সেখানে আমি কতক্ষণ ছিলাম জানি না–উঠে দেখি গাছে ঠেস দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু এত ঘুম ঘুমিয়েচি–উঠে চোখ মুছে চারিদিকে চেয়ে দেখি প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেচে। কেবল এইটুকু আমার মনে ছিল স্বপ্নের দেশে কাকে যেন জিজ্ঞেস করেছিলুম–বটগাছের নীচে একটা সুন্দর ঠাকুর আছেন, শুনেচি বিষ্ণুমূর্তি, আমার বড় ভাল লাগে–জ্যাঠাইমারা পুজো করে না কেন? ঘুম কি সত্যি, কিছুই বুঝতে পারলাম না। মনের সে আনন্দটা কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে ছিল।
জ্যাঠামশাইরা কি একটা মোকদ্দমার সাক্ষীসাবুদ দু-তিন দিন ধরে চণ্ডীমণ্ডপে তালিম দিয়ে শেখালেন। যে কেউ শুনলে বুঝতে পারতো যে এরা সে-সব জায়গায় যায়নি, কস্মিনকালেও-সে-সব ঘটনা দেখেও নি–এঁদের খামার-সংক্রান্ত কি একটা দখলের মামলা।
একদিন শুনলাম মামলায় এঁরা জিতেচেন–আবার সেই ব্যাপার দেখলুম বাড়িতে। গৃহদেবতার প্রতি ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে উঠলেন সবাই–মহাসমারোহে পূজা হ’ল, স্বপক্ষের যারা সাক্ষী ছিল, তাদের পরম যত্নে তোয়াজ করে খাওয়ালেন। খাওয়ান তাতে ক্ষতি নেই–কিন্তু দেবতাকে এর মধ্যে জড়ান কেন?
এঁরা ভাবেন কি যে দেবতা তাঁদেরই বাঁধা, হাতধরা–ওঁদের মিথ্যাকে অবিচারকেও সমর্থন করবেন তিনি ভোগ নৈবিদ্যের লোভে?
জ্যাঠাইমা যখন ব্যস্ত হয়ে গরদের শাড়ি পরে পূজার আয়োজনে ছুটোছুটি করছিলেন, তখন আমার ভারি রাগ হ’ল–আজকাল এসব মূঢ়তা আমার আদৌ সহ্য হয় না, ছেলেবেলার মত ভয়ও করি না আর জ্যাঠাইমাকে–ভাবলুম এ নিয়ে খুব তর্ক করি, দু কথা শুনিয়ে দেবো, তাতে ওঁদের উপকারই হবে–দেবতাকে নিয়ে ছেলেখেলা বন্ধ হবে– কিন্তু সীতা ও মায়ের কথা ভেবে চুপ করে রইলুম।
.
০৮.
মাস দুই হ’ল চাকুরি পেয়েছি কলকাতায়। এ চাকুরি পাওয়ার জন্যেও আমি শৈলদির কাছে কৃতজ্ঞ। শৈলদির স্বামীর এক বন্ধুর যোগাযোগে এটা ঘটেচে। যাদের বাড়ি চাকরি করি, এরা বেশ বড় লোক।
বাড়ির কর্তা নীলাম্বর রায় হাওড়া জেলার কি একটা গ্রামের জমিদার এবং সেখানকার তাঁদেরই পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত এক মঠের বর্তমান মালিক–এদের মঠের অধীনে একটা ধর্মসম্প্রদায় গড়ে উঠেচে গত ষাট-সত্তর বছরে এবং এঁরাই সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম এই তিন জেলাতে এই সম্প্রদায়ের লোক যত বেশী, অন্য জেলাতে তত নয়। ওঁদের কাগজপত্র ও দেশের নায়েবের সঙ্গে ওঁদের যে চিঠিপত্র লেখালেখি হয়েছে–তা থেকেই আমি এ-সব সংবাদ জানতে পারলাম অল্পদিনের মধ্যেই। এঁদের প্রধান আয় বৈশাখ মাসে মঠবাড়ির মহোৎসব থেকে—-নানা অঞ্চল থেকে শিষ্যসেবকের দল জড়ো হয়ে সেই সময় বার্ষিক প্রণামী, পূজা, মানত শোধ দেয়–তা ছাড়া বিবাহ ও অন্নপ্রাশনের সময়ও মঠের গদিতে প্রত্যেক শিষ্যের কিছু প্রণামী পাঠিয়ে দেওয়া নিয়ম।
