গদাধর পড়িয়া দেখিয়া বলিলেন–তাই তো! বেশ ভালো গান?
–শুনবেন নাকি?
–হ্যাঁ হ্যাঁ, তা মন্দ কি! বাজাও না।
শোভা রেকর্ডখানা গদাধরের হাত হইতে লইয়া পাশের ঘরে বড় ক্যাবিনেট গ্রামোফোনে চড়াইয়া দিয়া আসিল। গদাধর গানের বিশেষ কিছু বোঝেন না, ভদ্রতার খাতিরে একমনে শুনিবার ভান করিয়া বসিয়া রহিলেন। রেকর্ড শেষ হইলে মুখে কৃত্রিম উৎসাহের ভাব আনিয়া বলিলেন–বেশ, বেশ, ভারি চমৎকার। ওখানাও দাও, শুনি।
শোভা কিন্তু নিজে একবারও জিজ্ঞাসা করিল না, গান কি রকম হইয়াছে। বোধহয় গদাধরের নিন্দা বা সুখ্যাতির উপর সে কোনো আস্থা রাখে না। রেকর্ড বাজানো শেষ হইয়া গেল। শোভা একবার ঘড়ির দিকে চাহিল। গদাধর ইঙ্গিত বুঝিতে পারিলেন। এইবার বোধহয় শোভা উঠিবার জন্য ব্যস্ত হইয়াছে, দশটা প্রায় বাজে। অনিচ্ছার সহিত তাঁহাকে বলিতে হইল–আচ্ছা, আমি তাহ’লে আসি।
–আসুন।
–আমার কথার কোনো উত্তর দিলে না তো?
–কি কথা, বুঝলাম না!
–আমার ফিল্ম কোম্পানিতে কন্ট্রাক্ট করার।
শোভা গম্ভীর মুখে বলিল–আপনি আমার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করুন, এ-কথা আমি আপনাকে বলচি নে। তবুও কন্ট্রাক্ট করার আগে আমায় বললে পারতেন। আপনার টাকা গেল, তাতে আমার কিছুই নয়। আপনার টাকা আপনি খরচ করবেন, তাতে আমার কি বলার থাকতে পারে! কিন্তু আপনি যে-কাজ জানেন না, সে-কাজে না নামাই আপনার উচিত ছিল। অবিশ্যি আমি এমনি বললাম। আপনাকে বাধাও দিচ্ছি নে বা বারণও করচি নে। আপনার বিবেচনা আপনি করবেন।
–তোমার কি মনে হয়, এ-ব্যবসা লাভের হবে না?
–আমার কিছুই মনে হয় না। আমায় জড়াচ্ছেন কেন এ-কথায়?
–না, বললে কিনা কথাটা, তাই বলচি।
–আমার যা মনে হয়, তা আপনাকে আমি বললাম। ফিল্ম কোম্পানি খুলে সকলে যে লাভবান হয়, লক্ষপতি হয়, তা নয় বলেই ধারণা। অঘোরবাবু অবিশ্যি দু-তিনটে ফিল্ম কোম্পানিতে ছিলেন, কাজ বোঝেন–তবে অনেস্ট কিনা জানি না। আপনি করেন অন্য ব্যবসা, এর মধ্যে আপনি না নামলেই ভালো করতেন।
তুমি বড় নিরুৎসাহ করে দাও কেন লোককে! নামচি একটা শুভ কাজে–তুমি আসবে কিনা বলো!
–দোহাই আপনার গদাধরবাবু, আমি কিছু নিরুৎসাহ করি। নি। আপনি দমবেন না। তবে আমার কথা যদি বলেন, আমার আসা হবে না।
–এই উত্তর শোনবার জন্যে আজ সকালে তোমার এখানে এসেছিলাম আমি? মনে বড় কষ্ট দিলে শোভা। আমার বড় আশা ছিল, তোমাকে আমি পাবোই।
শোভা রাগের সুরে বলিল–আপনি পাটের ব্যবসা করে এসেচেন, অন্য ব্যবসার কথা আপনি কি বোঝেন যে যা-তা বলতে আসেন? প্রথম আমি তো ইচ্ছে করলেই যেতে পারি নে– এদের স্টুডিওতে আমার এখনও এক-বছরের কন্ট্রাক্ট রয়েচে। তাছাড়া আমি একটা নিশ্চিত জিনিস ছেড়ে অনিশ্চিতের পেছনে ছুটবো, এত বোকা আমায় ঠাউরেছেন?
