একবার বাড়ির মধ্যে গিয়ে দেখি সীতার স্বামী ওদের রান্নাঘরে বসে হুঁকো হাতে তামাক খেতে খেতে খুব গল্প জমিয়েচে–আমার খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভায়েদের সকলেরই প্রায় বিয়ে হয়ে গিয়েছে এবং বৌয়েরা সকলেই ওর শালাজ–তাদের সঙ্গে।
রাত দশটার সময় শৈলদিদি এসে হাজির। আমায় দেখে বললে–এই যে সন্নিসী ঠাকুর ফিরে এসেচ দেখচি। এই যে সীতা–এস এস, সাবিত্রীসমান হও, কখন এলে ভাই? আমি শুনলাম এই খানিকটা আগে, আমাদের ও-পাড়ায় কে খবর দেবে বল।
আমি আর সীতা শুধু ঘরে মায়ের পাশে বসে। সীতার স্বামী খেয়ে-দেয়ে শুয়েচে, অবিশ্যি সে বসে থাকতে চেয়েছিল–আমি বলেছিলাম, তার দরকার নেই তুমি খেয়ে একটু বিশ্রাম কর–দরকার হলে ডাকব রাত্রে।
শৈলদিদি রাত্রে থাকতে চাইলে, বললে–আজ রাতে লোকের দরকার। তোরা দুটিতে মোটে বসে আছিস। আমি খেয়ে আসি, আমিও থাকব।
আমি বললাম–না শৈলদি, আমরা দুজন আছি, ভগ্নীপতি এসেচে–তোমার আর কষ্ট করতে হবে না।
তারপর বাইরে ডেকে টাকার কথা বললাম। শৈলদি বললে–কত টাকা?
—গোটাকুড়ি দাও গিয়ে এখন। কাল সকালেই আমি তা হ’লে চলে যাই ডাক্তার আনতে–
–তা হলে কাল সকালে যাবার সময় আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবি। ওখান দিয়েই তো পথ–কেমন তো?
ছোটকাকীমা এই সময় এলেন। শৈলদিকে দেখে বললেন–জিতুর মাকে নিয়ে বেজায় মুশকিল হয়েচে ভাই–ওরা ছেলেমানুষ, কি বা বোঝে–নিতু এখনও তো এল না। হঠাৎ চার পাঁচ দিনের জ্বরে যে মানুষ এমন হয়ে পড়বে তা কি ক’রেই বা জানবো। তবুও তো জিতু কোথা থেকে ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল তাই রক্ষে।
রাতে জ্যাঠাইমাও এসে খানিকটা বসে রইলেন। অনেক রাত্রে সবাই চলে গেল, আমি সীতাকে বললাম–তুই ঘুমিয়ে নে সীতা। আমি জেগে থাকি। রাতে কোন ভয় নেই।
সকাল বেলা আটটা-নটার পর থেকে মা’র অবস্থা খুব খারাপ হ’ল। দশটার পর দাদা এল–সঙ্গে বৌদিদি ও দাদার খোকা। বৌদিদিকে প্রথম দেখেই মনে হ’ল শান্ত, সরল, সহিষ্ণু মেয়ে। তবে খুব বুদ্ধিমতী নয়, একটু অগোছালো আনাড়ি ধরনের। নিতান্ত পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, বাইরে কোথাও বেরোয়নি বিশেষ, এই বোধ হয় প্রথম, কিছু তেমন দেখেও নি। গরম জলের বোতল পায়ে সেঁক করতে হবে শুনে ব্যাপারটা না বুঝতে পেরে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বিপন্ন মুখে সীতার দিকে চেয়ে রইল। কাপড়-চোপড় পরবার ধরনও অগোছালো–আজকালকার মত নয়। বৌদিদি যেন বনে-ফোঁটা শুভ্র কাঠমল্লিকা ফুল, তুলে এনে তোড়া বেঁধে ফুলের দোকানে সাজিয়ে রাখবার জিনিস নয়। আর একেবারে অদ্ভুত ধরনের মেয়েলী, ওর সবটুকুই নারীত্বের কমনীয়তা মাখানো।
সীতা আমায় আড়ালে বললে–চমৎকার বৌদি হয়েচে, ছোড়দা। আহা, মা যদি একটিবারও চোখ মেলে চেয়ে দেখতেন। আমাদের কপাল!
