একদিন আমি সেরেস্তা-ঘরে বসে কাজ করচি–হঠাৎ দেখি মেজবাবু ঘরে ঢুকেচেন। আমি মেজবাবুকে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। মেজবাবু চারদিকের দেওয়ালের দিকে চোখ তুলে বললেন–এ ঘরের এই ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্চে, তুমি নজর রাখো না?
মেজবাবুর সামনাসামনি হওয়া এই আমার প্রথম। আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে আমি মনে আঘাত পেলাম এবং আমার ভয়ও হ’ল। তা ছাড়া ছবি নষ্ট হওয়ার কৈফিয়ৎ আমি কি দেবো বুঝতে না পেরে চুপ করে আছি, এমন সময় মেজবাবু বাজখাঁই আওয়াজে ডাকলেন–দৈতারী–
দৈতারী সেরেস্তার কালির বোতল গুনে গুনে আলমারিতে তুলছিল পাশের ঘরে, সে ঘরের পাশে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বললে–হুজুর–
–এই উল্লুক, তুমি দেখতে পাও না ঘরের ছবিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?
দৈতারী ঘরের দেওয়ালের দিকে বিপন্ন মুখে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মেজবাবু হঠাৎ আমার ডেস্ক থেকে রুলটা তুলে নিয়ে তাকে হাতে পিঠে ঘা-কতক বসিয়ে দিয়ে বললেন–স্টুপিড পাজি, বসে বসে শুধু মাইনে খাবে? এক ডজন চাকর বাড়িতে মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে শুধু ফাঁকি দেবার জন্য? পাড়ো ছবিগুলো এক-একখানা ক’রে–পাড়ো আমার সামনে–
দৈতারীর সে রুলের ঘা যেন আমার পিঠেই পড়ল। আমি ভয়ে ভয়ে দৈতারীকে ছবি পাড়তে সাহায্য করতে লাগলুম। আমি সামান্য মাইনের চাকুরি করি–মেজবাবু আমাকেও ঠেস দিয়ে কথাটা বললেন। তারপর আধঘণ্টা তিনি ঘরে দাঁড়িয়ে রইলেন–আমি ও দৈতারী তাঁর সামনে সমস্ত ছবিগুলো একে একে পেড়ে পরিষ্কার করলাম। সাহস করে যেন মাথা তুলে চাইতে পারলাম না, যেন আমি নিজেই ছবির তদারক না করে প্রকাণ্ড অপরাধ করে ফেলেছি।
সেইদিন প্রথম বুঝলাম আমার মত সামান্য মাইনের লোকের কি খাতির–আর কি মান এদের কাছে। সীতার বিয়ের একটা বন্দোবস্ত করতে পারি তবে আবার পড়বো। ছোট বৌঠাকরুনের কথা এই সময় মনে হ’ল–শৈলদির কথাও মনে পড়ল। কত ধরনের মানুষই আছে সংসারে! অমরনাথবাবুর বৈঠকখানা আমাদের ঘরের সামনে। খুব শৌখীন জিনিসপত্র সাজানো এবং প্রত্যেক দিনই কোন-না-কোন শৌখীন জিনিস কেনা লেগেই আছে। সে ঘরে রোজ সন্ধ্যার পর বন্ধুবান্ধবেরা এসে গানের আড্ডা বসায়–কেউ ডুগি-তবলা, কেউ হারমোনিয়াম বাজায়–গান-বাজনায় অমরবাবুর খুব ঝোঁক। সে-দিন আড়াইশো টাকার একটা গানের যন্ত্র রাখবার কাঁচের আলমারি কেনা হ’ল। তিনি কলেজের ছাত্র বটে, কিন্তু আমি পড়াশুনা করতে একদিনও দেখিনি তাঁকে। একদিন বেলা দশটার সময় অমরনাথবাবু ঘরে ঢুকে বললেন–ওহে, পাঁচটা টাকা দাও তো, আছে তোমার কাছে?
আমি প্রথমটা অবাক হয়ে গেলাম। আমার কাছে টাকা চাইতে এসেছেন ছোটবাবু! ব্যস্তভাবে আমার বাক্সটা খুলে টাকা বার করে সসম্ভ্রমে তাঁর হাতে দিলাম। দিনকতক কেটে গেল, আর একদিন তিনটে টাকা চাইলেন। মাইনের টাকা সব এখনও পাইনি– দশটা টাকা মোটে পেয়েছিলাম–তা থেকে দিয়ে দিলুম আট টাকা। দু-তিন মাসে ছোটবাবু আমার কাছে পঁচিশ টাকা নিলেন–বাড়ির ও আমার হাতখরচ বাদে যা-কিছু বাড়তি ছিল, সবই তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
একদিন দাদা চিঠি লিখলে–তার বিশেষ দরকার। পনেরটা টাকা যেন আমি পাঠিয়ে দিই। আমার হাতে তখন মোটেই টাকা নেই। ভাবলুম, ছোটবাবুর টাকাটা তো দেওয়ার কথা এতদিনে–দিচ্ছেন না কেন! বড়মানুষের ছেলে, সামান্য টাকা খুচরো কিছু কিছু করে নেওয়া, সে ওঁর মনেই নেই বোধ হয়। লজ্জায় চাইতেও পারলাম না। অগত্যা বারোটা টাকা আগাম পাওয়ার জন্যে একটা দরখাস্ত করলুম। সে-দিন আপিসে আবার বসেছেন মেজবাবু। দরখাস্ত পড়ে আমার দিকে চেয়ে বললেন–কি হবে তোমার আগাম টাকা?
