–সে কি রকম?
—দুই ভুরুর মাঝখানে একটা আগুনের শিখার মত দীপ্তি দেখতে পাই।
আমি হতাশ হলাম। আমি নিজে তো কত কি দেখি! এরা তো সে-সব কিছু দেখে বলে মনে হয় না। এরা আর কতটুকু দেখেচে তা হলে? পাহাড়ের ওপর বসে আছি এই দেখলেই বা কি হ’ল? ভুরুর মধ্যে আগুনের শিখা দেখলেই বা কি?
শুনলাম বেলা ছ’টার পরে স্বামীজীর দেখা পাওয়া যাবে। পাশের একটা ঘরে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। আরও একজন বৃদ্ধ সেখানে ছিলেন। কথায় কথায় তিনি বললেন– দেখ তো বাবা–এই তোমরাও তো ছেলে। আর আমার হতচ্ছাড়া ছেলেটা পালিয়ে এসে বাড়ি থেকে এই সন্নিসির দলে যোগ দিয়েছে। এখানে তো এই খাওয়া এই থাকা। যাত্রার দলের মত এক ঘরে একশো লোক শোয়। ছেলেটার হাড়ির হাল হয়েচে–আগে একবার ফিরিয়ে নিতে এসেছিলাম–তা যায়নি। এবার আমি আসছি শুনে কোথায় পালিয়েচে হতভাগা। আহা কোথায় খাচ্ছে কি হচ্চে–এদিকে বাড়িতে ওর মা অন্নজল ছেড়েছে। এই সন্নিসির দলই তাকে সরিয়ে রেখেচে কোথায়। আজ তিন দিন এখানে বসে আছি, তা ছোঁড়া এল না। এরা তলায় তলায় তাকে খবর দিচ্ছে। আবার আমার ওপর এদের রাগ কি? বলচে ছেলে তোমার মুক্তির পথে গিয়েছে, বিষয়ের কীট হয়ে আছ তুমি, আবার ছেলেটাকে কেন তার মধ্যে ঢোকাবে? শোন কথা। ওদের এখানে বিনি পয়সার চাকর হাতছাড়া হয়ে যায় তা হ’লে যে! আমায় এই মারে তো এই মারে। দু-বেলা অপমান করছে।
–কোথা থেকে আপনার ছেলে এদের দলে এল?
–এই সন্নিসির দল গেছল আমাদের মাদারিপুরে। খুব কীর্তন করে ভিক্ষে ক’রে শিষ্য-সেবক তৈরি করে বেড়াল ক’দিন। সেখান থেকে ছেলেটাকে ফুসলে নিয়ে এসেচে।
পয়সা হাতে থাকত আমার তো ব্যাটার খাতির করত। এখানে খেতে দেয় না ওই বাজারের হোটেল থেকে খেয়ে আসি। একটু এই দালানটাতে রাত্রে শুয়ে থাকি, তাও দু বেলা বলচে- বেরো এখান থেকে। ছোঁড়াটা ফিরে আসবে, সেই আশায় আছি।
স্বামীজীর সঙ্গে দেখা হ’ল না। দেখার ইচ্ছেও আর ছিল না।
সন্ধ্যার পরে স্টীমারে পার হয়ে বেলুড়ে এলাম মনে কত আসা নিয়ে গিয়েছিলাম ওবেলা। মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার যেখানে ভাল নয়, সেই জ্যাঠাইমাদের বাড়ির গোপীনাথ জিউ-এর পুজোর সময় যা দেখেচি, হীরুঠাকুরের প্রতি তাদের ব্যবহার যা দেখেচি–সেই সব একই যেন।
দিন দুই পরে ছোটবৌঠাকরুনের বাপের বাড়ি থেকে বড় ভাই তাকে নিতে এল। আমার সঙ্গে দশ-পনেরো দিন দেখা হয়নি, ভাবলুম যাবার সময় একবার দেখা করবই। দুপুরের পরে ঘোড়ার গাড়িতে জিনিসপত্র ওঠানো হচ্ছে, আমি নিজের ঘরের জানলা দিয়ে দেখছি আর ভাবচি ওঠবার সময় গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াব, না ওপরে গিয়ে দেখা করে আসব?
