আমি বললাম–আপনি কেন বলুন না নিজে?
ততক্ষণ তিনি বার হয়ে চলে গিয়েছেন।
ছোটকাকীমা আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন। বললেন–কি বকচিস পাগলের মত? ওদিকে চেয়ে কার সঙ্গে কথা বলচিস? নির্মলা কে সে খোঁজে তোমার কি দরকার শুনি?
জ্যাঠাইমা ঘরে ঢুকলেন সেই সময়ই। তিনি বললেন–কি হয়েছে? কি বলছে ও?
ছোটকাকীমা বললেন–আপন মনে কি বকচে দ্যাখো না দিদি–ও এ ঘর থেকে চলে যাক। আমার ভয় করে, ও ছেলের মাথার ঠিক নেই–আমার নাম করে কি বলচে।
জ্যাঠাইমা বললেন–কি বলছিলি কাকীমার নাম করে?
আমার বিস্ময় তখনো কাটেনি–আমি তখন কেমন হয়ে গিয়েচি। ছোটকাকীমার নাম যে নির্মলা আমি তা কখনও শুনিনি–ঐ মেয়েটি যে চলে গেল, আমার সঙ্গে কথা বলে গেল–ছোটকাকীমা তাঁকে দেখতে পেলেন না, তাঁর কথাও শুনতে পেলেন না এই বা কেমন! জ্যাঠাইমার কথার কোনো জবাব আমার মুখ দিয়ে বেরুলো না, আমার মাথা ঘুরে উঠল। তারপর কি যে ঘটল আমি তা জানি না।
জ্ঞান হলে দেখি মা আমার মাথা কোলে নিয়ে বসে কাঁদছেন। আমি দালানেই শুয়ে আছি। চারিপাশে বাড়ির অনেক মেয়ে জড় হয়েছে, সবাই বললে আমার মৃগীরোগ আছে। ভাবলাম হয়ত হবে, একেই বোধ হয় মৃগীরোগ বলে। আমার বড় ভয় হ’ল, বাবা মারা গিয়েচেন পাগল হয়ে, এ-বাড়ির অনেকের মুখে শুনেচি আমরাও পাগল হ’তে পারি। তার মধ্যে আমার নাকি পাগলের লক্ষণ আছে অনেক।
সে-সন্ধ্যার কথা কখনও ভুলব না। জীবনে এত ভয় আমার কোনদিন হয়নি–এই ভেবে ভয় হ’ল যে আমার সত্যিই কোনো কঠিন রোগ হয়েছে। কিন্তু কাউকে বলবার উপায় নেই রোগটা কি। মৃগীরোগই হয়ত হয়েছে, নয়তো বাবার মত পাগলই হয়ে যাব হয়ত–না, কি হবে!
যে রাত্রে বাবা পাগল হয়ে গিয়ে বালিশের তুলো ছিঁড়ে ঘরময় ছড়িয়ে দিলেন, কেরোসিনের টেমির মিটমিটে অস্পষ্ট আলোয় রাতদুপুরে তাঁর সেই অদ্ভুত সারা গায়ে, মুখে, মাথায় তুলোমাখা মূর্তি বার বার মনে আসতে লাগল–আমার মনে সে-রাত্রি, সে মূর্তি চিরদিনের জন্য আঁকা হয়ে আছে। ঐ রকম কি আমারও হবে!
