পিকারিং সাহেব আমার হাতে গীতা দেখে একদিন বললেন–তুমি এ-সব পড় নাকি? বাইবেল কি তোমার সকল আধ্যাত্মিক অভাব পূর্ণ করে না?
আমি বললাম–পড়ে দেখতে কি দোষ আছে সাহেব? তা ছাড়া আমি তো খৃস্টান নই, আমি এখনও হিন্দু।
–দু-নৌকাতে পা দেওয়া যায় না, মাই বয়। তুমি খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত হও–নয়তো তুমি বাইবেল পড় কেন?
–সাহেব, যদি বলি ইংরেজী ভাষা ভাল করে শেখবার জন্যে?
পিকারিং সাহেব হো হো করে হেসে উঠল। বললে–তোমার আত্মার পরিত্রাণ তার চেয়েও বেশি দরকারী। যীশুতে বিশ্বাস না করলে আত্মার ত্রাণ নেই। তিনি আমাদের সকলের পাপের ভার নিজে নিয়ে ক্রুশের নিষ্ঠুর মৃত্যু বরণ করেছিলেন। যীশুর ধর্মে দীক্ষিত হও, তোমার পাপ তাঁর রক্তে ধুয়ে যাবে। এস, আমার সঙ্গে গান কর।
তার পর সাহেব নিজেই গান ধরল—
Nothing but the Blood of Jesus
Oh, precious is the flow.
That can make me white as snow,
No other fount I know
Nothing but the Blood of Jesus.
পিকারিং সাহেবকে আমার খুব ভাল লাগে। খুব সরল, ধর্মপ্রাণ লোক। স্ত্রী মারা গিয়েচে আজ দশ-বারো বছর, আর বিয়ে করেননি,–টেবিলের ওপর নিকেলের ফ্রেমে বাধানো স্ত্রীর ফটো সর্বদা থাকে। মাঝে মাঝে আমায় জিজ্ঞেস করে–আমার স্ত্রী দেখতে কেমন ছিল, ভাল না? ফটো দেখে মিসেস পিকারিংকে সুন্দরী মনে হয়নি আমার, তবু বলি খুব চমৎকার।
পিকারিং সাহেবের ধর্মমত আমার কাছে কিন্তু অনুদার ঠেকে–কিছুদিন এদের সঙ্গে থেকে আমার মনে হয় জ্যাঠাইমারা যেমন গোঁড়া হিন্দু–খৃস্টানদের মধ্যেও তেমন গোঁড়া খৃস্টান আছে। এরা নিজের ধর্মটি ছাড়া আর কারুর ধর্ম ভাল দেখে না। এদের সমাজে সংকীর্ণতা আছে–এদেরও আচার আছে–বিশেষত একটা নির্দিষ্ট ধরনের ঈশ্বরের উপাসনা করলে উপাসনা ব্যর্থ হ’ল এদের মতে। একখানা কি বইয়ে একবার অনন্ত নরকের গল্প পড়লাম। শেষবিচারের দিন পর্যন্ত পাপীরা সেই অনন্ত নরকের অনন্ত আগুনের মধ্যে জ্বলবে পুড়বে, খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হবার আগেই যদি কোন শিশু মারা যায়–তাদের আত্মাও যাবে অনন্ত নরকে। এসব কথা প্রথম যেদিন শুনেছিলাম, আমাকে ভয়ানক ভাবিয়ে তুলেছিল। তারপর মনে হল, কেন যীশু কি এতই নিষ্ঠুর? তিনি পরিত্রাণের দেবতা, তিনি সকল পাপীকেই কেন পরিত্রাণ করবেন না? যে তাঁকে জানে, যে তাঁকে না-জানে–সবাইকে সমান চোখে তিনি কেন না দেখবেন? তাঁর কাছে খৃস্টান ও অখৃস্টানে প্রভেদ থাকবে কেন? বরং যে অজ্ঞানান্ধ তার প্রতি তার অনুকম্পা বেশী হবে– আমার মনের সঙ্গে এই খৃস্টের ছবি খাপ খায়। তিনি প্রেমময় মুক্ত মহাপুরুষ, তাঁর কাছেও ধর্মের দলাদলি থাকে কখনো? যে দেশের, যে ধর্মের, যে জাতিরই হোক তিনি সবারই– যে তাঁকে জানে, তিনি তার, যে না জানে, তিনি তারও।
