এবার মনে হল আমার নিজের কথা যা কাউকে কখনও বলিনি এ পর্যন্ত–তাঁর কাছে খুলে বলি, আমার মনের সন্দেহ, আমার ঐসব অদ্ভুত জিনিস দেখার ব্যাপার, জ্যাঠাইমাদের সঙ্গে আচার-ব্যবহার নিয়ে আমার মত না মেলা,–সকলের ওপর ঠাকুরদেবতা সম্বন্ধে আমার অবিশ্বাস–এসব খুলে বলে তিনি কি বলেন শুনি। তাঁর ওপর এমন একটা শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হয়ে গেল আমার! যেন মনে হ’ল এঁর কাছে বললে ইনি সব বুঝিয়ে দিতে পারবেন আমাকে। এত বড় লোক ইনি, এত পণ্ডিত, কত কথা জানেন!
কিন্তু সুবিধে হ’ল না। বলি-বলি করেও বলতে আমার কেমন লজ্জা হ’ল। তিন দিন এমনি কেটে গেল, তারপর তিনি চলে গেলেন।
আমার কিন্তু বলতে পারলেই ভাল হত। একজন ভাল লোককে আমার সব কথা বলা দরকার। অথচ এখানে তেমন কোন লোককে আমি বিশ্বাস করিনে–কারুর ওপর আমার ভক্তি হয় না।
আমি আজকাল নির্জনে বসলেই অদ্ভুত জিনিস সব দেখি। যখন তখন, তার সময় নেই অসময় নেই, রাত নেই দিন নেই। এই তো সেদিন বসে আছি জ্যাঠাইমাদের পুকুরধারের বাগানে একলাটি–হঠাৎ দেখি পুকুরপাড়ের আমগাছগুলোর ওপরকার নীল আকাশে একটা মন্দিরের চুড়ো–প্রকাণ্ড মন্দির, রোদ লেগে ঝকমক করচে-সোনা না কি দিয়ে বাঁধানো যেন। মন্দিরের চারিপাশে বাগান, চমৎকার গাছপালা, ফুল ফুটে আছে, অপূর্ব দেখতে–ঠিক যেন আমাদের সোনাদা চা-বাগানের ধারে বনের গাছের ডালে ডালে ফোঁটা নীল অর্কিডের ফুল! আর একদিন দেখেছিলাম ঠিক ওই জায়গায় বসেই আকাশ বেয়ে সন্ধ্যার সময় তিনটি সুন্দরী মেয়ে, পরনে যেন শ্বেতচমরীর লোমে বোনা সাদা চকচকে লুটিয়ে-পড়া কাপড়–তারা উড়ে যাচ্চে এক সারিতে, বোধ হয় পুরো পাঁচ মিনিট ধরে তাদের দেখেচি। তারপর রোদ চকচক করতে লাগল, আর তাদের স্পষ্ট দেখা গেল না–ওপরের দিকে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল। এরকম নতুন নয়, কতবার দেখেছি, প্রায়ই দেখি, দু-পাঁচদিন অন্তর দেখি, দেখে দেখে আমার সয়ে গিয়েছে, আগের মত ভয় হয় না। কিন্তু এক-একবার ভাবি, এ আমার এক রকম রোগ–না, চোখ খারাপ হয়ে গিয়েছে, নাকি?