মাকে আঁকড়ে ধরে শুয়ে রইলাম সারারাত। মনে মনে কতবার আকুল আগ্রহে প্রার্থনা করলাম–প্রভু যীশু, তুমি দেবতা, তুমি আমার এ রোগ সারিয়ে দাও, আমায় পাগল হ’তে দিও না। আমায় বাঁচাও।
সকালে একটু বেলায় রোদ উঠলে পানী মারা গেল।
জ্যাঠাইমা সকালে উঠে বৌদের কুটনো কুটবার উপদেশ দেবেন, কি কি রান্না হবে তা ঠিক করে দেবেন–এ বাড়িতে ভাগ্নে-বৌ ছাড়া কেউ গাই দুইতে পারে না–এদিকের কাজ সেরে জ্যাঠাইমা তাকে সঙ্গে নিয়ে গোয়ালে নিজের চোখের সামনে দুধ দোয়াবেন– সীতা বলে, পাছে ভাগ্নে-বৌ নিজের ছেলেমেয়েদের জন্যে কিছু সরিয়ে রাখে বোধ হয় এই ভয়ে। তারপর তিনি স্নান করে গরদের কাপড় পরে ঠাকুরঘরে ঢুকবেন–সেখানে আহ্নিক চলবে বেলা এগারোটা পর্যন্ত, সে-সময়ে ঠাকুরঘরের দোরে কারুর গিয়ে উঁকি দেবার পর্যন্ত হুকুম নেই। সবাই বলে জ্যাঠাইমা বড় পুণ্যবতী। পুণ্যবতীই তো! একদিন যে-ছবি দেখেছিলাম, ভুলিনি কোনদিন। জ্যাঠাইমা ঠাকুরঘর থেকে বার হয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েচেন, পরনে গরদের শাড়ী, কপালে সিঁদুর, চন্দনের টিপ, টকটকে চেহারা–এমন সময় আমার মা একরাশ বাসি কাপড় নিয়ে গোবরছড়ার বালতি হাতে পুকুরের ঘাটে যাচ্চেন, পরনের ময়লা কাপড়ের জায়গায় কাদা গোবরের ছাপ, রুক্ষ চুল। বেলা বারোটার কম নয় সকাল থেকে মা’র মুখে এক ফোঁটা জল পড়েনি–
জ্যাঠাইমা ডেকে বললেন–বৌ, রান্নাঘরের ছোট জালার জল কি কাল তুমি তুলেছিলে? আমি না কতবার তোমায় বারণ করেচি ছোট জালায় তুমি জল ঢালবে না? বড় জালায় বেশী না পার তো তিন কলসী করে ঢেলেও তো বেগার শোধ দিলে পার?
ছোট জালার জল জ্যাঠামশায়, জ্যাঠাইমা বা কাকারা খান। জ্যাঠাইমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, মা গুরুমন্ত্র নেননি, মায়ের হাতের জল অতএব শুদ্ধ নয়, সে জল ওঁরা খাবেন কি করে?
সত্যিই তো জ্যাঠাইমা পুণ্যবতী। নইলে তিনি ঠাকুরঘরে পবিত্র দেহে পবিত্র মনে এতক্ষণ জপ-আহ্নিক করছিলেন, আর মা মরছিলেন বেলা বারোটা পর্যন্ত গোয়াল আঁস্তাকুড় ঘেঁটে– মা নাস্তিক মাতাল কেরানীর স্ত্রী, তার ওপর আবার মেমের কাছে লেখাপড়া শিখে জাত খুইয়েচেন, কেন ওঁরা জল খেতে যাবেন মা’র হাতের?
আমার মনে হ’ল ঠাকুরও শুধু বড়মানুষের, পুণ্যিও বড়মানুষের জন্যে–নইলে মায়ের, ভাগ্নেবৌয়ের, ভুবনের মায়ের সময় কোথায় তারা নিশ্চিন্ত মনে, শুচি হয়ে, গরদ পরে তাঁর পায়ে ফুলতুলসী দেবে?
বোধ হয় এই সব নানা কারণে জ্যাঠাইমাদের বাড়ির গৃহদেবতার প্রতি আমি অনেকটা চেষ্টা করেও কোনো ভক্তি আনতে পারতাম না। এক-একবার ভেবেচি হয়ত সেটা আমারই দোষ, আমার শিক্ষা হয়েছে অন্যভাবে, অন্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের মধ্যে, তাদের কাছে যে দয়া-মমতা পেয়েছি, আর কোথাও তা পাইনি বলেই। ছেলেবেলা থেকে যীশুখৃষ্টের কথা পড়ে আসছি, তাঁর করুণার কথা শুনেচি, তাঁর কত ছবি দেখেচি। আমার কাছে একখানা ছবি আছে খৃস্টের, মেমেরা বড়দিনের সময় আমায় দিয়েছিল–বকের পালকের মত ধপধপে সাদা দীর্ঘ ঢিলে আলখাল্লা-পরা যীশু হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে– চারিধারে তাঁর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় করেছে, একটি ক্ষুদ্র শিশু তাঁর পা ধরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, আর তিনি তাকে ধরে তুলতে যাচ্ছেন নিচু হয়ে মুখে কি অপূর্ব জ্যোতি, কি সুন্দর চাউনি–আমি এ ছবিখানা বইয়ের ভেতরে রেখে দিই, রোজ একবার দেখি–এত ভালো লাগে!