একদিন গঙ্গার ধারে বেঞ্চির ওপরে বসে জনকতক লোক গল্প করচে–শুনলাম বরানগরে কুঠির ঘাটের কাছে একটা বাগানবাড়িতে একজন বড় সাধু এসেচেন, সবাই দেখতে যাচ্চে। দু-এক দিনের মধ্যে একটা ছুটি পড়ল, বেলুড়ে নেমে গঙ্গা পার হয়ে কুঠিরঘাটের বাগান-বাড়ি খোঁজ করে বার করলাম। বাগানবাড়িতে লোকে লোকারণ্য, সকলেই সাধুজীর শিষ্য, মেয়েরাও আছে। ফটকের কাছে একজন দাড়িওয়ালা লোক দাঁড়িয়েছিল, আমি ফটকের কাছে গিয়ে আমার আসার উদ্দেশ্য বলতেই লোকটা দু-হাতে আমরা গলা জড়িয়ে ধরে বললে–ভাই, এস এস, তোমাকে নেওয়ার জন্যেই যে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি পছন্দ করিনে যে কেউ আমার গলা জড়িয়ে ধরে–আমি ভদ্রভাবে গলা ছাড়িয়ে নিলাম। লোকটা আমায় বাগানের মধ্যে নিয়ে গেল। আমি কৌতূহল ও আগ্রহের সঙ্গে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। বাঁ-দিকের রোয়াকে একদল মেয়ে ব’সে একরাশ তরকারি কুটছে–একটা বড় গামলায় প্রায় দশ সের ময়দা মাখা হচ্ছে,–যেদিকে চাই, খাওয়ার আয়োজন।
–সাধুর দেখা পাবো এখন?
–তিনি এখন ধ্যান করচেন। তাঁর প্রধান শিষ্য জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারী ও-ঘরে আছেন, চল ভাই তোমায় নিয়ে যাই।
কথা বলচি এমন সময় একজন ভদ্রলোক এলেন, সঙ্গে একটি মহিলা–ফটকের কাছে তাঁরা মোটর থেকে নামলেন। একজন বালক-শিষ্যকে ভদ্রলোকটি কি জিজ্ঞেস করলেন– সে তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে এল আমার সঙ্গের দাড়িওয়ালা লোকটির কাছে। ভদ্রলোকটি তাকে বললেন–স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তিনি কোথায়?
–কোথা থেকে আসছেন আপনারা?
—ভবানীপুর, এলগিন রোড থেকে। আমার নাম বিনয়ভূষণ মল্লিক।
দাড়িওয়ালা লোকটির শরীরের ইস্ক্রুপ কব্জা যেন সব ঢিলে হয়ে গেল হঠাৎ–সে তিন ভাগে ভেঙে হাত কচলে বললে–আজ্ঞে আসুন, আসুন, বুঝতে পেরেচি, আসুন। এই সিঁড়ি দিয়ে আসুন–আসুন মা-লক্ষ্মী।
আমি বিস্মিত হলাম। এই যে বললে সাধুজী ধ্যানে বসেচেন–তবে ওঁরা গেলেন যে! লোকটি ওঁদের ওপরে দিয়ে আবার নেমে এল। আমায় একটা হলঘরে নিয়ে গেল। সেখানে জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারীর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলে। জ্ঞানানন্দ ব্রহ্মচারীর পরনে গেরুয়া আলখাল্লা, রং ফর্সা–আমার সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহার করলেন। তিনি আপিসের কাজে দেড়শো টাকা মাইনে পেতেন–ছেড়ে স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। স্বামীজী বলেছেন তিনি তিনটে মহাদেশ উদ্ধার করবেন, সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেই বেরিয়ে পড়বেন সে উদ্দেশ্যে। স্বামীজীর দেওয়া মন্ত্র জপ ক’রে তিনি অদ্ভুত ফল পেয়েছেন নিজে–এই সব গল্প সমবেত দর্শকের কাছে করছিলেন। আমি কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম–কি ফল পেয়েছেন মন্ত্রের? তিনি বললেন–মন্ত্র জপ করতে করতে মনে হয় যেন কোথায় পাহাড়ের উপরে বসে আছি। স্বামীজি বলেন–এ একটা উচ্চ অবস্থা। আমি আরও আগ্রহের সুরে বললাম–আর কিছু দেখেন? তিনি বললেন, জ্যোতিঃদর্শন হয় মাঝে মাঝে।
