আমাকে দেখে শৈলদি বললে—-বেশ, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
কথার উত্তর দিতে গেলে মুশকিল, চুপচাপ খেতে বসলাম–শৈলদি বললে–না খেয়ে ঢন ঢন করে বেড়িয়ে বেড়িয়ে কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গিয়েচে। চা খেতেও আসিস নে বাড়ির মধ্যে, কালোকে দিয়ে বাইরের ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিলেও পাওয়া যায় না–থাকিস কোথায়?
খানিকক্ষণ পরে পাতের দিকে চেয়ে বললে–ও কি, ভাল করে ভাত মাখ। ঐ ক’টি খেয়ে মানুষ বাঁচে ভাই? তোরা এখন ছেলেমানুষ, খাবার বয়স। লুচি আছে ভোগের, দেবো? পায়েস তুই ভালবাসিস, এক বাটি পায়েস আলাদা করা আছে। কই মাছের মুড়ো ফেললি কেন, চুষে চুষে খা। আহা, কি ছিরি হচ্ছে চেহারার!
পরদিন কিসের ছুটি। আমি দোতলার ছাদে কালোকে ডাকতে গিয়েছি তার প্রাইভেট টিউটর নীচে পড়াতে এসেচে বলে। সন্ধ্যার অন্ধকার হয়েছে। ওপরে উঠেই আমি একেবারে ছোটবৌঠাকরুনের সামনে পড়ে গেলাম। তাঁর কোলে মেজদির দেড় বছরের খুকী মিন্টু–সে খুব ফুটফুটে ফর্সা বলে বাড়ির সকলের প্রিয়, সবাই তাকে কোলে পাবার জন্যে ব্যগ্র। ছোটবৌঠাকরুন হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন খুকীকে কোলে করে। আমি বিস্মিত হ’লাম, কপালে ঘাম দেখা দিল। খুকী আমায় চেনে, সে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে আসতে চায়। ছোটবৌঠাকরুন আমার আরও কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন– খুকীকে আমার কোলে দিলেন। তাঁর পায়ের আঙুল আমার পায়ের আঙুলে ঠেকল। আমি তখন লাল হয়ে উঠেচি, শরীর যেন ঝিম ঝিম করচে। কেউ কোন দিকে নেই।
ছোটবৌঠাকরুন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে সুর নিচু করে বললেন–আপনি আর বাড়ির মধ্যে আসেন না কেন আজকাল? আমার ওপর রাগ এখনও যায়নি?
আমি অতি কষ্টে বললাম–রাগ করব কেন?
—তবে সেদিন ও-ঘরে এলেন, আমার সঙ্গে কথা বললেন না তো! চলে গেলেন কেন?
মরীয়া হয়ে বললাম–আপনাকে সেদিন চিঠি দেবো বলে এসেছিলাম, কিন্তু পাছে কিছু মনে করেন, সেজন্যে দেওয়া হয়নি। পাছে কিছু মনে করেন ভেবেই বাড়ির মধ্যে আসিনে।
তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার পর মৃদুস্বরে বললেন–মাথা ঠাণ্ডা করে লেখাপড়া করুন। কেন ও-রকম করেন? আর বাড়ির মধ্যে আসেন না কেন? ওতে আমার মনে ভারি কষ্ট হয়। যেমন আসতেন তেমনি আসবেন বলুন? আমায় ভাবনার মধ্যে ফেলবেন না ও রকম।
আমার শরীরে যেন নতুন ধরনের অনুভূতির বিদুৎ খেলে গেল। সেখানে আর দাঁড়াতে পারলাম না–মুখে যা এল, একটা জবাব দিয়ে নীচে নেমে এলাম। সারারাত আর ঘুমুতে পারিনে। আমার জন্যে একজন ভাবে এ চিন্তার বাস্তবতা আমার জীবনে একেবারে নতুন। নতুন নেশার মত এ অনুভূতি আমার সারা দেহমন অভিভূত করে তুললে।
