ভবানী বাঁড়ুয্যে দ্বিরুক্তি না করে মাছটা হাতে নিয়ে ফিরলেন বাড়ির দিকে। বিলু ও নিলু ছুটে এল। বিলু স্বামীর হাত থেকে মাছটা ছিনিয়ে নিয়ে বললে কি মাছ? ভেটকি না চিতল? বাঃ
নিলু বললে–চমৎকার মাছটা। ও খোকা, মাছ খাবি? আয় আমার কোলে–
খোকা বাবার কোলেই এঁটে রইল। বললে–বাবা–বাবা
সে বাবাকে বড় ভালবাসে। বাবার কোলে সব সময় উঠতে পারে। না বলে বাবার কোলের প্রতি তার একটি রহস্যময় আকর্ষণ বিদ্যমান। বিলু চোখ পাকিয়ে বললে–আসবি নে?
–না।
–থাক তোর বাবা যেন তোরে খেতি দ্যায় ভাত বেঁধে।
–বাবা।
–মাছ খাবি নে তো?
–খাই।
–খাই তো আয়–
খোকা আবেদনের সুরে কাঁদো কাঁদো মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে বললে–ওই দ্যাখো
অর্থাৎ আমায় জোর করে নিয়ে যাচ্চে তোমার কোল থেকে। ভবানী জানেন খোকা এই কথাটি আজ অল্পদিন হোলো শিখেচে, এ কথাটা বড় ব্যবহার করে। বললেন–থাক আমার কাছে, ওকে একটু বেড়িয়ে আনি মহাদেব মুখুয্যের চণ্ডীমণ্ডপ থেকে।
নিলু বললে–মাছটার কি করবো বলে যান–
–যা হয় কোরো। তিলু কোথায়?
–বড়ি দিতি গিয়েচে বড়দার বাড়ির ছাদে। আপনার বাড়ির তো আর ছাদ নেই, বড়ি দেবে কোথায়? কবে কোঠা করবেন?
–যাও না, দাদাকে গিয়ে বলো না, কুলীনকুমারী উদ্ধার করেছি, কিছু টাকা বার করতে লোহার সিন্দুক থেকে। দোতলা কোঠা তুলে ফেলচি। বিয়ে যদি না করতাম, থাকতে থুবড়ি হয়ে, কে বিয়ে করতো?
–এর চেয়ে আমাদের দাদা গলায় কলসি বেঁধে ইছামতীর জলে ডুবিয়ে দিলি পারতেন। কি বিয়েই দিয়েচেন–আহা মরি মরি! বুড়ো বর, তিন কাল গিয়েচে, এককালে ঠেকেছে–
–বিয়ে দিলেই পারতেন তো যুবো বর ধরে। তবে থুবড়ি হয়ে ঘরে ছিলে কেন এতকাল? উদ্ধার হলেই তো পারতে। আমি পায়ে ধরে তোমাদের সাধতে গিয়েছিলাম?
–কান মলে দেবে আপনার
বলেই নিলু ক্ষিপ্রবেগে হাত বাড়িয়ে স্বামীর কানটার অস্বস্তিকর সান্নিধ্যে নিয়ে এসে হাজির করতেই বিলু ধমক দিয়ে বলে–এই! কি হচ্চে?
নিলু ফিক করে হেসে মাছটা নিয়ে ছুটে পালালো। ভবানী খোকাকে নিয়ে পথে বার হয়েই বললেন–কোথায় যচ্চি বল তো?
খোকা ঘড়ি নেড়ে বললে–যাই–
–কোথায়?
–মাছ।
মহাদেব মুখুয্যের চণ্ডীমণ্ডপে যাবার পথে একটা বাবলাগাছের ওপর লতার ঝোপ, নিবিড় ছায়া সে স্থানটিতে, বাবলাগাছের ডালে কি একটা পাখি বাসা বেঁধেছে। ভবানী গাছতলার ছায়ায় গিয়ে খোকাকে কোল থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন।
–ঐ দ্যাখ খোকা, পাখি–
খোকা বলে–পাখি–
–পাখি নিবি?
–পাখি–
-খুব ভালো। তোকে দেবো।
খোকা কি সুন্দর হাসে বাবার মুখের দিকে চেয়ে। না, ভবানীর খুব ভালো লাগে এই নিষ্পাপ, সরল শিশুর সঙ্গ। এর মুখের হাসিতে ভবানী খুব বড় কি এক জিনিস দেখতে পান।
–নিবি খোকা?
