হাওড়া-পুল পার হয়েচি, এক জায়গায় একজন ভিখারিণী আধ-অন্ধকারের মধ্যে। চেঁচিয়ে কার সঙ্গে ঝগড়া করছে আর কাঁদছে। কাছে গিয়ে দেখলাম ভিখারিণী অন্ধ, বেশ ফর্সা রং, হিন্দুস্থানী–বৃদ্ধা না হলেও প্রৌঢ়া বটে। তার সামনে একখানা ময়লা ন্যাকড়া পাতা–সেটাতে একটা পয়সাও নেই–গোটা-দুই টিনের কালো তোবড়া মগ, একটা ময়লা পুঁটুলি, একটা ভাঁড়–এই নিয়ে তার কারবার। সে একটা সাত-আট বছরের মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করচে–হিন্দীতে বলচে–তুই অমন ক’রে মারবি কেন? তোকে আমি ভিক্ষে করে খাইয়ে এত বড়টা করলাম আর তুই আমাকেই মার দিতে শুরু করলি–আমার কপাল পোড়া, নইলে নিজের পেটের সন্তান এমন বদ হবে কেন? দ্যাখ দেখি কি দিয়ে মারলি, কপালটা কেটে গেছে–
মেয়েটা হি-হি করে হাসচে এবং কৌতুকের সঙ্গে রাস্তা থেকে ধুলোবালি খোয়া কুড়িয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাকে মারছে।
আমি মেয়েটাকে একটা কড়া ধমক দিয়ে বললাম–ফের মাকে যদি অমন করবি, তবে পুলিসে ধরিয়ে দেবো। পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আনা সাতেক পয়সা আছে–সেগুলো সব তার ময়লা নেকড়াখানায় রেখে দিয়ে বললুম–তুমি কেঁদো না বাছা–আমি কাল এসে তোমায় আরও পয়সা দেবো। তোমার মেয়ে আর মারবে না। যদি মারে তো বলে দিও, কাল আমি দেখে নেবো–
এমন ছন্নছাড়া করুণ দুরবস্থার রূপ জীবনে কোনদিন দেখিনি। পরদিন হাওড়া-পুলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেদিন বা আর কোনদিন সেই অন্ধ ভিখারিণীর দেখা পাইনি। তাকে কত খুঁজেছি, ভগবান জানেন। প্রতিদিন শোবার আগে তার কথা আমার মনে হয়।
মনে মনে বলি, আটঘরার বটতলায় তোমায় প্রথম দেখেছিলুম ঠাকুর, তোমার মুখে অত করুণা মাখানো, মানুষকে এত কষ্ট দাও কেন? তা হবে না, তার ভাল করতেই হবে তোমায়, তোমার আশীর্বাদের পুণ্যধারায় তার সকল দুঃখ ধুয়ে ফেলতে হবে তোমাকে।
এর মধ্যে একদিন কালীঘাটের মন্দিরে গেলুম।
সেদিন বেজায় ভিড়–কি একটা তিথি উপলক্ষে মেলা যাত্রী এসেচে। মেয়েরা পিষে যাচ্ছে ভিড়ের মধ্যে অথচ কেউ ওদের সুবিধে-অসুবিধে দেখবার নেই। আমার সামনেই একটি তরুণী বধূ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল–আমি একজন প্রৌঢ়া বিধবাকে বললাম– গেল, গেল, ও মেয়েটির হাত ধরে তুলুন–। কাদামাখা কাপড়ে বধূটি দিশাহারা ভাবে উঠে দাঁড়াল, আমি তার সঙ্গের লোকদের খোঁজ নিয়ে ভিড়ের ভেতর থেকে অতিকষ্টে খুঁজে বার করলাম–ভিড়ের দ্বারা চালিত হয়ে তারা অনেকদূর গিয়ে পড়েছিল। এত করেও অনেকেরই দেবদর্শন ঘটল না, পাণ্ডারা সকলকে মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছে না শুনলুম, কেন তা জানিনে। মেয়েদের দুঃখ দেখে আমার নিজের ঠাকুর দেখার ইচ্ছে আর রইল না।
আষাঢ় মাসের শেষ দিন। বৈকালের দিকটা মেজবাবু মোটরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, বেলা পাঁচটার সময় ফিরে এসে আমায় হিসেবের খাতা দেখাতে ডেকে পাঠালেন। রোজ তিনি দুপুরের পরে আপিসে বসে খাতা সই করেন, আজ তিনি ছিলেন না। মেজবাবুকে খাতা দেখানো বড় মুশকিলের ব্যাপার, আবার মেজবাবুকে আমার একটু ভয় হয়, তার ওপরে তিনি প্রত্যেক খরচের খুঁটিনাটি কৈফিয়ৎ চাইবেন। খাতা দেখতে দেখতে মুখ না তুলেই বললেন–তামাকওয়ালার ভাউচার কোথায়?
