গদাধর মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। চেক ব্যাঙ্ক হইতে ফিরিয়া গেলে লজ্জার সীমা থাকিবে না। অবশ্য অন্য কোনো গদি হইতে টাকাটা ধার করা চলিত–কিন্তু তাহাতে মান থাকে না। সাত-পাঁচ ভাবিয়া গদাধর সেদিন রাত ন’টার পরে শোভার বাড়ী গেলেন। এদিকে ভড়মশায় চিন্তাকুল মুখে আছেন দেখিয়া খাইবার সময় অনঙ্গ জিজ্ঞাসা করিল–কি হয়েচে ভড়মশায়? মুখ ভার-ভার কেন?
–না, কিছু না।
–বলুন না কি হয়েচে-বাড়ীর সব ভালো তো?
–না, সে-সব কিছু না। একটা ব্যাপার ঘটেছে—আপনাকে না ব’লে থাকাও ঠিক না। বাবু কোথায় আগাম চেক্ দিয়েচেন মোটা টাকার। ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে নয়, তাহলে আমার অজানা থাকতো না। তাহলে উনি কোথায় এ-টাকা খরচ করচেন? কথাটা আপনাকে জানানো আমার দরকার। তবে আমি বলেছি, এ-কথা যেন বলবেন না বাবুকে।
অনঙ্গ চিন্তিত-মুখে বলিল–তাই তো ভড়মশায়, আমি কিছু ভাবগতিক তো বুঝচি নে–মেয়ে-মানুষ কি করবো বলুন? কিন্তু ওঁর ভাব যে কত বদলেচে সে আপনাকে কি বলি! বড় ভাবনায় পড়েচি ভড়মশায়। আপনাকে বলব একদিন পরে। উনি আজকাল রাতে প্রায়ই বাড়ি আসেন না। দোল-পুন্নিমের দিন দেখলেনই তো!
–হ্যাঁ, সে-কথা বাবুকে জিগ্যেস করেচিলেন?
করেচিলাম। বললেন, ব্যবসার কাজ ছিল। আজকাল আমার ওপর রাগ-রাগ ভাব–সব-সময় কথা বলতে সাহস পাই নে। উনি কেমন যেন বদলে গিয়েচেন–কখনো তো উনি এরকম ছিলেন না! এখন ভাবচি, আমাদের কলকাতায় না এলেই ভালো ছিল। বেশ ছিলাম দেশে। কালীঘাটের মা-কালীর কাছে মানত করেচি, জোড়া পাঁটা দিয়ে পুজো দেবো–ওঁর মতিগতি যেন ভালো হয়ে ওঠে। বড় ভাবনায় আছি। আর কার কাছে কি বলবো বলুন, এখানে আমার কে আছে এক আপনি ছাড়া।
অনঙ্গ আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিল।
ভড়মশায় চিন্তিত-মুখে বলিলেন–তাই তো, আমাকে বললেন মা–ভালো হলো। এত কথা তো আমি কিছুই জানতাম না। এখন বুঝতে পারচি নে কি করা যায়। আমারও তো যাবার সময় হলো।
অনঙ্গ বলিল–আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না ভড়মশায়। কলকাতায় আপনার যত অসুবিধাই হোক, ওঁকে এ-অবস্থায় ফেলে আপনি যেতে পারবেন না। আমার আর কেউ নেই ভড়মশায়–কে ওঁকে দেখে! এখানে ওই শচীন ঠাকুরপো হয়েচে ওঁর শনি। আর ওই নির্মল–ওদের সঙ্গে মিশেই এ-রকম হয়েচেন–আমাকে এ-আথান্তরে ফেলে আপনি চলে যাবেন না।
–আচ্ছা বৌ-ঠাকরুণ, এ-সব কথা আর কারো কাছে আপনি বলবেন না। আমি না হয় এখন দেশে না যাবো–আপনি কাঁদবেন। না। চোখের জল মুছে ফেলুন–সতীলক্ষ্মী আপনি, হাতে করে বিয়ে দিয়ে ঘরে এনেচি–মেয়ের মত দেখি। আপনাদের ফেলে গেলে ধর্মে সইবে না। দেখি কি হয়–অত ভাববেন না।
