জন্মজন্মান্তরের অনন্ত পথহীন পথে অতি নীচ পাপীরও হাত ধরে অসীম ধৈর্যে, অসীম মমতায় তিনি স্থির লক্ষ্যে পৌঁছে দেবেন। তাঁর এই ছেলের প্রতি যে মমতা, তেমনি সেই মহাশক্তির মমতা সমুদয় জীবকুলের প্রতি। কি চমৎকার নির্ভরতার ভাব সেই মুহূর্তে ভবানী বাঁড়ুয্যে মনের মধ্যে খুঁজে পেলেন সেই মহাশক্তির ওপর। কোনো ভয় নেই, কোনো ভয় নেই। মাভৈঃ স্তনন্ধয়ানাং স্তনদুগ্ধপানে, মধুব্রতানাং মকরন্দপানে নেই কি তিনি সর্বত্র? নেই কোথায়?
.
দেওয়ান হরকালী সুর লালমোহন পালের গদিতে বসে নীলকুঠির চাষকাজের হিসেব দিচ্ছিলেন। বেলা দুপুর উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েচে। লালমোহন পাল বললেন, খাস খামারের হিসেবটা ওবেলা দেখলে হবে না দেওয়ানমশাই? বড় বেলা হোলো। আপনি খাবেন কোথায়?
–কুঠিতে।
–কে রাঁধবে?
–আমাদের নরহরি পেশকার। বেশ রাঁধে।
কথায় কথায় লালমোহন পাল বলেন, ভালো কথা, আমার স্ত্রী আর ভগ্নী একদিন কুঠি দেখতে চাচ্চে, ওরা ওর ভেতর কখনো দেখে নি।
–যাবেন, কালই যাবেন। আমি সব বন্দোবস্ত করে দিচ্চি। কিসি যাবেন?
–গোরুর গাড়িতি।
–কেন, কুঠির পালকি আছে, তাই পাঠাবো এখন।
আজ দুবছর হল বেঙ্গল ইণ্ডিগো কোম্পানি সাড়ে এগারো হাজার টাকায় তাদের কর্মকর্তা ইনিস্ সাহেবের মধ্যস্থতায় মোল্লাহাটির কুঠি লালমোহন পাল ও সতীশ সাধুখাঁর কাছে বিক্রি করে ফেলেছে। শিপটননের মৃত্যুর পর ইনিস্ সাহেব এই দুবছর কুঠি চালিয়েছিল, শেষে ইনিস সাহেবই রিপোর্ট করে দিলে এ কুঠি রাখা আর লাভজনক নয়। নীলকুঠির খাসজমি দেড়শো বিঘেতে আজকাল চাষ হয় এবং কুঠির প্রাঙ্গণের প্রায় তেরো বিঘে জমিতে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা প্রভৃতির চারা লাগানো হয়েচে। অর্থাৎ কৃষিকার্যই হচ্চে আজকাল প্রধান কাজ নীলকুঠির। চাষটা বজায় আছে এই পর্যন্ত। দেওয়ান হরকালী সুর এবং নরহরি পেশকার এই দুজন মাত্র আছেন পুরনো কর্মচারীদের মধ্যে, সব কাজকর্ম দেখাশুনো করেন। প্রসন্ন চত্তি আমিন এবং অন্যান্য কর্মচারীর জবাব হয়ে গিয়েচে। নীলকুঠির বড় বড় বাংলা ঘর কখানার সবগুলিই আসবাবপত্র সমেত এখনো বজায় আছে। না রেখে উপায় নেই-ইণ্ডিগো কোম্পানি এগুলি সুদ্ধ বিক্রি করেছে এবং দামও ধরে নিয়েছে। অবিশ্যি জলের দামে বিক্রি হয়েচে সন্দেহ নেই। এ অজ পল্লীগ্রামে অত বড় কুঠিবাড়ি ও শৌখিন আসবাবপত্রের ক্রেতা কে? গাড়ি করে বয়ে অন্যত্র নিয়ে যাবার খরচও কম নয়, তার হাঙ্গামাও যথেষ্ট। ইণ্ডিগো কোম্পানির অবস্থা এদিকে টলমল, যা পাওয়া গেল তাই লাভ। ইনিস্ সাহেব কেবল যাবার সময় দুটো বড় আলমারি কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিল।
দেওয়ান হরকালী সুর বাড়ি এসে বুঝিয়েছিলেন–খাসজমি আছে দেড়শো বিঘে, একশো বিয়াল্লিশ বিঘে ন কাঠা সাত ছটাক, ঐ দেড়শো বিঘেই ধরুন। ওটবন্দি জমা বন্দোবস্ত নেওয়া আছে সত্তর বিঘে। তা ছাড়া নওয়াদার বিল ইজারা নেওয়া হয়েছিল ম্যাকনি সায়েবের আমলে নাটোর রাজাদের কাছ থেকে। মোটা জলকর। চোখ বুজে কুঠি কিনে নিন পালমশায়, নীলকুঠি হিসেবে নয়, জমিদারি হিসেবে কিনে নিন, জমিদারি আমি দেখাশুনা করবো, আরো দুএকটি পুরোনো কর্মচারী আপনাকে বজায় রাখতে হবে, আমরাই সব চালাবো, আপনি। লাভের কড়ি আমাদের কাছ থেকে বুঝে নেবেন।
লালমোহন পাল বলেছিল–কুঠিবাড়ির আসবাবপত্তর সমেত?
