কলিতে নতুন রূপ শুন মন দিয়া
বটতলে স্থিতি হৈল ভক্তদল নিয়া
খেদে কহে কলিরাজ,
এ বড় বিষম কাজমোর দশা কি হবে গোসাঁই?
ঠাকুর কহিলা হেসে,
মনে না করিহ ক্লেশে থান ত্যজি কোথাও না যাই।
শ্রীদাম সুবল সনে হেথায় আসিব
বট্মূলে বৃন্দাবন সৃষ্টি করি নিব।
নিমচাঁদ শুনতে শুনতে ভক্তিগদগদকণ্ঠে বললে–আহা! আহা! বাবার কত লীলাখেলা!
তার স্ত্রীও কুঁড়ের দোরগোড়ায় এসে বসে শুনচে। মানে বুঝলাম এরা নিজেরা পড়তে পারে না, বইপড়া শোনার আনন্দ এদের কাছে বড় নতুন, তা আবার যাঁর ওরা ভক্ত, সেই বটতলার গোসাঁই সম্বন্ধে বই।
নিমচাঁদ বললে–আচ্ছা, বটতলার হাওয়া কত দূর যায় দা-ঠাকুর?
–কেন বল তো?
—এই যে বলচে কলির অধিকার নেই ওর মধ্যি, তা কত দূর তাই শুধুচ্চি।
—কত দূর আর, ধর আধ ক্রোশ বড়জোর—
নিমচাঁদ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কি ভেবে বললে–কি করবো দা-ঠাকুর, দেশে লাঙল-গরু করে ফেলেচি, কুড়ো-দুই জমিতে এবার বাগুন রুইয়ে রেখে এসেচি–নয়ত এ বাবার থান ত বিন্দাবন, আপনি পড়লেন–এ স্বগগো ছেড়ে বিলির মোষের মত বিলি ফিরে যাই দা-ঠাকুর? কি বলিস রে তুই, সরে আয় না এদিকে, দা-ঠাকুরকে লজ্জা কি, উনি তো ছেলেমানুষ।
নিমচাঁদের স্ত্রী গলার সুরকে খুব সংযত ও মিষ্টি করে, অপরিচিত পুরুষমানুষের সামনে কথা বলতে গেলে মেয়েরা যেমন সুরে কথা বলে তেমনি ভাবে বললে–হ্যাঁ ঠিকই তো। বাবার চরণের তলা ছেড়ে কোথাও কি যেতে ইচ্ছে করে?
নিমচাঁদ বললে–দু-মণ কোষ্টা ছিল ঘরে, তা বলি বিক্রী করে চল বাবার থানে বাবার ছিচরণ দর্শন করে আসি আর অমনি গঙ্গাছেনটাও সারবো। টাকা বাবা যোগাবেন, সেজন্য ভাবিনে। ওরে শোন, কাল তুই তো ধন্না দিবি সকালে, আজ রাতে ভাতে জল দিয়ে রেখে দিস–
জিজ্ঞেস করে জানলাম ছেলের অসুখের জন্যে ধর্ণা দেবার ইচ্ছে আছে ওদের।
নিমচাঁদের বৌ বললে–বুঝলেন দাদাঠাকুর, খোকার মামা ওর মুখ দেখে তিনটে টাকা দিলে খোকার হাতে। তখন পয়সার বড় কষ্ট যাচ্চে, কোষ্টা তখন জলে, কাচলি তো পয়সা ঘরে আসবে? তো বলি, না, এ টাকা খরচ করা হবে না। এ রইল তোলা বাবার থানের জন্যি। মোহন্ত বাবার গদীতে দিয়ে আসব।
সেই দিন বিকেলে নিমচাঁদ ও তাঁর বৌ পুজো দিতে এল গদীতে। নবীন মুহুরী তাদের কাছে রেট-মত প্রণামী ও পুজোর খরচ আদায় করলে অবিশ্যি–তা ছাড়া নিমচাঁদের বৌ নিজের হাতে সেই তিনটে টাকা বড়বাবুর সামনের রূপোর থালায় রেখে দিয়ে বড়বাবুর পায়ের ধুলো নিয়ে কোলের খোকার মাথায় মুখে দিয়ে দিলে।
