–আমি যদি খাই তোমরা লেখাপড়া শিখবে? তোমার দিদি কেমন। সংস্কৃত শিখেচে, কেমন বাংলা পড়তে পারে। ভারতচন্দ্র রায়ের কবিতা মুখস্থ করেচে। তোমরা কেবল
নিলু কৃত্রিম রাগের সুরে হাত তুলে বললে–চুপ! কাঁটাল খাওয়ার খোঁটা খবরদার আর দেবেন না কিন্তু
–স্বাধ্যায় কাকে বলে জানো? রোজ কিছু কিছু শাস্ত্র পড়া। ভগবানের কথা জানবার ইচ্ছে হয় না? বৃথা জীবনটা কাটিয়ে দিয়ে লাভ কি?
–আবার!
–আচ্ছা যাক। ভগবানের কথা জানবার ইচ্ছে হয় না?
–আমরা জানি।
–কি জানো? ছাই জানো।
–দিদি বুঝি বেশি জানে আমাদের চেয়ে?
–সে উপনিষদ পড়ে আমার কাছে। উপনিষদ কি তা বুঝতে পারবে না এখন। ক্রমে ক্রমে বুঝবে যদি লেখাপড়া শেখে।
–আপনি এ সব শিখলেন কোথায়?
–বাংলা দেশে এর চর্চা নেই। এখানে এসে দেখচি শুধু মঙ্গলচণ্ডীর গীত আর মনসার ভাসান আর শিবের বিয়ে এইসব। বড় জোর রামায়ণ মহাভারত। এ আমি জেনেছিলাম হৃষিকেশ পরমহংসজির আশ্রমে, পশ্চিমে। তাঁর আর এক শিষ্য ওই যে সেবার এসেছিলেন। তোমরা দেখে আমার চোখ খুলে দিয়েছেন তিনি। তিনি আমার গুরু এই জন্যেই। মন্ত্র দেন নি বটে তবে চোখ খুলে দিয়েচিলেন। আমি তখন জানতাম না, কলকাতায় রামমোহন রায় বলে একজন বড় লোক আর ভারি পণ্ডিত লোক নাকি এই উপনিষদের মত প্রচার করেছিলেন। তাঁর বইও নাকি আছে। সর্ব শুভকরী-কাগজে লিখেচে।
–ওসব খ্রিস্টানি মত। বাপ-পিতেমো যা করে গিয়েচে–
–নিলু, বাপ-পিতামহ কি করেছেন তুমি তার কতটুকু জানো? উপনিষদের ধর্ম ঋষিদের তৈরি তা তুমি জানো? আচ্ছা, এসব কথা আজ থাক। রাত হয়ে যাচ্চে।
–না, বলুন না শুনিবেশ লাগচে।
–তোমার মধ্যে বুদ্ধি আছে, তোমার দিদির চেয়েও বেশি বুদ্ধি আছে। কিন্তু তুমি একেবারে ছেলেমানুযি করে দিন কাটাচ্চ।
বিলু বললে–ওসব রাখুন। আপনি কাঁটাল খান। আমরা কাল থেকে লেখাপড়া শিখবো। দিদির সঙ্গে একসঙ্গে বসে কিন্তু বলবেন আপনি। আলাদা না।
নিলু ততক্ষণে একটা পাথরের খোরায় কাঁঠাল ভেঙ্গে স্বামীর সামনে রাখলো।
ভবানী বললেন–এতগুলো খাবো?
নিলু মাত্র দুটি কোষ তুলে নিয়ে বললে–বাকিগুলো সব খান। কদমার কাঁটাল। কি মিষ্টি দেখুন! নাগর না খেলি আমাদের ভালো লাগে, ও নাগর? এমন মিষ্টি কাঁটালডা আপনি খাবেন না? খান খান, মাথার দিব্যি।
বিলু বললে–কাঁটাল খেয়ে না, একটা বিচি খেয়ে নেবেন নুন দিয়ে। আর কোনো অসুখ করবে না। ওই রে! খোকন কেঁদে উঠলো দিদির ঘরে। দিদি বোধ হয় সারাদিন খাটাখাটুনির পরে ঘুমিয়ে পড়েচে শিগগির যা নিলু
নিলু ছুটে ঘর থেকে বার হয়ে গেল। ঘেঁটুফুলের পাপড়ির মতো সাদা জ্যোৎস্না বাইরে।
.
