ভবানী এসব লক্ষ্য করেছেন অনেকদিন থেকেই। এখানে বিবাহ করার পর থেকেই। তিনি পরিচিত ছিলেন না এমন জীবনের সঙ্গে। জানতেন না বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ের মানুষের জীবনধারাকে। চিরকাল তিনি পাহাড়ে প্রান্তরে জাহ্নবীর স্রোতেবেগের সঙ্গে পাহাড়ি ঝরনার প্রাণচঞ্চল গতিবেগের সঙ্গে নিবিড় পরিচয়ের আনন্দে কাল কাটিয়েছেন–পড়ে গিয়েচেন ধরা এখানে এসে বিবাহ করে। বিশেষ করে এই কূপমণ্ডুকদের দলে মিশে।
এদের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, অন্ধকারে আবৃত এদের। সারাটা জীবনপথ। তার ওদিকে কি আছে, কখনো দেখার চেষ্টাও করে না।
মহাদেব মুখুয্যে বললেন–ও খোকন, তোমার নাম কি?
খোকা বিস্ময় ও ভয়মিশ্রিত দৃষ্টিতে মহাদেব মুখুয্যের দিকে বড় বড় চোখ তুলে চাইলে। কোনো কথা বললে না।
–কি নাম খোকন?
–খোকন।
–খোকন? বেশ নাম। বাঃ, ওহে, এবার হাতটা আমার–দানটা কি পড়লো?
কিছুক্ষণ খেলা চলবার পরে সকলের জন্যে মুড়ি ও নারকোলকোরা এল বাড়ির মধ্যে থেকে। খাবার খেয়ে আবার সকলে দ্বিগুণ উৎসাহে খেলায় মাতলো। এমনভাবে খেলা করে এরা, যেন সেটাই এদের জীবনের লক্ষ্য।
এমন সময় সত্যম্বর চাটুয্যের জামাই শ্ৰীনাথ ওদের চণ্ডীমণ্ডপে ঢুকলো। সে কলকাতায় চাকুরি করে, সুতরাং এ অঞ্চলের মধ্যে একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি। এ গ্রামের কোনো ব্রাহ্মণই এ পর্যন্ত কলকাতা দেখেন নি। এমন কি স্বয়ং দেওয়ান রাজারাম পর্যন্ত এই দলের। কেননা কোনো দরকার হয় না কলকাতা যাওয়ার। কেন যাবেন তারা একটি অজানা শহরের সাত অসুবিধা ও নানা কাল্পনিক বিপদের মাঝখানে! ছেলেদের লেখাপড়ার বালাই নেই, নিজেদের জীবিকার্জনের জন্যে পরের দোরে ধন্না দিতে হয় না।
ফণি চক্কত্তি বললেন–এসো বাবাজি, কলকেতার কি খবর?
শ্রীনাথ অনেক আজগুবী খবর মাঝে মাঝে এনে দেয় এ গাঁয়ে। বাইরের জগতের খানিকটা হাওয়া ঢোকে এরই বর্ণনার বাতায়নপথে। সম্প্রতি এখনি সে একটা আজগুবী খবর দিলে। বললে–মস্ত খবর হচ্ছে, আমাদের বড়লাটকে একজন লোক খুন করেছে।
সকলে একসঙ্গে বলে উঠলো–খুন করলে? কে খুন করলে?
–একজন ওহাবি জাতীয় পাঠান।
মহাদেব মুখুয্যে বললেন–আমাদের বড়লাট কে যেন ছিল?
–লাড মেও।
–লাড মেও?
চণ্ডীমণ্ডপে পাশাখেলা আর জমলো না। লর্ড মেয়ো মরণ বা বাঁচুন তাতে এদের কোনো কিছু আসে-যায় না–এই নামটাই সবাই প্রথম শুনলো। তবে নতুন একটা যা-হয় ঘটলো এদের প্রাত্যহিক একঘেয়েমির মধ্যে–সেটাই পরম লাভ। শ্রীনাথ খুব সবিস্তারে কলকাতার গল্প। করলে–আপিস আদালত কিভাবে বন্ধ হয়ে গেল সংবাদ আসা মাত্রই।
বেলা দুপুর ঘুরে গেল, খোকাকে নিয়ে ভবানী বাঁড়ুয্যে বাড়ি ফিরতেই তিলুর বকুনি খেলেন।
–কি আক্কেল আপনার জিজ্ঞেস করি? কোথায় ছিলেন খোকাকে নিয়ে দুপুর পর্জন্ত! ও খিদেয় যে টা-টা করছে? কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?
