অপু ইতিমধ্যে গলির মোড়ের দোকান হইতে আট আনার খাবার কিনিয়া আনিল। খাবারের ঠোঙা হাতে যখন সে ফিরিয়াছে তখন বন্ধু ও বন্ধুপত্নী বাসায় ফিরিয়াছে।-বাঃ রে, আবার কোথায় গিয়েছিলে—ওতে কি? খাবার? বাঃ রে, খাবার তুমি আবার কেন—
অপু হাসিমুখে বলিল—তোমার আমার জন্য তো আনি নি? খুকি রয়েছে, ওই থোকা রয়েছে—এসো তো মানু—কি নাম? রমলা? ও বাবা, বাপের শখ দ্যাখোরমলা! বৌ-ঠাকরুন— ধরুন তো এটা।
বন্ধুপত্নী আধঘোমটা টানিয়া প্রসন্ন হাসিভরা মুখে ঠোঙাটি হাত হইতে লইলেন। সকলকে চা ও খাবার দিলেন। সেই খাবারই।
আধঘন্টাটাক পর অপু বলিল—উঠি ভাই, আবার চাপদানিতেই ফিরব-বেশ ভালো ভাইকষ্টের সঙ্গে তুমি এই যে লড়াই করছ-এতে তোমাকে ভালো করে চিনে নিলাম–কিন্তু বৌ ঠাকরুনকে একটা কথা বলে যাই—অত ভালো মানুষ হবেন না—আপনার স্বামী তা পছন্দ করেন না। দু-একদিন একটু-আধটু চুলোচুলি, হাতা-যুদ্ধ, বেলুন-যুদ্ধ-জীবনটা বেশ একটু সরস হয়ে উঠবে-বুঝলেন না? এ আমার মত নয় কিন্তু, আমার এই বন্ধুটির মত—আচ্ছা আসি, নমস্কার।
বন্ধুটি পিছু পিছু আসিয়া হাসিমুখে বলিলওহে তোমার বৌ-ঠাকরুন বলছেন, ঠাকুরপোকে জিজ্ঞেস করো, উনি বিয়ে করবেন, না, এই রকম সন্নিসি হয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াবেন?…উত্তর দাও।
অপু হাসিয়া বলিল—দেখে শুনে আর ইচ্ছে নেই ভাই, বলে দাও। বাহিরে আসিয়া ভাবে–আচ্ছা, তবুও এরা আজ ছিল বলে বিজয়ার আনন্দটা করা গেল। সত্যিই শান্ত বৌটি। ইচ্ছে করে এদের কোনও হেল্প করি কি করে হয়, হাতে এদিকে পয়সা কোথায়?
তাহার পর কিসের টানে সে ট্রামে উঠিয়া একেবারে ভবানীপুরে লীলাদের বাড়ি গিয়া হাজির হইল। রাত তখন প্রায় সাড়ে-আটটা। লীলার দাদামশায়ের লাইব্রেরি-ঘরটাতে লোকজন কথাবার্তা বলিতেছে, গাড়িবারান্দাতে দুখানা মোটর দাঁড়াইয়া আছে—পোকার উপদ্রবের ভয়ে হলের ইলেকট্রিক আলোগুলিতে রাঙা সিল্কের ঘেরাটোপ বাঁধা। মার্বেলের সিঁড়ির ধাপ বাহিয়া হলের সামনের চাতালে উঠিবার সময় সেই গন্ধটা পাইলকিসের গন্ধ ঠিক সে জানে না, হয়তো দামি আসবাবপত্রের গন্ধ, হয়তো লীলার দাদামশায়ের দামি চুরুটের গন্ধ—এখানে আসিলেই ওটা পাওয়া যায়।
লীলা—এবার হয়তো লীলা…অপুর বুকটা টি টিপ করিতে লাগিল।
লীলার ছোট ভাই বিমলেন্দু তাহাকে দেখিতে পাইয়া ছুটিয়া আসিয়া হাত ধরিল।
এই বালকটিকে অপুর বড় ভালো লাগে মাত্র বার দুই ইহার আগে সে অপুকে দেখিয়াছে, কিন্তু কি চোখেই যে দেখিয়াছে! একটু বিস্ময়-মাখানো আনন্দের সুরে বলিল—অপূর্ববাবু, আপনি এতদিন পর কোথা থেকে? আসুন আসুন, বসবেন। বিজয়ার প্রণামটা, দাঁড়ান।
—এসো এসো, কল্যাণ হোক, মা কোথায়?
