–মন্ত্রদাতা গুর?
–এক রকম। তিনি মন্ত্র দিতেন না কাউকে। উপদেষ্টা গুরু।
–আমার বড্ড ইচ্ছে ছিল দেখতি যাই। তা বয়স বেশি হোলা, অত দূরদেশে হাঁটা কি এখন পোষায়?
–আমাদের দেশে রেলের গাড়ি হচ্চে শুনেচ?
–শোনলাম। রেলগাড়ি হলি আমাদের চড়তি দেবে, না সায়েব সুবো চড়বে?।
–আমার বোধ হচ্চে সবাই চড়বে। পয়সা দিতে হবে।
–আমার দেবতা এই অশথতলাতেই দেখা দেন ঠাকুরমশায়। আমরা গরিব লোক, পয়সা খরচ করে যদি না-ই যেতে পারি গয়া কাশী বিন্দাবন, তবে কি গরিব বলে তিনি আমাদের চরণে ঠাঁই দেবেন না? খুব দেবেন। রূপেও তিনি সব জায়গায়, অরূপেও তিনি সব জায়গায়। এই গাছতলার ছায়াতে আমার মতো গরিবির কুঁড়েতে তিনি বসে গাঁজা খান আমাদের সঙ্গে
–অ্যাঁ!
-বললাম, মাপ করবেন ঠাকুরমশাই। বলা ভুল হোলো। এ সব গুহ্য কথা। তবে আপনার কাছে বললাম, অন্য লোকের কাছে বলি। নে।
ভবানী হেসে চুপ করে রইলেন। যার যা মনের বিশ্বাস তা কখনো ভেঙ্গে দিতে নেই। ভগবান যদি এদের সঙ্গে বসে গাঁজা খান বিশ্বাস হয়ে থাকে, তিনি কে তা ভেঙ্গে দেবার? এসব অল্পবুদ্ধি লোক আগে বিরাটকে বুঝতে চেষ্টা করে না, আগে থেকেই সেই অনন্তের সঙ্গে একটা সম্বন্ধ পাতিয়ে বসে থাকে। অসীমের ধারণা না হোক, সেই বড় কল্পনাও তো একটা রস। রস উপলব্ধি করতে জানে না–আগেই ব্যগ্র হয় সেই অসীমকে সীমার গণ্ডিতে টেনে এনে তাঁকে ক্ষুদ্র করতে।
খেপী বললে–রাগ করলেন? আপনারে জানি কিনা, তাই ভয় করে।
-ভয় কি? যে যা ভাবে ভাববে। তাতে দোষ কি আছে। আমার সঙ্গে মতে না মিললে কি আমি ঝগড়া করবো? আমি এখন উঠি।
–কিছু ফল খেয়ে যান
–না, এখন খাবো না। চলি–
এই সময়ে দ্বারিক কর্মকার এল, হাতে একটা লাউ। বললে– লাউয়ের সুক্ত রাঁধতে হবে। ভবানী বললেন–কি হে দ্বারিক, তুমি খাবে নাকি?
দ্বারিক বিনীতভাবে বললে–আজ্ঞে তা কখনো খাই? ওঁর হাতে কেন, আমি নিজের মেয়ের হাতে খাই নে। ভাজনঘাটে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গিইচি তা বেয়ান বললে, মুগির ডাল লাউ দিয়ে বেঁধিচি, খাবা? আমি বললাম, না বেয়ান, মাপ করবা। নিজির হাতে বেঁধে খেলাম তাদের। রান্নাঘরের দাওয়ায়।
দ্বারিক কর্মকার এ অঞ্চলের মধ্যে ছিপে মাছ মারার ওস্তাদ। ভবানী বললেন–তুমি তো একজন বড় বর্শেল, মাছ ধরার গল্প করো না। শুনি।
দ্বারিক পুনরায় বিনীতভাবে বললে–জামাইঠাকুর, হবো না কেন? আজ দুকুড়ি বছর ধরে এ দিগরের বিলি, বাঁওড়ে, নদীতি, পুকুরি ছিপ বেয়ে আসছি। কেন বর্শেল হবো না বলুন। এতকাল ধরে যদি একটা লোক একটা কাজে মন দিয়ে নেগে থাকে, তাতে সে কেন পোক্ত হয়ে উঠবে না বলুন।
খেপী বললে–এতকাল ধরে ভগবানের পেছনে নেগে থাকলি যে তাঁরে পেতে। মাছ ধরে অমূল্য মানব জমো বৃথা কাটিয়ে দিলে কেন?