মেজবাবুকে আমার বড় ভয় হয়। বললুম–দাদা চেয়ে পাঠিয়েচেন, হাতে আমার কিছু নেই তাই।
মেজবাবু বললেন–তুমি কতদিন সেরেস্তায় কাজ করচ? চার মাস মোটে? না, এত কমদিনের লোককে এ্যাডভান্স দেওয়া স্টেটের নিয়ম নেই–তা ছাড়া তুমি তো এখনও পাকা বহাল হওনি–এখনও প্রোবেশনে আছ।
কই, চাকুরিতে ঢোকবার সময় সে-কথা তো কেউ বলেনি যে আমি প্রোবেশনে বহাল হচ্চি বা কিছু। যাই হোক, দরখাস্ত ফিরিয়ে নিয়ে এলাম। দাদাকে টাকা পাঠানো হ’লই না, এদিকে ছোটবাবুও টাকা দিলেন না, ভুলেই গিয়েচেন দেখচি সে-কথা। প্রথমে আসবার সময় ভেবেছিলাম এঁরা কোন দেবস্থানের সেবায়েত, সাধু-মোহান্ত মানুষ হবেন–ধর্মের একটা দিক এঁদের কাছে জানা যাবে–কিন্তু এঁরা ঘোর বিলাসী ও বিষয়ী, এখন তা বুঝচি। মেজবাবু এই চার মাসের মধ্যে এটর্নির বাড়ি পাঠিয়েচেন আমায় যে কতদিন, কোথায় জমি নিয়ে ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের সঙ্গে প্রকাণ্ড মোকদ্দমা চলচে-এ বাদে কুঞ্জ নায়েব তো প্রায়ই দেশ থেকে আপীলের কেস আনচেন। মেজবাবু মামলা-মোকদ্দমা নাকি খুব ভাল বোঝেন, কুঞ্জ নায়েব সেদিন বলছিল।
অপরে কি করে ধর্মানুষ্ঠান করে, তারা কি মানে, কি বিশ্বাস করে, এসব দেখে বেড়াতে আমার বড় ভাল লাগে।
একদিন হাওড়া পুলের ওপারে হেঁটে অনেক দূর বেড়াতে গেলুম। এক জায়গায় একটা ছোট মন্দির, জায়গাটা পাড়াগাঁ-মত, অনেক মেয়েরা জড়ো হয়েছে, কি পুজো হচ্চে। আমি মন্দির দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম–দেবতার স্থানে পূজা-অর্চনা হতে দেখলে আমার বড় কৌতূহল হয় দেখবার ও জানবার জন্যে। একটা বড় বটগাছের তলায় ছোট্ট মন্দিরটা, বটের ঝুরি ও শেকড়ের দৃঢ় বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা–মন্দিরের মধ্যে সিঁদুর মাখানো গোল গোল পাথর, ছোট একটা পেতলের মূর্তিও আছে। শুনলাম ষষ্ঠীদেবীর মূর্তি। বাড়ি থেকে মেয়েরা নৈবিদ্যি সাজিয়ে এনেচে, পুরুত ঠাকুর পুজো করে সকলকে। ফুলবেলপাতা নির্মাল্য দিলেন–ছেলেমেয়েদের মাথায় শান্তিজল ছিটিয়ে দিলেন। সবাই সাধ্যানুসারে কিছু কিছু দক্ষিণা দিলে পুরুত ঠাকুরকে, তারপর নিজের নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, নৈবিদ্যির খালি থালা হাতে সবাই বাড়ি চলে গেল। কাছেই একটা পুকুর, পুরুত ঠাকুর আমার হাতেও দুখানা বাতাসা ও ফুলবেলপাতা দিয়েছিলেন–বাতাসা দুখানা খেয়ে পুকুরে জল খেলাম-ফুলবেলপাতা পকেটে রেখে দিলাম। ছোট্ট গ্রামখানা– দূরে রেলের লাইন, ভাঙা পুকুরের ঘাটটা নির্জন, চারিধারেই বড় বড় গাছে ঘেরা শান্ত, স্তব্ধ অপরা–অনেক দিন পরে এই পুজোর ব্যাপারটা, বিশেষ করে মেয়েদের মুখে একটা ভক্তির ভাব, পুজোর মধ্যে একটা অনাড়ম্বর সারল্য আমার ভাল লাগল।