–হ্যাঁ
খোকা ঘাড় নেড়ে বলে। ভবানীর খুব ভালো লাগলো এই হ্যাঁ বলা ওর। এই প্রথম ওর মুখে এই কথা শুনলেন। তাঁর কানে প্রথম উচ্চারিত ঋমন্ত্রের ন্যায় ঋদ্ধিমান ও সুন্দর।
–কটা নিবি?
–আকখানা—
–বেশ একখানাই দেব। নিবি?
খোকা ঘাড় দুলিয়ে বলে–হ্যাঁ।
পরক্ষণেই বলে–বাবা।
–কি?
মা–
–তার মানে?
–বায়ি–
–এই তো এলি বাড়ি থেকে। মা এখন বাড়ি নেই।
খোকা যে কটি মাত্র শব্দ শিখেচে তার মধ্যে একটা হল ওখেনে। এই কথাটা কারণে অকারণে সে প্রয়োগ করে থাকে। সম্প্রতি সে। হাত দিয়ে সামনের দিকে দেখিয়ে বললে–ওখেনে–
–ওখেনে নেই। কোথাও নেই।
–ওখেনে—
–না, চল বেড়িয়ে আসি–কোল থেকে নামবি? হাঁটবি?
–আঁটি–
খোকা ভবানীর আগে আগে বেশ গুটগুট করে হাঁটতে লাগলো। খানিকটা গিয়ে আর যায় না। ভয়ের সুরে সামনের দিকে হাত দেখিয়ে বললে–ছিয়াল!
–কই? শিয়াল নয়, একটা বড় শামুক রাস্তা পার হচ্চে। ভবানী খোকার হাত ধরে এগিয়ে চললেন–চলল, ও কিছু নয়। খোকা তখনো নড়ে না, হাত দুটো তুলে দিলে কোলে উঠবে বলে। ভবানী বললেন– না, চলো, ওতে ভয় কি? এগিয়ে চলো
খোকার ভাবটা হল ভক্তের অভিযোগহীন আত্মসমর্পণের মতো। সে বাবার হাত ধরে এগিয়ে চললো শামুকটাকে ডিঙিয়ে, ভয়ে ভয়ে যদিও, নির্ভরতার সঙ্গে। ভবানী ভাবলেন–আমরাও যদি ভগবানের ওপর এই শিশুর মতো নির্ভরশীল হতে পারতাম! কত কথা শেখায় এই খোকা তাঁকে। বৈষয়িক লোকদের চণ্ডীমণ্ডপে বসে বাজে কথায় সময় নষ্ট করতে তাঁর যেন ভালো লাগে না আর।
এক মহান শিল্পীর বিরাট প্রতিভার অবদান এই শিশু। ওপরের দিকে চেয়ে বিরাট নক্ষত্রলোক দেখে তিনি কত সময় মুগ্ধ হয়ে গিয়েচেন। সেদিকে চেয়ে থাকাও একটি নীরব ও অকপট উপাসনা। পশ্চিমে তাঁর গুরুর আশ্রমে থাকবার সময় চৈতন্যভারতী মহারাজ কতবার আকাশের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলতেন–ঐ দেখ সেই বিরাট অক্ষরপুরুষ
অগ্নিমূর্ধা চাক্ষুষী চন্দ্ৰসূর্যো
দিশঃ স্রোত্রে বাগবৃত্তাশ্চ বেদাঃ।
বায়ুঃ প্রাণো হৃদয়ং বিশ্বমস্য পঙ্যাং
পৃথিবী হেষ সর্বভূতান্তরাত্মা
অগ্নি যাঁর মস্তক, চন্দ্র ও সূর্য চক্ষু, দিকসকল কর্ণ, বেদসমূহ বাক্য, বায়ু প্রাণ, হৃদয় বিশ্ব, পাদদ্বয় পৃথিবী–ইনিই সমুদয় প্রাণীর অন্তরাত্মা।
তিনিই আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি চক্ষু ফুটিয়ে দিয়ে গিয়েচেন। তিনি শিখিয়েছিলেন যেমন প্রজ্বলিত অগ্নি থেকে সহস্র সহস্র স্ফুলিঙ্গ বার হয় তেমনি সেই অক্ষরপুরুষ থেকে অসংখ্য জীবের উৎপত্তি হয় এবং তাঁতেই আবার বিলীন হয়।