তার পর সে একবার চোখ তুলে মোহন্তদের দিকে চাইলে এবং এদের ঐশ্বর্যের ঘটাতেই সম্ভবত অবাক হয়ে গেল–বুদ্ধিহীন চোখে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে টাকা-পয়সাতে পরিপূর্ণ ঝকঝকে রূপোর থালাটার দিকে বার-কতক চাইলে, রঙীন শালু ও গাঁদাফুলের মালায় মোড়া থামগুলোর দিকে চাইলে–জীবনে এই প্রথম সে গোসাঁইয়ের থানে এসেছে, সব দেখেশুনে লোকের ভিড়ে, মোহন্ত মহারাজের আড়ম্বরে, অনবরত বর্ষণরত প্রণামীর ঝমঝমানি আওয়াজে সে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। কতক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল, বাইরে থেকে ক্রমাগত লোক ঢুকচে, তাকে ক্রমশ ঠেলে একধারে সরিয়ে দিচ্চে, তবুও সে দাঁড়িয়েই আছে।
ওকে কে একজন ঠেলা দিয়ে এগিয়ে আসতে গেল, আমি ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারিনি। ওর মুখচোখের মুগ্ধ ভক্তিস্তব্ধ দৃষ্টি আমায়ও মুগ্ধ করেছে–এ এক নতুন অভিজ্ঞতা আমার জীবনের, এই বাজে শালুর বাহার আর লোকের হৈচৈ আর মেজবাবু, বড়বাবুর চশমামণ্ডিত দাম্ভিক মুখ দেখে এত ভাব ও ভক্তি আসে!–যে ঠেলা দিয়ে এদিকে আসছিল, আমি তাকে ধমক দিলুম। তার পর ওর চমক ভাঙতে ফিরে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ওরা চলে গেলে একটি বৃদ্ধা এল, তার বয়স অনেক হয়েছে, বয়সে গলার সুর কেঁপে গিয়েচে, হাত কাঁপচে, সে তার আঁচল থেকে একটি আধুলি খুলে থালায় দিতে গেল। নবীন মুহুরী বললে–রও গো, রাখ––আধুলি কিসের?
বুড়ী বললে–এই-ই ঠাকুরের মা-ন-ত শো-ধে-র পে-র-ণা-মী–
নবীন মুহুরী বললে–পাঁচ সিকের কমে ভোগের পুজো নেই–পাঁচ সিকিতে এক টাকা গদীর নজর–
বুড়ী শুনতে পায় না, বললে–কত?
নবীন আঙুল দেখিয়ে চেঁচিয়ে বললে–এক টাকা—
বুড়ী বললে–আর নেই, মা-দু-র কি-নে-লা-ম ছ-আ-না-র, আ-র—
নবীন মুহুরী আধুলি ফেরত দিয়ে বললে–নিয়ে যাও, হবে না। আর আট আনা নিয়ে এস—
বড়বাবু একটা কথাও বললেন না। বুড়ী কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেল এবং ঘণ্টাখানেক পর সিকিতে, দু আনিতে, পয়সাতে একটা টাকা নিয়ে এসে প্রণামী থালায় রাখল।
ওরা চলে গেলে আমার মনে হ’ল এই সরল, পরম বিশ্বাসী পল্লীবধূ, এই বৃদ্ধা ওদের কষ্টার্জিত অর্থ কাকে দিয়ে গেল–মেজবাবুকে, বড়বাবুকে? এই এত লোক এখানে এসেছে, এরা সবাই চাষী গরীব গৃহস্থ, কি বিশ্বাসে এখানে এসেছে জানি নে–কিন্তু অম্লানবদনে খুশীর সঙ্গে এদের টাকা দিয়ে যাচ্চে কেন? এই টাকায় কলকাতায় ওঁদের স্ত্রীরা গহনা পরবেন, মোটরে চড়বেন, থিয়েটার দেখবেন, ওঁরা মামলা করবেন, বড়মানুষি সাহেবিয়ানা করবেন–ছোটবাবু বন্ধুবান্ধব নিয়ে গানবাজনার মজলিশে চপ-কাটলেট ওড়াবেন, সেই জন্যে?
পরদিন সকালে দেখলাম নিমচাঁদের স্ত্রী পুকুরে স্নান করে সারাপথ সাষ্টাঙ্গ নমস্কার করতে করতে ধুলোকাদা-মাখা গায়ে বটতলায় ধর্ণা দিতে চলেচে–আর নিমচাঁদ ছেলে কোলে নিয়ে ছলছল চোখে তার পাশে পাশে চলেচে।
