–সে অনেক কথা। নিতু নিতেও এসেছিল, বটঠাকুর বললেন–যাও, কিন্তু আমার এখানে আর আসতে পাবে না। সীতার শ্বশুরবাড়ির লোক ভাল না এখন দেখচি–তারাও বটঠাকুরের হাতের লোক, বললে, তা হলে মেয়ে-জামায়ের সঙ্গে সম্বন্ধ ঘুচে যাবে। মেয়ে তারা আর পাঠাবে না। বৌমাকেও এখনও দেখিনি, এমনি আমার কপাল। বটঠাকুর সেই বউকে এ-বাড়ি নাকি ঢুকতে দেবেন না। তা নিতু আমায় লিখলে, মা, এই কটা মাস যাক–কোথায় নাকি ভাল চাকরি পাবে–এখানে পাড়াগাঁয়ে বাসাও পাওয়া যায় না। আমি আবার গিয়ে ওর শ্বশুরবাড়ি উঠবো সেটা ভাল দেখাবে না। মাঘ মাসে একেবারে নিয়ে যাবে এখান থেকে। এই তো নিতু ওমাসেও এসেছিল। আহা, বাছাকে কি অপমান করলে সবাই মিলে। আমার কপালে কেবল চারিদিকে অপমান ছাড়া আর কিছু জোটে না–
কেন চাকরি ছেড়ে দিলাম? কেন এভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়াই? এখন দেখতে পাচ্চি সীতার বিবাহ হয়ে গেলেই আমার কর্তব্য শেষ হয়েচে ভাবা উচিত ছিল না। মাকে আমি উপেক্ষা করে এসেচি এতদিন, দাদা সাধ্যমত অবিশ্যি করেচে–কিন্তু আমি কিছুই করিনি। কেন আমার এমন ধারা মতিগতি হ’ল? কোথায় আমার কর্তব্য, সে সম্বন্ধে আমি অন্ধ ছিলাম কেন?
লজ্জিত ও অনুতপ্ত সুরে বললাম–মা আঙুর খাবে?… আঙুর এনেছি, ভাল আঙুর শেয়ালদ’ থেকে–
–ভূতোকে বললাম, একটা আলো নিয়ে আয়, তা দেয়নি দেখচি–বলতে বলতে ছোট-কাকীমা ঘরের দোরের কাছে এসে আমায় দেখে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন–কে বসে ওখানে?
আমি অপরাধীর মত কুণ্ঠিত স্বরে বললাম–আমি, কাকীমা।
এগিয়ে এসে বললেন–কে নিতু?
—না, আমি।
কাকীমা অবাক হয়ে বললেন–ওমা, জিতু যে দেখচি, কোত্থেকে, কি ভাগ্যি তোমার মায়ের? তারপর, কি মনে করে?
আমি মাথা হেঁটে ক’রে বসে রইলাম, কি আর বলব।
কাকীমা বললেন–তোমার কাণ্ডজ্ঞান যে কবে হবে, তা ভেবেই পাই নে। একেবারে একটা বছর নিরুদ্দেশ নিখোঁজ।–আর এই এ-ভাবে মাকে ফেলে রেখে! তোমাদের একটু জ্ঞান নেই যে এটা কার বাড়ি? এখানে কে দ্যাখে তোমার মাকে? সবই তো জান– বয়েস হয়েছে, এখনও বুদ্ধি হ’ল না? বটঠাকুর বাড়ি নেই, একটা ডাক্তার-বদ্যি কে দেখায় তার নেই ঠিক। হরি ডাক্তারকে একবার আনতে হয়–টাকাকড়ি কিছু আছে? নেই বোধ হয়, সে দেখেই বুঝিচি–নেই। আচ্ছা, টাকা আমি দেব এখন, ভেব না, ডাক্তার আন।
ছোটকাকীমার পায়ের ধুলো নেবার ইচ্ছা হ’ল। এ বাড়িতে সবাই পশু, সবাই অমানুষ–সত্যিকারের মেয়ে বটে ছোটকাকীমা।
রাত্রেই ডাক্তার এল। ওষুধপত্রও হ’ল। দাদাকে পত্র দিলাম পরদিন সকালে।
আমায় নিয়ে খুব হৈ-চৈ হ’ল। জ্যাঠাইমা আমায় রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে খেতে দেবেন না–আমি জাতবিচার মানি নে, বাগদি দুলে সবার হাতে খেয়ে বেড়াই, এ-সব কথা কে এসে গাঁয়ে বলেচে। নানা রকম অলঙ্কার দিয়ে কথাটা রাষ্ট্র হয়েচে গাঁয়ে।
মায়ের অবস্থা শেষরাত থেকে বড় খারাপ হ’ল। সকালে আমাকে আর চিনতে পারেন না–ভুল বকতেও লাগলেন।
সন্ধ্যার সময় একটা মিটমিটে টেমি জ্বলচে ঘরের মেজেতে–আমি একা বসে আছি মায়ের শিয়রে, এমন সময় বাইরে উঠোনে একখানা গরুর গাড়ি এসে দাঁড়াবার শব্দ হ’ল। একটু পরেই ব্যস্তসমস্ত ভাবে মাটিতে আঁচল লুটোতে লুটোতে সীতা ঘরে ঢুকল। আমায় দেখে বললে, ছোড়দা?
আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম। সীতা একেবারে বদলে গিয়েছে, মাথায় কত বড় হয়েচে, দেখতেও কি সুন্দর হয়েছে–ওকে চেনা যায় না আর।
মাকে বললাম–মা, ওমা, সীতা এসেচে–
মা চাইলেন, কি বললেন বোঝা গেল না। বোধ হয় বুঝতে পারলেন না যে সীতা এসেচে।
সীতা খুব শক্ত মেয়ে। সে কেঁদেকেটে আকুল হয়ে পড়লো না। আমায় বললে– ছোড়দা, আমার বালাজোড়াটা দিচ্চি, তাই দিয়ে ভাল ডাক্তার নিয়ে এস। এখানকার হরিডাক্তার তো? তার কাজ নয়।
আমি অক্ষমতার লজ্জায় কুণ্ঠিত সুরে বললাম–তার পর তোর শ্বশুরবাড়ির লোকে তোকে বকবে। সে কি করে হয়–
সীতা বললে–ইস! বকবে কিসের জন্যে, বালা কি ওদের? মায়ের বালা, মা দিয়েছিলেন বিয়ের সময়। বাবা গড়িয়ে দিয়েছিলেন মাকে। তুমি বালা নিয়ে যাও, তারপর ওরা যা বলে বলবে–
এই সময় সীতার স্বামী ঘরে ঢুকল। আমি যে-রকম চেহারা কল্পনা করেছিলাম, লোকটা তার চেয়েও খারাপ। কালো তো বটেই, পেটমোটা, বোধ হয় পিলে আছে, কাঠখোট্টা গড়ন, চোয়ালের হাড় উঁচু–গায়ে একটা ছেলেমানুষের মত ছিটের জামা, একটা রাঙা আলোয়ান, পায়ে কেম্বিসের জুতো। আমায় দেখে দাঁত বার করে হেসে বললে–এই যে, ছোটবাবু না? কখন আসা হ’ল, বড়বাবু বুঝি এখনও আসবার ফুরসত পাননি–তার পর অসুখটা কি?…এখন কেমন আছেন?
তারপর সে খানিকক্ষণ বসে থেকে বললে–বসো তোমরা। আমি জ্যাঠাইমাদের সঙ্গে দেখা করে আসি–একটু চায়ের চেষ্টাও দেখা যাক, গরুর গাড়িতে গা-হাত ব্যথা হয়ে গিয়েচে।
ওর কথার ভঙ্গিতে একটা চাষাড়ে ভাব মাখানো। এই লোকটা সীতার স্বামী! সীতার মত মেয়ের! সীতাকেও আমরা সবাই মিলে উপেক্ষা করচি।
এই সময় হঠাৎ শৈলদিদির কথা আমার মনে পড়ল। শেয়ালদ’ স্টেশনে ছোট বৌঠাকরুন বলেছিল শৈলদি এখানে আছে। সীতার বালাজোড়াটা নেব না–ওকে তার জন্যে অনেক দুঃখ পোয়াতে হবে সেখানে। ও যে-রকম চাপা মেয়ে, কোন অভিযোগ করবে না কখনও কারু কাছে। শৈলদিদির কাছ থেকে টাকা ধার নেবো, মায়ের অসুখের পর যে-ক’রে হোক দেনা শোধ হবেই।