আমি বললাম–তামাকওয়ালা ভাউচার দেয়নি। খুচরা দোকান–ওরা ভাউচার রাখে না–
মেজবাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন–কেন, নবীন মুহুরী তো ভাউচার আনতো?
তাঁর মুখ দেখে মনে হ’ল তিনি আমায় অবিশ্বাস করচেন। আমি জানি নবীন মুহুরী যেখানে ভাউচার মেলে না–মনিবকে বুঝিয়ে দেবার জন্যে সেখানে ভাউচার নিজেই বানাতো। আমি সে মিথ্যার আশ্রয় নিই না। বললাম–আপনি জেনে দেখবেন ওরা ভাউচার কখনো দেয় না। আমি এসে পর্যন্ত তো দেখচি—
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলচি, তার সামনেই বড় জানালা–তার ঠিক ওপরে– মেজবাবুর অফিসের সামনাসামনি একটা শানবাঁধানো চাতাল। অন্দরমহলের একটা দোর দিয়ে চাতালটায় আসা যায় বলে জানালায় প্রায়ই পরদা টাঙানো থাকে। আজ সেটা গোটানো ছিল।
আমি একবার মুখ তুলতেই জানালা দিয়ে নজর পড়ল অন্দরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাদের ছোট্ট একটি খোকা, নিতান্ত ছোট, বছর দুই বয়স হবে। বোধ হ’ল যেন দরজা খোলা না পেয়ে চুপ ক’রে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাবছি, বেশ খোকাটি তো, কাদের খোকা? এ বাড়িতে যতদূর জানি অত ছোট ছেলে কারুর তো নেই? এ ওখানে এল কার সঙ্গে?
মেজবাবু বললেন–এদিকে মন দাও, ওদিকে কি দেখচ?
আমি বললাম–কাদের খোকা দাঁড়িয়ে রয়েচে ওখানে–আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম–ওই যে দাঁড়িয়ে রয়েচে চাতালের দরজায়, বাড়িতে ঢুকতে পাচ্ছে না বোধ হয়।
মেজবাবু সেদিকে চেয়ে বললেন–কই? কোথায় কে?
ঠিক সেই সময় অন্দরের দরজা খুলে মেজবাবুর স্ত্রী তাঁকে অনেকবার মোটরে উঠতে নামতে দেখেচি বার হয়ে এলেন এবং খোকাকে কোলে তুলে নিলেন। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। মেজবাবু বললেন–কোথায় তোমার খোকা না কি?
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম–বা রে, ওই তো উনি খোকাকে কোলে নিলেন!
চোখ তুলে চাতালের দিকে চেয়ে মেজবাবুর স্ত্রীকে আর দেখতে পেলাম না, অন্দরের দরজাও বন্ধ, নিয়ে বোধ হয় বাড়ির মধ্যে চলে গিয়েচেন। মেজবাবু বললেন–কে নিয়ে গেলেন? উনি মানে কি? কি বকচ পাগলের মত!…
মেজবাবু আমার দিকে কেমন এক ধরনের চেয়ে রয়েচেন দেখলাম। আমি তাঁর সে দৃষ্টির সামনে থতমত খেয়ে গেলাম–আমার মনে হ’ল মেজবাবু সন্দেহ করচেন আমার মাথা খারাপ আছে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিত হলাম একথা ভেবে যে এই ওঁর স্ত্রী দরজা খুলে এলেন, খোকাকে কোলে তুলে নিলেন, এই তো দিনমানে আর এই ত্রিশ হাতের মধ্যে চাতাল, এ উনি দেখতে পেলেন না কেন? পরক্ষণেই চট করে আমার সন্দেহ হ’ল আমার সেই পুরানো রোগের ব্যাপার এর মধ্যে কিছু আছে নাকি? এত সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে যে অন্য কিছু আছে বা হতে পারে, এ এতক্ষণ আমার মনেই ওঠেনি। তা হলে কোনো কথা কি বলতাম? এক্ষুনি চাকুরি থেকে ছাড়িয়ে দিতে পারে। বলতেই পারে, এর মাথা খারাপ, একে দিয়ে চলবে না।