নীলাম্বরবাবুর তিন ছেলেই ঘোর শৌখিন ও উগ্র ধরনের শহুরে বাবু। বড় ছেলে অজয়বাবু এঞ্জিনিয়ারীং পড়েছিলেন কিন্তু পাস করেন নি–মেজ ছেলে নবীনবাবু এম-এ পাস, ছোট ছেলে অমরনাথ এখনও ছাত্র–প্রেসিডেন্সি কলেজে থার্ড-ইয়ারে পড়ে। অজয়বাবুর বয়স পঞ্চাশের কম নয়, কিন্তু পোশাক-পরিচ্ছদে কুড়ি বছরের ছোকরাও হার মানে তাঁর সৌখিনতার কাছে–নবীনবাবুর বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ, লম্বা, ফর্সা, সুপুরুষ– পেছনের ঘাড় একদম ক্ষুর দিয়ে সাদা বার-করা, চোখে চশমা–প্রায়ই পরনে সাহেবী পোশাক থাকে। বাঙালী পোষাক পরলে পরেন হাত-গিলে-করা মিহি আদ্দির পাঞ্জাবি ও কোঁচানো কাঁচি ধুতি, পায়ে কালো এ্যালবার্ট জুতো।
কর্তা নীলাম্বর রায়কে আমি বেশী দিন দেখিনি। তিনি তাঁর তাকিয়া বালিশ, গড়্গড়া, পিকদানী নিয়ে দোতলাতে থাকেন। কালেভদ্রে তাঁর কাছে আমার যাওয়া দরকার হয়। বড় ছেলে অজয়বাবুই কাজকর্ম দেখাশুনো করেন–তাঁর সঙ্গেই আমার পরিচয় বেশী।
অজয়বাবু লোক মন্দ নয়–কিন্তু নবীনবাবু ও অমরনাথের মুখে প্রথম দিনেই একটা উগ্র দাম্ভিকতার ছাপ লক্ষ্য করলুম। আমি এ ধরনের লোকের সংস্পর্শে জীবনে এ পর্যন্ত আসি নি–কি জানি আমার কোন ব্যবহারে এরা কি দোষ ধরে ফেলে–সেই চিন্তা আমায় সর্বদা সন্ত্রস্ত করে তুললে।
ওদের বাড়ি হরি ঘোষের স্ট্রীটে বাড়িটার পূর্ব দিকে একটা ছোট গলি–কিন্তু সেই দিকেই বাড়ির সদর। হরি ঘোষের স্ট্রীটের দিকটা রেলিং-বসানো লম্বা বারান্দা–বারান্দায় উঠবার সিঁড়ি নেই সেদিকে। রাস্তার ওপরের ছোট ঘরটাতে আমার থাকবার জায়গা নির্দিষ্ট হ’ল। এই ঘরে আমি যে একলা থাকি তা নয়, পাশাপাশি নীচু চার-পাঁচটা তক্তাপোশের ওপর ঢালা ফরাস পাতা, তার ওপর রাত্রে যে কত লোক শোয় তার হিসেব রাখা শক্ত। এদের এদেশের কাছারীর নায়েব কুঞ্জ বসু প্রায়ই আসে কলকাতায়, সে আমার পাশেই বিছানা পাতে, তার সঙ্গে একজন মুহুরী আসে, সে নায়েবের পাশে শোয়। বাড়ির দুজন চাকর শোয় ওদিকটাতে। ওস্তাদজী বলে একজন গানের মাস্টার বাড়ির ছেলেমেয়েদের গান ও হারমোনিয়াম বাজাতে শেখায়–সে আর তার একজন ভাইপো শোয় চাকরদের ও আমাদের মধ্যে। এতগুলো অপরিচিত লোকের সঙ্গে একসঙ্গে শোয়া কখনো অভ্যেস নেই–প্রথম দিনেই এদের গল্পগুজব, হাসি-কাশি, তামাকের ধোঁয়া আমাকে অতিষ্ঠ করে তুললে। সীতার মুখ মনে করে সব অসুবিধাকে সহ্য করবার জন্যে প্রস্তুত হই।