আমার কারুর সঙ্গে মিশতে সাহস হয় না এইজন্যে যে, হয়ত কোন সময় আবার অন্য ভাব এসে যাবে, আর কে সঙ্গে থাকবে সে আমায় ভাববে পাগল। হয়ত হাসবে, হয়ত লোককে বলে দেবে। এমনিও এ-বাড়িতে জ্যাঠাইমা, কাকীমা, কাকা, এঁরা আমায় পাগলই ভাবেন। কি করবো। আমি যা দেখি, ওঁরা তা দেখতে পান না, এই আমার অপরাধ। একটা উদাহরণ দিই–
ফাল্গুন মাসে ছোটকাকার মেয়ে পানী অসুখে পড়ল। একদিন দু’দিন গেল, অসুখ আর সারে না। জ্বর লেগেই আছে। সাতদিন কেটে গেল–জ্বর একই ভাব। দশ দিনের দিন। অসুখ এমনি বাড়ল, নৈহাটি থেকে বড় ডাক্তার আনবার কথা হ’ল।
পানীকে আমার এ-বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাল লাগে। তার বয়স বছর সাত আট, ঝাঁকড়া চুল মাথায়, চোখ কটা, সাহেবদের ছেলেমেয়েদের মত। এ-বাড়ির ছেলেমেয়েদের মুখে যেমন খারাপ কথা আর গালাগালি লেগেই আছে–পানীর কিন্তু তা নয়। তার একটা কারণ, সে এতদিন মামার বাড়িতে তার দিদিমার কাছে ছিল, গঙ্গার ওপারে ভদ্রেশ্বরে। সে বেশ মেয়ে, বেশ গান করতে পারে, প্রাণে তার দয়ামায়া আছে। পানীর অসুখ হয়ে পর্যন্ত আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল–আমার ইচ্ছে হয়েছিল ওর কাছে গিয়ে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে দিই–কিন্তু কাকীমা তো আমায় বিছানা ছুঁতে দেবে না, সেই ভয়ে পারতাম না।
পানীর তখন সতেরো দিন জ্বর চলচে–বুড়ো গোবিন্দ ডাক্তার ঘোড়ার গাড়ি করে স্টেশন থেকে এল––দালানে বসে মশলার কৌটো বার করে মশলা খেলে, ভাজা মশলার গন্ধে দালান ভুর ভুর করতে লাগল–চা ক’রে দেওয়া হ’ল, চা খেলে, তার পর ওষুধ লিখে দিয়ে ভিজিটের টাকা মেজকাকার হাত থেকে নিয়ে না-দেখেই পকেটে পুরলে–তার পর রোগীকে বার বার গরম জল খাওয়ানোর কথা বলে গাড়ি করে চলে গেল।
একটু একটু অন্ধকার হয়েছে কিন্তু এখনও বাড়িতে সন্ধ্যার শাঁখ বাজেনি, কি আলো জ্বালা হয়নি–হয়ত ডাক্তার আসবার জন্যে সকলে ব্যস্ত ছিল বলেই। আমি রোগীর ঘরে দোরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, কিন্তু পানীর বিছানায়–পানীর শিয়রে যে বসে আছে তাকে চিনতে পারলাম না। লালপাড় শাড়ী পরনে আধঘোমটা দেওয়া কে একজন, জ্যাঠাইমার মত দেখতে বটে কিন্তু জ্যাঠাইমা তো নয়! ঘরের মধ্যে আর কেউ নেই–এইমাত্র কাকীমা বাইরে গেছেন ডাক্তারে কি বলে গেল তাই জানতে ছোটকাকার কাছে। আমি ভাবচি লোকটা কে, এমন সময় তিনি মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে বললেন–জিতু, নির্মলাকে বোলো পানীকে আমি নিয়ে যাব, আমি ওকে ফেলে থাকতে পারবো না–ও আমার কাছ ভাল থাকবে, নির্মলা যেন দুঃখ না করে। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম–কে নির্মলা আমি চিনি নে, যিনি বলছেন তিনিই বা কে, কোথা থেকে এসেছেন, কই এ বাড়িতে তো কোনদিন দেখিনি তাঁকে, পানীকে তিনি এই অসুস্থ শরীরে কোথায় নিয়ে যাবেন, এসব কথা ভাববার আগেই ছোটকাকীমা ঘরে ঢুকলেন–কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে বিছানার পাশে যিনি বসে আছেন, ছোট কাকীমা যে তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন, এমন কোনো ভাব দেখলুম না।
বিছানায় যিনি বসে ছিলেন তিনি আমায় বললেন–জিতু, নির্মলাকে বল এইবার– আমি চলে যাচ্ছি।
আমি কিছু না ভেবে কলের পুতুলের মত চেয়ে বললাম–নির্মলা কে? ছোট কাকীমা আমার দিকে কট করে চেয়ে বললে,–কেন, সে খোঁজে কি দরকার? তিনি ভাবলেন আমি বুঝি তাঁকেই জিজ্ঞেস করচি। অন্য মহিলাটি বিছানা থেকে নেমে ওদিকের দরজা দিয়ে বার হয়ে চলে গেলেন, যাবার সময় আমাকে বললেন–এই তো নির্মলা ঘরে এসেচে।