খোকা দুহাত বাড়িয়ে বললে–মা, মা
ভবানী বললেন–রাখো তোমার ওসব কথা। লাড় মেও খুন হয়েচেন। শুনেচ?
–সে আবার কে গা?
–বড়লাট। ভারতবর্ষের বড়লাট।
–কে খুন করলে?
–একজন পাঠান।
–আহা কেন মারলে গো? ভারি দুঃখু লাগে!
লর্ড মেয়ো খুন হবার কিছুদিন পরেই নীলকরদের বড় সংকটের সময় এল। নীলকর সাহেবদের ঘন-ঘন বৈঠক বসতে লাগলো। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নিজের আরদালি পাঠিয়ে যখন তখন পরোয়ানা জারি করতে লাগলেন।
রাজারাম ঘোড়ায় করে যাচ্ছিলেন নীলকুঠির দিকে, রামকানাই কবিরাজ একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে, বললে–একটু দাঁড়াবেন দেওয়ানবাবু?
রাজারাম ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন–কি?
একটু দাঁড়ান। একটা কথা শুনন। আপনি আর এগোবেন না। কানসোনার বাগদিরা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ষষ্ঠীতলার মাঠে। আপনাকে মারবে, লাঠি নিয়ে তৈরি আছে। আমি জানি কথাটা তাই বললাম। অনেকক্ষণ থেকে আপনার জন্যি দাঁড়িয়ে আছি।
–কে কে আছে দলে?
–তা জানি নে বাবু। আমি গরিব লোক। কানে আমার কথা গেল, তাই বলি, অধর্ম করতি পারবো না। ভগবানের কাছে এর জবাব দিতি হবে তো একদিন? আপনি ব্রাহ্মণ, আপনাকে সাবধান করে দেবার ভার তিনিই দিয়েছেন আমার ওপর।
তবু রাজারাম ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যেতে উদ্যত হয়েচেন দেখে রামকানাই কবিরাজ হাতজোড় করে বললে–দেওয়ানবাবু, আমার কথা শুনুন–বড় বিপদ আপনার। মোটে এগোবেন না–বাবু শুনুন–ও বাবু কথাটা
ততক্ষণে রাজারাম অনেকদ্দূর এগিয়ে চলে গিয়েচেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, রামকানাই লোকটা মাথা-পাগল নাকি? এত অপমান। হল নীলকুঠির লোকের হাতে, তিনিই তার মূল–অথচ কি মাথাব্যথা ওর পড়েছিল তাঁকেই সাবধান করে দিতে? মিথ্যে কথা সব।
ষষ্ঠীতলার মাঠে তাঁর ঘোড়া পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ শুরু হল। মস্ত বড় একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে। রাজারাম দেখলেন এদের মধ্যে বাঁধালের দাঙ্গায় নিহত রামু বাগদির বড় ছেলে হারু আর তার শালা নারাণ বড় সর্দার।
পলকে প্রলয় ঘটলো। একদল চেঁচিয়ে হেঁকে বললেও ব্যাটা, নাম এখানে। আজ তোরে আর ফিরে যেতি হবে না।
নারাণ বললেও ব্যাটা সাহেবের কুকুর–তোর মুণ্ডু নিয়ে আজ ষষ্ঠীতলার মাঠে ভাঁটা খেলবো দ্যাখৃ–
অনেকে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বললে–অত কথায় দরকার কি? ঘাড় ধরে নামানেমিয়ে নিয়ে বুকে হাঁটু দিয়ে জেঁকে বসে কাতানের কোপে মুণ্ডুটা উড়িয়ে দে–