রামকানাই কবিরাজ গত এক বছর গৃহহীন, আশ্রয়হীন হয়ে আছেন। সেবার তিনদিন নীলকুঠির চুনের গুদামে আবদ্ধ ছিলেন, দেওয়ান রাজারাম অনেক বুঝিয়েছিলেন, অনেক প্রলোভন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুতেই মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াতে রাজি করাতে পারেন নি রামকানাইকে। শ্যামচাঁদের ফলে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন চুনের গুদামে। নীলকুঠির সাহেবদের ঘরে বসে কি তিনি জল খেতে পারেন? জলস্পর্শ করেন নি সুতরাং কদিন। মর-মর দেখে তাঁকে ভয়ে ছেড়ে দেয়। নিজের সেই ছোট্ট দোচালা ঘরটাতে ফিরে এলেন। এসে দেখেন, ঘরটা আছে বটে কিন্তু জিনিসপত্তর কিছু নেই, হাঁড়িকুড়ি ভেঙ্গেচুরে তচনচ করেছে, তাঁর জড়িবুটির হাঁড়িটা কোথায় ফেলে দিয়েছে–তাতে কত কষ্টে সংগ্রহ করা সোঁদালি ফুলের গুঁড়ো, পুনর্ণবা হলহলি শাকের পাতা, ক্ষেতপাপড়া, নালিমূলের লতা এইসব জিনিস শুকনো অবস্থায় ছিল। দশ আনা পয়সা ছিল একটা নেকড়ার পুঁটুলিতে, তাও অন্তর্হিত। ঘরের মধ্যে যেন মত্ত হস্তী চলাফেরা করে বেড়িয়ে সব ওলটপালট, লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গিয়েচে।
চাল ডাল কিছু একদানাও ছিল না ঘরে। বাড়ি এসে যে এক ঘটি জল খাবেন এমন উপায় ছিল না,–না কলসি, না ঘটি।
রামু সর্দারের খুনের মামলা চলেছিল পাঁচ-ছমাস ধরে। শেষে জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এসে তার কি একটা মীমাংসা করে দিয়ে যান।
রামকানাই আগে দুএকটা রোগী যা পেতেন, এখন ভয়ে তাঁকে আর কেউ দেখাতো না। দেখালে দেওয়ান রাজারামের বিরাগভাজন হতে হবে। রামকানাইকে তিন-চার মাস প্রায় অনাহারে কাটাতে। হয়েচে। পৌষ মাসের শেষে রামকানাই অসুখে পড়লেন। জ্বর, বুকে ব্যথা। সেই ভাঙ্গা দোচালায় একা বাঁশের মাচাতে পড়ে থাকেন, কেউ দেখবার নেই, নীলকুঠির ভয়ে কেউ তাঁর কাছেও ঘেঁষে না।
একদিন ফর্সা শাড়ি পরা মেমেদের মতো হাতকাটা জামা গায়ে দেওয়া এক স্ত্রীলোককে তাঁর দীন কুটিরে ঢুকতে দেখে রামকানাই রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
–এসো মা বোসো! তুমি কনে থেকে আসছো? চিনতি পারলাম না যে।
স্ত্রীলোকটি এসে তাঁকে দূর থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলে। বললে–আমারে চিনতে পারবেন না, আমার নাম গয়া।
রামকানাই এ নাম শুনেছিলেন, চমকে উঠে বললেন–গয়ামেম?
–হাঁ বাবাঠাকুর, ঐ নাম সবাই বলে বটে।
–কি জন্যি এসেচো মা? আমার কত ভাগ্যি।
–আপনার ওপর সায়েবদের মধ্যি ছোটসায়েব খুব রাগ করেচে। আর করেচে দেওয়ানজি। কিন্তু বড়সায়েব আপনার ওপর এসব। অত্যাচারের কথা অনাচারের কথা কিছুই জানে না। আপনি আছেন কেমন?
–জ্বর। বুকে ব্যথা। বড় দুর্বল।
