শেয়ালদ’ স্টেশনের কাছে একটা দোকান থেকে আঙুর কিনে নেবো ভাবলাম, পকেটেও বেশী পয়সা নেই। পয়সা গুনচি দাঁড়িয়ে, এমন সময় দূর থেকে মেয়েদের বিশ্রাম ঘরের সামনে দণ্ডায়মানা একটি নারীমূর্তির দিকে চেয়ে আমার মনে হ’ল দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা আমার পরিচিত। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পারলাম না–আঙুর কিনতে চলে গেলাম। ফিরবার সময় দেখি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের কাছে একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শ্রীরামপুরের ছোট বৌঠাকরুন। আমি কাছে যেতেই বৌঠাকরুন চমকে উঠলেন প্রায়। বললেন–আপনি! কোত্থেকে আসচেন? এমন চেহারা?
আমি বললুম–আপনি একটু আগে মেয়েদের ওয়েটিং রুমের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন?
হ্যাঁ, এই যে আমরা এখন এলাম যোগবাণীর গাড়ীতে–আমরা শ্রীরামপুরে যাচ্চি। ইনি মেজদা–এঁকে দেখেন নি কখনও?
যুবকটি আমায় বললে–আপনি তাহলে একটু দাঁড়ান দয়া ক’রে–আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আসি–এখানে দরে বনচে না–
সে চলে গেল। ছোট-বৌঠাকরুন বললেন–মাগো কি কালীমূর্তি চেহারা হয়েছে! বড়দি বলছিল আপনি নাকি কোথায় চলে গিয়েছিলেন, খোঁজ নেই–সত্যি?
–নিতান্ত মিথ্যে কি করে বলি! তবে সম্প্রতি দেশে যাচ্চি।
ছোট-বৌঠাকরুন হাসিমুখে চুপ করে রইলেন একটু, তারপর বললেন–আপনার মত লোক যদি কখনও দেখে থাকি! আপনার পক্ষে সবই সম্ভব। জানেন, আপনি চলে আসবার পরে বড়দির কাছ থেকে আপনার সম্বন্ধে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে করে শুনেচি। তখন কি অত জানতাম? বড়দি বাপের বাড়ি গিয়েচে আশ্বিন মাসে–আপনার সঙ্গে দেখা হবে’খন। আচ্ছা, আর শ্রীরামপুরে গেলেন না কেন? এত ক’রে বললাম, রাখলেন না কথা? আমার ওপর রাগ এখনও যায়নি বুঝি?
–রাগ কিসের? আপনি কি সত্যি ভাবেন আমি আপনার ওপর রাগ করেছিলাম?
ছোট-বৌঠাকরুন নতমুখ চুপ করে রইলেন।
—বলুন!
ছোট-বৌঠাকরুন নতমুখেই বললেন–ও কথা যাক। আপনি এ-রকম ক’রে বেড়াচ্ছেন কেন? পড়াশুনো করলেন না কেন?
–সে সব অনেক কথা। সময় পাই তো বলব একদিন।
–আসুন না আজ আমাদের সঙ্গে শ্রীরামপুরে? দিনকতক থেকে যান, কি চেহারা হয়ে গিয়েছে আপনার! সত্যি, আসুন আজ।
–না, আজ নয়, দেশে যাচ্চি, খুব সম্ভব মায়ের বড় অসুখ–
ছোট-বৌঠাকরুন বিস্ময়ের সুরে বললেন–কই সে কথা তো এতক্ষণ বলেননি! সম্ভব মানে কি, চিঠি পেয়েচেন তো, কি অসুখ?
