো না।—হাতে মুঠো বাঁধিয়া থাকে—আমি কাচের ভাতা কিনব
অপু ভাবে খোকাটা দুইও তো হয়েছে-না-দে-টাকা কি করবি?
–না কিছুতি দেবো না—হি-হি-ঘাড় দুলাইয়া হাসে।
অপুর টাকাটা হাত হইতে লইতে কষ্ট হয়—তবু লয়। একটা টাকার ওর কি দরকার? মিছিমিছি নষ্ট।