বেলা তিনটের সময় মা মারা গেলেন। যে মায়ের কথা তেমন করে কোন দিন ভাবি নি, আমাদের কাজকর্মে, উদ্যমে, আশায়, আকাঙ্ক্ষায়, উচ্চাভিলাষে মায়ের কোন স্থান ছিল না, সবাই মিলে যাকে উপেক্ষা করে করে এসেচি এত দিন–আজ সেই মা কতদূরে কোথায় চলে গেলেন–সেই মায়ের অভাবে হঠাৎ আমরা অনুভব করলাম। অনেকখানি খালি হয়ে গিয়েচে জীবনের। ঘরের মধ্যে যেমন প্রকাণ্ড ঘরজোড়া খাট থাকে, আজন্ম তার ওপর শুয়েচি, বসেছি, খেলেছি, ঘুমিয়েচি, সর্বদা কে ভাবে তার অস্তিত্ব, আছে তো আছে। হঠাৎ একদিন খাটখানা ঘরে নেই–ঘরের পরিচিত চেহারা একেবারে বদলে গিয়েছে–সে ঘরই যেন নয়, একদিন ঘরের সে নিবিড় সুপরিচিত নিজস্বতা কোথায় হারিয়ে গেল, তখন বোঝা যায় ঘরের কতখানি জায়গা জুড়ে কি গভীর আত্মীয়তায় ওর সঙ্গে আবদ্ধ ছিল সেই চিরপরিচিত একঘেয়ে সেকেলে খাটখানা–ঘরের বিরাট ফাঁকা আর কিছু দিয়েই পূর্ণ হবার নয়।
সীতার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙলো। সে ছোট মেয়ের মত কেঁদে আবদার করে যেন মাকে জড়িয়ে থাকতে চায়। মা আর সে দুজনে মিলে এই সংসারে সকালে-সন্ধ্যায় খেটে দুঃখের মধ্যে দিয়ে পরস্পরের অনেক কাছাকাছি এসেছিল–সে-সব দিনের দুঃখের সঙ্গিনী হিসাবে মা আমাদের চেয়েও ওর কাছে বেশী আপন, বেশী ঘনিষ্ঠ–অভাগী এত দিনে সত্যি সত্যি নিঃসঙ্গ হ’ল সংসারে। ওর স্বামী যে ওর কেউ নয়, সে আমার বুঝতে দেরি হয় নি এতটুকু। কিন্তু ও হয়ত এখনও তা বোঝেনি।
দিন দুই পরে বৌদিদি দুপুরবেলায় ওদের রান্নাঘরে একটা ঘড়া আনতে গিয়েছেন। জ্যাঠাইমা বলেচেন-ওখানে দাঁড়াও, দাওয়াটাতে–অমনি হট করে ঘরে ঢুকলে যে?
বৌদিদি অবাক হয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েচেন, জ্যাঠাইমা ঘড়া বার করে দিয়েচেন দাওয়াতে। বৌদিদি নিয়ে এসেছে, কিন্তু বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা কি, বুদ্ধিমতী মেয়ে হ’লে তখনই বুঝত।
এ-কথা তখন সে কাউকে বলেনি।
পরদিন মেজকাকা আমায় ডেকে বললেন–একটা কথা আছে, শোন। তোমার মায়ের কাজটা এখানে না করে অন্য জায়গায় গিয়ে করো। মানে তোমার দাদার বৌয়ের এখানে তো পাকস্পর্শ হয়নি, বড়দাদাও নেই বাড়ি–এ অবস্থায় শ্রাদ্ধের সময় কেউ খেতে আসবে না। তোমার দাদার বৌকে আমরা সেভাবে ঘরে তো নিইনি। এই বুঝে যা হয় ব্যবস্থা করো। বলো তোমার দাদাকে।
তলায় তলায় এঁরা সীতার স্বামী গোপেশ্বরকে কি পরামর্শ দিয়েচেন জানি নে, সে হঠাৎ বেঁকে দাঁড়িয়ে বললে চতুর্থীর শ্রাদ্ধ সীতাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে করবে–অথচ আগে ঠিক হয়েছিল চতুর্থীর শ্রাদ্ধ এখানেই হবে। এর কোনও দরকার ছিল না, সীতা এখানে শ্রাদ্ধ করলে তাতে কোন দোষ সমাজের মতেও হবার কথা নয়। কিন্তু সে কিছুতেই শুনলে না এই অবস্থায় বৌদিদিকে পেয়ে সীতা অনেকটা সান্ত্বনা পেয়েছিল–কিন্তু সে ওদের সইল না। বৌদিদির সঙ্গে সীতার বেশী মেলামেশিটা যেন গোড়া থেকেই আমার ভগ্নীপতি পছন্দ করে নি। নিজেই হোক আর ওদের পরামর্শেই হোক।