একটু হেসে বললাম–না, চিঠি পাইনি। আমার ঠিকানা কেউ জানতো না। স্বপ্নে দেখেচি–
ছোট-বৌঠাকরুন একটু চুপ করে থেকে মৃদু শান্ত সুরে বললেন–আমি জানি। তখন জানতাম না আপনাকে, তখন তো বয়সও আমার কম ছিল। বড়দি তার পরে বলেছিল। একটা কথা রাখবেন? চিঠি দেবেন একখানা? অন্তত একখানা লিখে খবর জানাবেন?…
ছোট-বৌঠাকরুন আগের চেয়ে সামান্য একটু মোটা হয়েছেন, আর চোখে সে বালিকাসুলভ তরল ও চপল দৃষ্টি নেই, মুখের ভাব আগের চেয়ে গম্ভীর। আমি হেসে বললাম–আমি চিঠি না দিলেও, শৈলদির কাছ থেকেই তো জানতে পারবেন খবর–
এই সময় ওঁর মেজদাদা ট্যাক্সিতে চড়ে এসে হাজির হলেন। আমি বিদায় নিলুম।
সন্ধ্যার সময় আটঘরা পৌঁছে দেখি সত্যিই মায়ের অসুখ। আমাদের ঘরখানায় মেঝের ওপর পাতা বিছানায় মা শুয়ে। অন্ধকারে আমায় চিনতে না পেরে ক্ষীণস্বরে বললে–কে ওখানে, হারু?
তারপর আমায় দেখে কেঁদে উঠে বললেন–কে জিতু, আয় বাবা আয়, এতদিন পরে মাকে মনে পড়লো তোর? আয় এই বালিশের কাছে আয়–ওমা, এ কি হয়ে গিয়েছিস রে! রোগা কালো চেহারা–ওরা সত্যিই বলত তো!
মা একটি ঘরে শুয়ে–জনপ্রাণী কেউ কাছে নেই। সন্ধ্যা হব-হব, ঘরে একটা আলো পর্যন্ত কেউ জ্বালেনি। এমনিই বাড়ি বটে! কেন, এত ছেলে মেয়ে বৌ বাড়িতে, একজন কাছে থাকতে নেই? অথচ—, কিন্তু পরের দোষ দিয়ে লাভ কি, আমিই বা কোথায় ছিলুম এতদিন?
বললাম–মা, দাদা কোথায়? সীতা আসেনি?
মা নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। বললেন–ওরা কেউ চিঠি দেয় না, ব’লে ব’লে আজ বুঝি হারু একখানা পত্র দিয়েচে সীতাকে।
–ক’দিন অসুখ হয়েছে তোমার, মা? ওরা কেউ দেখে না? জ্যাঠাইমা কাকিমারা আসে না?
–ভুবনের মা মাঝে মাঝে আসে। এই বিকেলে সাবু দিয়ে গেল–তা সাবু কি খেতে পারি, ওই রয়েছে বাটিতে। ছোটবৌ এসেছিল বিকেলবেলা। বটঠাকুর বাড়ি নেই বুঝি– আর কেউ এদিকে মাড়ায় না।
তারপর আমার গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন–হ্যাঁরে জিতু, তুই নাকি সন্নিসী হয়ে গিয়েচিস–দিদি, হারু, মেজবৌ, ঠাকুরপোরা সবাই বলে–সত্যি? বলে সে আর আসবে না, সে কোন দিকে বেরিয়ে চলে গিয়েছে, তার ঠিকানা কেউ জানে না। আমি ভাবি জিতু আমায় ভুলে যাবে এমনি হবে? আবার ভাবি আমার কপাল খারাপ, নইলে এ-সব হবেই বা কেন–ভেবে ভেবে রাত জেগে বসে থাকি।
–কেঁদো না, কেঁদো না, ছিঃ! ওসব মিথ্যে কথা। কে বলেচে সন্নিসী হয়ে গেছি! এই দ্যাখ না সাদা কাপড় পরনে, সন্নিসী কি সাদা কাপড় পরে?
মনে বড় অনুতাপ হ’ল–কি অন্যায় কাজ করেচি এতদিন এভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে! আর এদেরও কি অন্যায়, সবাই মিলে মাকে এমন করে ভয় দেখানোই বা কেন, মা সরল মানুষ, সকলের কথাই বিশ্বাস করেন। কিন্তু আমার দোষ ছিল না, আমি ভেবেছিলাম মা আছেন দাদার কাছে। নিশ্চিন্ত ছিলুম অনেকটা সেজন্যে। জিজ্ঞেস করলাম–মা, দাদা তোমায় নিয়ে যায়নি?