–আমার কোম্পানি অনিশ্চিত?
–তা না তো কি? আপনি ও-কাজ বোঝেন না। পরের হাতে খেলতে হবে আপনাকে। এক ব্যবসায় টাকা রোজগার করে অন্য এক ব্যবসাতে ঢালচেন–কারো সঙ্গে পরামর্শ করেন নি। ওতে আমার সাহস হয় না–এক কথায় বললাম।
–আচ্ছা, আমি যদি তোমার সঙ্গে পরামর্শ করতাম, কি পরামর্শ দিতে?
–সে-কথায় দরকার নেই। কারো কথার মধ্যে আমি কখনো থাকি নে গদাধরবাবু, আমায় মাপ করবেন। বিশেষ করে এর মধ্যে রেখা, সুষমা রয়েচে–ওরা সকলেই আমার বন্ধুলোক, এক স্টুডিওতে কাজ করেচি অনেক দিন। অঘোরবাবুকে আমি কাকাবাবু বলে ডাকি। উনিও আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। অতএব আমি এ কথার মধ্যে থাকবো না।
-তা হচ্চে না, আমার কথার উত্তর দাও–তুমি কি পরামর্শ দিতে?
শোভা ধমকের সুরে বলিল–ফের আবার ওই কথা! ওর উত্তর আমার কাছে নেই। আচ্ছা, আমাকে কেন আপনি এর মধ্যে জড়াতে চান, বলতে পারেন? আমি কারো কথায় কখনো থাকি নে। তবুও আমি কখনও আপনাকে এ পরামর্শ দিতাম না।
–দিতে না?
–না। ব্যস, আপনি এখন আসুন। আমি এক্ষুনি উঠবো, অনেক কাজ আছে আমার।
গদাধর কিঞ্চিৎ অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিদায় লইতে বাধ্য হইলেন।
.
০৬.
ইহার দুইদিন পরে ভড়মশায় গদিতে বসিয়া কাজ করিতেছেন, গদাধর বলিলেন–তেরো তারিখে একটা চেক ডিউ আছে ভড়মশায়, ছ’হাজার টাকা জমা দিতে হবে ব্যাঙ্কে।
ভড়মশায় মনিবের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন– ছ’হাজার টাকা এই ক’দিনের মধ্যে? টাকা তো মোকামে আটকে আছে–এখন এত টাকা এই ক’দিনের মধ্যে কোথায় পাওয়া যাবে বাবু?
-তা হবে না। চেষ্টা দেখুন, পথ হাতড়ান।
–এত টাকার চেক্ কাকে দিলেন বাবু?
অন্য কর্মচারী হইলে মনিবকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিত না হয়তো–কিন্তু ভড়মশায় পুরাতন বিশ্বস্ত কর্মচারী, ঘরের লোকের মত–তাঁহার পক্ষে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র অধিকার। কথাটা এড়াইবার ভঙ্গিতে গদাধর বলিলেন–ও আছে একটা– ইয়ে–তাহলে কি করবেন বলুন তো?
ভড়মশায় চিন্তিত মুখে বলিলেন–দেখি, কি করতে পারি! বুঝতে পারচি নে!
কিন্তু কয়দিন নানাপ্রকার চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থমনোরথ হইয়া ভড়মশায় বারো তারিখে মনিবকে কথাটা জানাইলেন। মোকামে টাকা আবদ্ধ আছে, এ-কদিনের মধ্যে কাঁচামাল বেচিয়া টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। তিনটি মিলের পাটের মোটা অর্ডার কন্ট্রাক্ট করা আছে, তিন মোকাম হইতে সেই অর্ডার-মাফিক পাট ক্রয় চলিতেছে–সে টাকা অন্যক্ষেত্রে ঘুরাইয়া আনিতে গেলে, মিলে সময়মত পাট দেওয়া যায় না।
