কিন্তু আমার বড় কৌতূহল হ’ল। সন্ধ্যার সময় মোহিনী ঝি আমার বারান্দার সামনে দিয়ে যাচ্চে, তাকে জিজ্ঞেস করলুম–শোন, আচ্ছা বাড়িতে দেড় বছর দু’বছরের খোকা কার আছে বল তো? ঝি বললে–এত ছোট খোকা তো কারুর নেই।
সেইদিন রাত বারোটায় খুব হৈ-চৈ। মেজবাবুর স্ত্রীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, লোক ছুটলো ডাক্তার আনতে। মেজবাবুর স্ত্রী যে অন্তঃসত্বা ছিলেন বা সন্ধ্যার পর থেকে পাস-করা ধাত্রী এসে বসে আছে, এ-সব কথা তখন আমি শুনলাম। কারণ সবাই বলাবলি করচে। শেষরাত্রে শুনলাম তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয়েছে।
মনে মনে বিস্মিত হ’লেও কারও কাছে এ নিয়ে আর কোন কথা বললাম না। নিজেই দেখি, অথচ নিজেই বুঝিনে এ-সবের মানে কি। চুপচাপ থাকাই আমার পক্ষে ভাল।
এই ঘটনার পরে আমার ভয় হ’ল আমার সেই রোগ আবার আরম্ভ হবে। ও যখন আসে তখন উপরি-উপরি অনেক বার হয়–তারপর দিনকতকের জন্যে আবার একেবারেই বন্ধ থাকে। এই বার বেশী করে শুরু হলে আমার চাকুরি ঘুচে যাবে– সীতার কোন কিনারাই করতে পারব না।
মেজবাবু হিসেবের খাতা লেখার কাজ দিলেন নবীন মুহুরীকে। তার ফলে আমার কাজ বেজায় বেড়ে গেল–ঘুরে ঘুরে এঁদের কাজে খিদিরপুর, বরানগর, কালীঘাট করতে হয়– আর দিনের মধ্যে সতের বার দোকানে বাজারে যেতে হয় চাকরকে সঙ্গে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নেই, দিনে রাতে শুধু ছুটোছুটির কাজ। এই দোকানের হিসেব নবীন মুহুরীকে বুঝিয়ে দেওয়া একটা ঝঞ্ঝাট–রোজ সে আমাকে অপমান করে ছুতোয় নাতায়, আমার কথা বিশ্বাস করে না, চাকরদের জিজ্ঞেস করে আড়ালে সত্যি সত্যি কি দরে জিনিসটি এনেচি। সীতার মুখ মনে করে সবই সহ্য করে থাকি।
কার্তিক মাসে ওদের দেশের সেই মহোৎসব হবে–আমাদের সকলকে দেশে পাঠানো হ’ল। আমি অনেক আগে থেকেই শুনে আসচি–অত্যন্ত কৌতূহল ছিল দেখবো ওদের সাম্প্রদায়িক ধর্মানুষ্ঠান কি রকম।
গ্রামে এঁদের প্রকাণ্ড বাড়ি, বাগান, দীঘি, এঁরাই গ্রামের জমিদার। তবে বছরে এই একবার ছাড়া আর কখনও দেশে আসেন না। কুঞ্জ নায়েব বাকী দশ মাস এখানকার মালিক।
একটা খুব বড় ফাঁকা মাঠে মেলা বসেছে–এখানকার দোকান-পসারই বেশী। অনেকগুলো খাবারের দোকান, মাটির খেলনার দোকান, মাদুরের দোকান।
একটা বড় বটগাছের তলাটা বাঁধানো, সেটাই নাকি পীঠস্থান। লোকে এসে সেইখানে পুজো দেয়–আর বটগাছটার ডালে ও ঝুরিতে ইঁট বাঁধা ও লাল নীল নেকড়া বাঁধা। লোকে মানত করার সময় ওই সব গাছের গায়ে বেঁধে রেখে যায়, মানত শোধ দেওয়ার সময় সে খুলে দিয়ে পুজো দেয়। বটতলায় সারি সারি লোক ধর্ণা দিয়ে শুয়ে আছে, মেয়েদের ও পুরুষদের ধর্ণা দেওয়ার জায়গা আলাদা আলাদা।