ভড়মশায় বিদায় লইলেন।
গদাধর শোভার বাড়ী গিয়া শুনিলেন, সে এইমাত্র স্টুডিও হইতে ফিরিয়া খাইতে বসিয়াছে। সুতরাং তিনি বাহিরের ঘরে বসিয়া রহিলেন। একটু পরে শোভা ঢুকিয়া একটা প্লেটে গোটাকয়েক সাজা পান গদাধরের সামনে টিপয়ে রাখিয়া, তাহা হইতে একটা পান তুলিয়া মুখে দিল। কোনো কথা বলিল না।
গদাধর বলিলেন–বোসো শোভা, তোমার কাছে একটা কাজে এসেছিলাম।
শোভা নিজের ঈজিচেয়ারটাতে বসিয়া বলিল–কাজ কি, তা তো বুঝতে পেরেছি, তার উত্তরও দিয়েচি সেদিন।
–সে কাজ নয় শোভা। বড় বিপদে পড়ে এসেছি তোমার কাছে। একজনকে চেক দিয়েচি ছ’হাজার টাকার–কাল ব্যাঙ্কে চেক দাখিল করে ভাঙাবার তারিখ–অথচ টাকা নেই ব্যাঙ্কে। কালই ছ’হাজার টাকা বেলা দশটার সময় জমা দিতে হবে– অথচ আমার হাতে নেই টাকা! সব টাকা মোকামে আবদ্ধ। এখন কি করি–কাল মান যায়, তাই তোমার কাছে এসেচি!
শোভা বিস্ময়ের সুরে বলিল–আমি কি করবো?
–টাকাটা এক মাসের জন্য ধার দাও–আমি হ্যাণ্ডনোট দিচ্চি– মোকাম থেকে টাকা এলে শোধ করে দেবো। এই উপকারটা কর আমার। বড় বিপদে পড়ে তোমার কাছে এসেচি!
শোভা বলিল–আমি তো হ্যাণ্ডনোটের ব্যবসা করি নে– মহাজনী কারবারও নেই আমার। আমার কাছে এসেচেন টাকা ধার নিতে, বেশ মজার লোক তো আপনি! আপনার কলকাতায় বাড়ী আছে, মর্টগেজ রাখলে যে-কোন জায়গা থেকে ধার পাবেন। ব্যাঙ্ক থেকেই তো ওভারড্রাফট নিতে পারেন!
গদাধর দুঃখিতভাবে বলিলেন–সে-সব করা তো চলে, কিন্তু তাতে বাজারে ক্রেডিট থাকে না ব্যবসাদারের। ব্যাঙ্কে ওভারড্রাফট নেওয়া চলবে না–বাড়ী বন্ধক দেওয়াও নয়। আছে অনঙ্গর গহনা, তা কি এখন বিক্রি করতে যাবো?
শোভা নিস্পৃহ ভাবে বলিল–কিন্তু আমি সেজন্যে দায়ী নই। আমার কাছে কেন এসেচেন? আপনার বোঝা উচিত ছিল আমার কাছে আসবার আগে যে, আমি পোদ্দার নই, টাকা ধারের ব্যবসাও করি নে।
-তা হোক, তুমি দাও, ও-টাকাটা তোমার আছে খুবই আমার বড় উপকার করা হবে।
প্রায় ঘন্টাখানেক ধরিয়া উভয়ের কথাবার্তা চলিল। শোভা কিছুতেই টাকা দিবে না, গদাধরও নাছোড়বান্দা। অবশেষে বহু অনুনয়-বিনয়ের পরে শোভা চার হাজার টাকা দিতে নিমরাজিগোছের হইল–বাকি টাকা দিতে সে পারিবে না, স্পষ্ট বলিল–গদাধর অন্য যেখান হইতে পারেন, সে টাকা যোগাড় করুন–
গদাধর বলিলেন–তবে চেকখানা লিখে ফেল–আমি হ্যাণ্ডনোট লিখি–সুদ কত লিখবো?
সাড়ে বারো পার্সেন্ট।
–ওটা সাড়ে-নয় করে নাও। তুমি তো আর সুদখোর মহাজন নও? উপকার করবার জন্যে তো দিচ্চো–সুদের লোভে দিচ্চো না তো!