পায়ের শব্দে পেছনে চেয়ে দেখি ছোটবৌঠাকরুন দোরের কাছে দাঁড়িয়ে রোগশীর্ণ মুখে, হাতায় লাল পাড় বসানো ব্লাউজ গায়ে, পরনে লালপাড় শাড়ী। আমি থতমত খেয়ে বললাম–আপনি! আসুন, এই টুলটাতে–
তিনি মৃদু, সহজ সুরে বললেন–খুব তো এলেন দেখা করতে!
—আমি এখুনি যাচ্ছিলাম, আপনি এলেন, তাই নইলে
— ছোটবৌঠাকরুন ম্লান হেসে বললেন–না, নিজেই এলাম। আর আপনার সঙ্গে কি দেখা হবে? আপনি তো পরীক্ষা দিয়ে চলে যাবেন। বি.এ. পড়বেন না?
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম–ঠিক নেই, এখানে হয়ত আর আসব না।
তিনি বললেন–কেন আর এখানে আসবেন না?
আমি কোন কথা বললাম না। দুজনেই খানিকক্ষণ চুপচাপ।
তারপর তিনি আমার কাছে এগিয়ে এসে মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন–আপনার মত ছেলে যদি কখনও দেখেচি! আগে যদি জানতাম তবে সেবার আপনাকে নিয়ে যে ওরা ঠাট্টা করেছিল, আমি তার মধ্যে যাই? এখন সে-কথা মনে হলে লজ্জায় ইচ্ছে হয় গলায় বঁটি দিয়ে মরি।
তারপর গভীর স্নেহের সুরে বললেন-না, ও-সব পাগলামি করে না, আসবেন এখানে, কেন আসবেন না, ছিঃ–
দরজার কাছে গিয়ে বললেন–না এলে বুঝবো আমায় খুব ঘেন্না করেন, তাই এলেন না।
.
০৭.
দাদা কালীগঞ্জে একটা বাতাসার কারখানায় কাজ করে। অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি, কিছু টাকার দরকারও ছিল, কারণ কলেজের কিছু বাকী মাইনে ও পরীক্ষার ফি এর টাকার অভাব হওয়াতে শৈলদি লুকিয়ে ষোলটা টাকা দিয়েছিল। যাওয়ার আগে সে টাকা তাকে দিয়ে যাওয়া দরকার, যদিও সে চায়নি। বাঁশবেড়ের ঘাটে গঙ্গা পার হয়ে ওপারে যাব, খেয়ার নৌকো আসতে দেরি হচ্ছে, আমি প্রকাণ্ড একটা পুরোনো বাঁধাঘাটের সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করছি। ঘাটের ওপরে একটা জীর্ণ প্রাচীন শিবমন্দির, তার ফাটলে ফাটলে বট-অশ্বত্থের গাছ, মন্দিরের চূড়ার ত্রিশূলটা পশ্চিমে হেলে-পড়া সন্ধ্যার সূর্যের। আলোয় মনে হচ্চে যেন সোনার। ভারি ভাল লাগছিল মন্দিরটা, আর এই জনবিরল বাঁধাঘাট। ওই মন্দিরে যদি আরতি হ’ত এই সন্ধ্যায়, বন্দনারত নরনারীর দল ওই ভাঙা চাতালে দাঁড়িয়ে রইত তবে আমার আরও ভাল লাগত। কথাটা ভাবছি, এমন সময় আমার শরীরটা যেন কেমন করে উঠল, কানের পাশটা শিরশির করতে লাগলো। হঠাৎ আমার মনে হ’ল এই ঘাটের এই মন্দিরে খুব বড় একজন সাধুপুরুষ আছেন, তাঁর দীর্ঘ চেহারা, মাথায় বড় বড় চুল, প্রসন্ন হাসিমাখানো মুখ। আমি তাঁকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি অনুভব করলাম। তিনি এখানে অনেকদিন আছেন, ভাঙা ঘাটের রানায় বসে ওপারের উদীয়মান পূর্ণচন্দ্রের দিকে চেয়ে এই সন্ধ্যায় তিনি উপাসনা করেন–এবং তিনি কারও ওপর রাগেন না। কত লোক না বুঝে ঘাটের নির্জনতা ভঙ্গ করে, তিনি সদাই প্রসন্ন, সকলের ওপরে সদাই স্নেহশীল।