দ্বারিক অত্যন্ত অপ্রতিভ ও লজ্জিত হয়ে গেল এ কথা শুনে। এসব কথা সে কখনো ভেবে দেখে নি। আজকাল এই পঁয়ষট্টি বছর বয়সে নতুন ধরনের কথা যেন সবে শুনচে। লাউটা সে নিরুৎসাহভাবে উঠোনের আকন্দগাছের ঝোপটার কাছে নামিয়ে রেখে দিলে। ভবানীর মমতা হল ওর অবস্থা দেখে। বললেন–শোন খেপী, দ্বারিকের কথা কি বলছো? আমি যে অমন গুরু পেয়েও এসে আবার গৃহী হলাম কেন? কেউ বলতে পারে? যে যা করচে করতে দাও। তবে সেটি সে যেন ভালো ভাবে সৎ ভাবে করে। কাউকে না ঠকিয়ে, কারো মনে। কষ্ট না দিয়ে। সবাই যদি শালগ্রাম হবে, বাটনা বাটবার নুড়ি কোথা থেকে আসবে তবে?
খেপী বললে–আমি মুকধুমি সহ্য করতে পারি নে মোটে। দ্বারিক যেন রাগ কোরো না। কোথায় লাউটা? সুকুনি একটু দেবানি, মা কালীর পেরসাদ চাকলি জাত যাবে না তোমার।
ভবানী থাকলে সকলেই একটু অস্বস্তি বোধ করে, কারণ গাঁজাটা চলে না। হাফেজ মণ্ডল এসে আড়চোখে একবার ভবানীকে চেয়ে দেখে নিলে, ভাবটা এই, জামাইঠাকুর আপদটা আবার কোথা থেকে এসে জুটলো দ্যাখো। একটু ধোঁয়া-টোঁয়া যে টানবো, তার দফা গয়া।
খেপী বললে–ঐ দেখুন, আপদগুলো এসে জুটলো, শুধু গাঁজা খাবে–
–তুমি তো পথ দেখাও, নয়তো ওরা সাহস পায়?
–আমি খাই অবিশ্যি, ওতে মনডা একদিকে নিয়ে যাওয়া যায়।
এই সময় যেন একটু বৃষ্টি এল। ভবানী উঠতে চাইলেও ওরা উঠতে দিলে না। সবাই মিলে বড় চালাঘরে গিয়ে বসা হল। ভবানীর মুখে মহাভারতের শঙ্খ-লিখিতের উপাখ্যান শুনে ওরা বড় মুগ্ধ। শঙ্খ ও লিখিত দুই ভাই, দুইজনেই তপস্বী, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আশ্রম স্থাপন করে বাস করেন। ছোট ভাই লিখিত একদিন দাদার আশ্রমে বেড়াতে গিয়ে দেখে দাদা আশ্রমে নেই, কোথাও গিয়েচেন। তিনি বসে দাদার আগমনের প্রতীক্ষা করচেন, এমন সময়ে তাঁর নজরে পড়লো, একটা ফলের বৃক্ষের ঘন ডালপালার মধ্যে একটা সুপক্ক ফল দুলছে। মহর্ষি লিখিত সেটা তখনি পেড়ে মুখে পুরে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে দাদা আসতেই লিখিত ফল খাওয়ার কথাটা বললেন তাঁকে। শুনে শঙ্খের মুখ শুকিয়ে গেল। সে কি কথা! তপস্বী হয়ে পরস্পাপহরণ? হলোই বা দাদার গাছ, তা হলেও তাঁর নিজের সম্পত্তি তো নয়, একথা ঠিক তো। না বলে পরের দ্রব্য নেওয়া মানেই চুরি করা। সে যত সামান্য জিনিসই হোক না কেন। আর তপস্বীর পক্ষে তো মহাপাপ। এ দুর্মতি কেন হল লিখিতের?
শঙ্কিত স্বরে লিখিত বললেন–কি হবে দাদা?