বড়বাবু ও মেজবাবুকে মোহন্তের গদিতে বসেন–কত্তা নীলাম্বর রায় আসেননি, তাঁর শরীর সুস্থ নয়। এঁদের বেদীর ওপরে আশপাশে তাকিয়া, ফুল দিয়ে সাজানো, সামনে ঝকঝকে প্রকাণ্ড রূপোর থালাতে দিন-রাত প্রণামী পড়চে। দুটো থালা আছে–একটাতে মোহন্তের নজর, আর একটাতে মানত ও পুজোর প্রণামী।
নবীন মুহুরী, বেচারাম ও আমার কাজ হচ্ছে এই সব টাকাকড়ির হিসেব রাখা। এর আবার নানা রকম রেট আছে, যেমন–পাঁচ সিকার মানত থাকলে গদীর নজর একটাকা, তিন টাকার মানতে দু-টাকা ইত্যাদি। কেউ কম না দেয় সেটা মুহুরীদের দেখে নিতে হবে, কারণ মোহন্তরা টাকাকড়ির সম্বন্ধে কথা বলবেন না।
কাজের ফাঁকে আমি বেড়িয়ে দেখতে লাগলাম চারিধার। সবারই সঙ্গে মিশে এদের ধর্মমতটা ভাল করে বুঝবার আগ্রহে যাদের ভাল লাগে তাদেরই নানা কথা জিজ্ঞেস করি, আলাপ করে তাদের জীবনটা বুঝবার চেষ্টা করি।
কি অদ্ভুত ধর্মবিশ্বাস মানুষের তাই ভেবে অবাক হয়ে যাই। কতদূর থেকে যে লোক এসেচে পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে, ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়েও এসেছে অনেকে। এখানে থাকবার জায়গা নেই, বড় একটা মাঠে লোকে এখানে-ওখানে এই কার্তিক মাসের হিমে চট, শতরঞ্জি, হোগলা, মাদুর যে যা সংগ্রহ করতে পেরেছে তাই দিয়ে থাকবার জায়গা তৈরি ক’রে তারই তলায় আছে–কেউ বা আছে শুধু গাছতলাতে। যে যেখানে পারে মাটি খুঁড়ে কি মাটির ঢেলা দিয়ে উনুন বানিয়ে রান্না করচে। একটা সজনে গাছতলায় এক বুড়ী রান্না করছিল–সে একাই এসেচে হুগলী জেলার কোন গাঁ থেকে। তার এক নাতি হুগলীর এক উকিলের বাসার চাকর, তার ছুটি নেই, বুড়ী প্রতি বছর একা আসে।
আমায় বললে–বড্ড জাগ্রত ঠাকুর গো বটতলার গোসাঁই। মোর মালসি গাছে কাঁটাল মোটে ধরতো নি, জালি পড়ে আর খসে খসে যায়। তাই বন্নু বাবার থানে কাঁটাল দিয়ে আসবো, হে ঠাকুর কাঁটাল যেন হয়। বললে না পেত্যয় যাবে, ছোটয়-বড়য় এ-বছর সতেরো গণ্ডা এঁচড় ধরেচে গোসাঁইয়ের কিরপায়।
আর এক জায়গায় খেজুরডালের কুঁড়েতে একটি বৌ বসে রাঁধচে। আর তার স্বামী কুঁড়ের বাইরে বসে খোল বাজিয়ে গান করচে। কাছে যেতেই বসতে বললে। তারা জাতে কৈবর্ত, বাড়ি খুলনা জেলায়, পুরুষটির বয়স বছর চল্লিশ হবে। তাদের ছোট্ট একটি ছেলে মায়ের কাছে বসে আছে, তারই মাথার চুল দিতে এসেচে।
পুরুষটির নাম নিমচাঁদ মণ্ডল। স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই বড় ভক্ত। নিমচাঁদ আমার হাতে একখানা বই দিয়ে বললে–পড়ে শোনাও তো বাবু, দু-আনা দিয়ে মেলা থেকে কাল কেনলাম একখানা। বইখানার নাম বটতলার কীর্তন। স্থানীয় ঠাকুরের মাহাত্ম্যসূচক তাতে অনেকগুলো ছড়া। বটতলার গোসাঁই ব্রহ্মার সঙ্গে পরামর্শ করে এখানে এসে আস্তানা বেঁধেচেন, কলিরাজ ভয়ে তাঁর সঙ্গে এই সন্ধি করলে যে বটতলার হাওয়া যত দূর যাবে ততদূর পর্যন্ত কলির অধিকার থাকবে না। বটতলার গোসাঁই পাপীর মুক্তিদাতা, সর্ব জীবের আশ্রয়, সাক্ষাৎ শ্রীহরির একাদশ অবতার।