–মা গিয়েছেন বাগবাজারের বাড়িতে-আসবেন এখুনি-বসুন।
-ইয়ে—তোমার দিদি এখানে তো?–না?—ও।
এক মুহূর্তে সারা বিজয়া দশমীর উৎসবটা, আজিকার সকল ছুটাছুটি ও পরিশ্রমটা অপুর কাছে বিস্বাদ, নীরস, অর্থহীন হইয়া গেল। শুধু আজ বলিয়া নয়, পূজা আরম্ভ হইবার সময় হইতেই সে ভাবিতেছে—লীলা পূজার সময় নিশ্চয় কলিকাতায় আসিবে—বিজয়ার দিন গিয়া দেখা করিবে। আজ চাপদানির চটকলে পাঁচটার ভো বাজিয়া প্রভাত সূচনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে অসীম আনন্দের সহিত বিছানায় শুইয়া ভাবিয়াছিল—বৎসর দুই পরে আজ লীলার সঙ্গে ওবেলা দেখা হইবে এখন। সেই লীলাই নাই এখানে!…
বিমলেন্দু তাহাকে উঠিতে দিল না। চা ও খাবার আনিয়া খাওয়াইল। বলিল-বসুন, এখন উঠতে দেব না, নতুন আইসক্রিমের কলটা এসেছে—বড়ো মামার বন্ধুদের জন্যে সিদ্ধির আইসক্রিম হচ্ছে—খাবেন সিদ্ধির আইসক্রিম? রোজ দেওয়া আপনার জন্যে এক ডিশ আনতে বলে এলুম। আপনার গান শোনা হয় নি কতদিন, না সত্যি, একটা গান করতেই হবে—ছাড়ছি নে।
–লীলা কি সেই রায়পুরেই আছে? আসবে-টাসবে না?…
–এখন তো আসবে না দিদি–দিদির নিজের ইচ্ছেতে তো কিছু হবার জো নেই-দাদামশায় পত্র লিখেছিলেন, জামাইবাবু উত্তর দিলেন, এখন নয়, দেখা যাবে এর পর।
তাহার পর সে অনেক কথা বলিল। অপু এসব জানিত না।-জামাইবাবু তোক ভালো নয়, খুব রাগী, বদমেজাজী। দিদি খুব তেজী মেয়ে বলিয়া পারিয়া উঠে না—তবু ব্যবহার আদৌ ভালো নয়। নিচু সুরে বলিল—নাকি খুব মাতালও–দিদি তো সব কথা লেখে না, কিন্তু এবার বড়দিদির ছেলে কিছুদিন বেড়াতে গিয়েছিল নাকি গরমের ছুটিতে, সে এসে সব বললে। বড়দিদিকে আপনি চেনেন না? সুজাতাদি? এখানেই আছেন, এসেছেন আজ—ডাকব তাকে।
অপুর মনে পড়িল সুজাতাকে। বড়োবৌরানির মেয়ে বাল্যের সেই সুন্দরী, তন্বী সুজাতা বর্ধমানের বাড়িতে তাহারই যৌবনপুষ্পিত তনুলতাটি একদিন অপুর অনভিজ্ঞ শৈশবচক্ষুর সম্মুখে নারী-সৌন্দর্যের সমগ্র ভাণ্ডার যেন নিঃশেষে উজাড় করিয়া ঢালিয়া দিয়াছিল—বারো বৎসর পূর্বের সে উৎসবের দিনটা আজও এমন স্পষ্ট মনে পড়ে।
একটু পরে সুজাতা হাসিমুখে পর্দা ঠেলিয়া ঘরে ঢুকি, কিন্তু একজন অপরিচিত, সুদর্শন, তরুণ যুবককে ঘরের মধ্যে দেখিয়া প্রথমটা সে তাড়াতাড়ি পিছু হটিয়া পর্দাটা পুনরায় টানিতে যাইতেছিল—বিমলেন্দু হাসিয়া বলিল—বাঃ রে, ইনিই তো অপূর্ববাবু, বড়দি চিনতে পারেন নি?
অপু উঠিয়া পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিল। সে সুজাতা আর নাই, বয়স ত্রিশ পার হইয়াছে, খুব মোটা হইয়া গিয়াছে, তার সামনের দিকে দু-এক গাছা চুল উঠিতে শুরু হইয়াছে, যৌবনের চটুল লাবণ্য গিয়া মুখে মাতৃত্বের কোমলতা। বর্ধমানে থাকিতে অপুর সঙ্গে একদিনও সুজাতার আলাপ হয় নাই-রাঁধুনীর ছেলের সঙ্গে বাড়ির বড়ড়া মেয়ের কোন আলাপই বা সম্ভব ছিল? সবাই তো আর লীলা নয়। তবে বাড়ির রাঁধুনী বামনীর ছেলেটিকে ভয়ে ভয়ে বড়োলোকের বাড়ির একতলা দালানের বারান্দাতে অনেকবার সে বেড়াইতে, ঘোরাফেরা করিতে দেখিয়াছে বটে।