কি অপূর্ব ধরনের আনন্দ-বেদনায় মাখানো দিন, সপ্তাহ, পক্ষ, মাস! দিনরাতে সব সময়ই আমার ওই ওক চিন্তা। নির্জনে কাটাই, কিছু ভাল লাগে না, অথচ যাঁর চিন্তা শয়নে-স্বপনে সর্বদাই করি, পাছে তাঁর সামনে পড়ি এই ভয়ে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করি। লেখাপড়া, খাওয়া, ঘুম সব গেল।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি ছোটবৌঠাকরুনের হ’ল অসুখ। অসুখ ক্রমে বাড়াবাড়ি ধরনের হ’ল। ছাতরা থেকে যদু ডাক্তার দেখতে এল। তাঁর বাপের বাড়ি থেকে লোকজন এসে পড়ল–বাড়িসুদ্ধ লোকের মুখে উদ্বেগের চিহ্ন। আমি ডাক্তার ডাকা, ওষুধ আনা এ সব করি বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে, কিন্তু একদিনও রোগীর ঘরে যেতে পারলাম না– কিছুতেই না। একদিন ঘরের দোরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম–কিন্তু চৌকাঠের ওপারে যাইনি।
ক্রমে তিনি সেরে উঠলেন। একদিন আমার চয়নিকা-খানা তিনি চেয়ে পাঠালেন– দিন-দুই পরে কালো বই ফিরিয়ে দিয়ে গেল। চার-পাঁচ দিন পরে চয়নিকা-খানা কি জন্যে খুলতে গিয়েছি, তার মধ্যে একখানা চিঠি, ছোটবৌঠাকরুনের হাতে লেখা।
নাম নেই কারুর। লেখা আছে…
আমার অসুখের সময় সবাই এল, আপনি এলেন না কেন? আমি কত আশা করেছিলাম যে আপনি আসবেন, জানেন তো? আমার মরে যাওয়াই ভাল। কেন যে আবার সেরে উঠলাম! অসুখ থেকে উঠে মন ও শরীর ভেঙে গেছে। কালোর মুখে শুনেচি, আপনি ঘরে টাঙিয়ে রেখেছেন যীশুখৃস্টের ছবি, তিনি হিন্দুর দেবতা নন–কিন্তু আপনি যাকে ভক্তি করেন–আমি তাঁকে অবহেলা করতে পারিনে। আমার জন্যে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবেন। আর-একটা কথা–একটিবার দেখতে কি আসবেন না?
যীশুখৃস্টের ছবির দিকে চাইলাম। সম্প্রতি একখানা বুদ্ধের ছবি, আর একখানা চৈতন্যের ছবিও এনে টাঙিয়েছিলাম, রোগশীর্ণা পত্রলেখিকার করুণ আকূতি ওদের চরণে পৌঁছে দেবার ভার আমার ওপর পড়েছে। কিন্তু আমি কি পারব? অনুকম্পায় মমতায় আমার মন তখন ভরে উঠেচে। যে প্রার্থনা ওদের কাছে জানালাম, তা ভাষাহীন, বাক্যহীন। আমি এ-ছাড়া আর কিছু করতে পারিনে। সামনে হঠাৎ যেতে পারব না তাঁর। এ বাড়িতেও আর বেশিদিন থাকা হবে না আমার। চলে যাব এখান থেকে।
টেস্ট পরীক্ষা দিয়েই আটঘরায় পালাবো, ঠিক করলাম। সেখানে যাইনি অনেক দিন। মা চিঠি লিখেছেন, দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। আমার সেখানে যেতে ইচ্ছে হয় না শুধু জ্যাঠাইমাদের ব্যবহারের জন্য। গেলেই মায়ের দুঃখ দেখতে হবে। দাদা এক বাতাসার কারখানায় চাকরি পেয়েচে, মাসে কিছু টাকা অতিকষ্টে পাঠায়। সীতা বড় হয়ে উঠল– তারই বা কি করা যায়? দাদা একাই বা কি করবে!