–বিলকুল।
–যান, নেবো।
এইভাবে কুঠি কেন হয়। কেনার সময় ইনিস্ সাহেব একটু গোলমাল বাধিয়েছিল, ঘোড়ার গাড়ি দুখানা ও দুজোড়া ঘোড়া দেবে না। এ নিয়ে লালমোহন পালের দিক থেকে আপত্তি ওঠে, অবশেষে আর সামান্য কিছু বেশি দিতে হয়। কুঠি কেনার পরে রায়গঞ্জের গোঁসাইবাবুদের কাছে গাড়িঘোড়াগুলো প্রায় হাজার টাকায় বিক্রি করে ফেলা হয়। খাসজমি ও জলকর ভালোভাবে দেখাশুনো করলে যে মোটা মুনাফা থাকবে, এটা দেওয়ান হরকালী বুঝেছিলেন। সামান্য জমিতে নীলের চাষও হয়।
কুঠি কেনার পরে তুলসী একদিন বলেছিল–দেওয়ানমশাইকে বলো না গো, সায়েবের ঘোড়ার টমটম গাড়ি আমাদের পাঠিয়ে দেবেন, একদিন চড়বো!
লালমোহন বলেছিলেন–না বড়বৌ। বড়সায়েব ঐ টমটমে চড়ে বেড়াতো, তখন আমরা মোট মাথায় ছুটে পালাতাম ধানের ক্ষেতি। সেই টমটমে তুমি চড়লি লোকে বলবে কি জানো? বলবে টাকা হয়েচে কিনা, তাই বড় অংখার হয়েচে। আমারেও একদিন দেওয়ান বলেছিলেন–টমটম পাঠিয়ে দেবো, কুঠিতে আসবেন। আমি হাতজোড় করে বলেলাম–মাপ করবেন। ওসব নবাবি করুক গিয়ে বাবুভেয়েরা। আমরা ব্যবসাদার জাত, ওসব করলি ব্যবসা ছিকেয় উঠবে।
.
অবশেষে একদিন একখানা চইওয়ালা গোরুর গাড়িতে লালমোহনের বড় মেয়ে সরস্বতী, তার মা তুলসী, বোন ময়না ছেলেপিলে নিয়ে কুঠি দেখতে গেল। দেওয়ান হরকালী, প্রসন্ন আমিন ও নরহরি পেশকার এদের এগিয়ে নিয়ে এসে সব দেখিয়ে নিয়ে বেড়ালো। সবাই নানারকম প্রশ্ন করতে লাগলো–
–ও দেওয়ান কাকা, এ ঘরটা কি?
–এখানে সায়েবেরা বসে খেতো, মা।
–এত বড় বড় ঝাড়লণ্ঠন কেন?
–এখানে ওদের নাচের সময় আলো জ্বলতো।
–এটা কি?
–ওটা কাচের মগ, সায়েবরা জল খেতো। এই দ্যাখো এরে বলে ডিক্যান্টার, মদ খেতো ওরা।
তুলসী ছেলেমেয়েদের ডেকে বললে–ছুঁস নে ওসব। ওদিকি যাস নে, সন্দে বেলা নাইতি হবে–ইদিকি সরে আয়।
