কিন্তু যীশুখৃস্টের সম্বন্ধে কোনো ভাল বই পাইনে–আমার আরও জানবার ইচ্ছে হয় তাঁর কথা–মাকে যে মেমেরা পড়াত চা-বাগানে, তারা একখানা মথি-লিখিত সুসমাচার ও খানকতক ছাপানো কাগজ বিলি করেছিল, সেইগুলো কতবার পড়া হয়ে গিয়েছে, তা ছাড়া আর কোনো বই নেই। এখানে এসে পর্যন্ত আর কোনো নতুন বই আমার চোখে পড়েনি।
আমাদের স্কুলে একটা ছেলে নতুন এসে ভর্তি হয়েছে আমাদেরই ক্লাসে। তার নাম বনমালী, জাতে সদগোপ, রঙ খুব কালো, কিন্তু মুখের চেহারা বেশ, বয়সে আমার চেয়ে কিছু বড়। সে অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, এখানে একটা ঘর ভাড়া করে থাকে, বামুনে রাঁধে। অনেক দূরের পাড়াগাঁয়ে তার বাড়ি, সেখানে লেখাপড়া শেখার কোনো সুবিধে নেই, তাই ওকে ওর বাপ-মা এই গাঁয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু লেখাপড়ার দিকে বনমালীর মন নেই, সে বাসার উঠোনে এক তুলসীচারা পুঁতে বাঁধিয়েচে, দিনরাত জপ করে, একবেলা খায়, মাছমাংস ছোঁয় না, শ্রীকৃষ্ণ নাম তার সামনে উচ্চারণ করবার জো নেই, তা হলেই তার চোখ দিয়ে জল পড়বে। রাত্রে জপের ব্যাঘাত হয় বলে বিকেলবেলা স্কুল থেকে গিয়ে খেয়েদেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বামুন ঠাকুরকে ছুটি দেয়–তার পর ব’সে ব’সে অনেক রাত পর্যন্ত জপ করে, হরিনাম করে। সে সময় কেউ কাছে গেলে সে ভারি চটে। অদ্ভুত ধরনের ছেলে বলে তাকে সকলে ভারি খেপায়–স্কুলের ছেলেরা তার সামনে কিষ্ট কিষ্ট বলে চেঁচায় তার চোখে জল বেরোয় কি না দেখবার জন্যে, ওই নিয়ে মাস্টারেরা পর্যন্ত খিঁচুনি দিতে বাকী রাখে না। সেদিন তো এ্যালজেব্রার আঁক না পারার দরুন আমাদের সামনে সেকেন্ড মাস্টার ওকে বললে–তুমি তো শুনিচি কেষ্ট নাম শুনলে কেঁদে ফেল–তা যাও, পয়সা আছে বাপের, মঠ বানাও, মচ্ছব দেও, লেখাপড়া করবার শখ কেন? এ-সব তোমার হবে না বাপু।
আমি একদিন বনমালীর কাছে সন্ধ্যার সময় গিয়েছি। ও তখন একটা টুলের ওপর ব’সে একমনে দেওয়ালের দিকে চেয়ে বোধ হয় জপ করচে–আমায় দেখে উঠে দোর খুলে দিল, হেসে বসতে বললে। ওকে অদ্ভুত মনে হয়, সেজন্যেই দেখা করতে গিয়েছিলাম যে তা নয়–আমার মনে হয়েছিল ও যে-রকম ছেলে, ও বোধ হয় আমার নিজের ব্যাপারগুলোর একটা মীমাংসা করে দিতে পারবে। তা ছাড়া ওকে আমার ভাল লাগে খুব, ওকে ভাল মানুষ পেয়ে সবাই খেপায়, অথচ ও প্রতিবাদ করে না, অনেক সময় বোঝে না যে তারা খেপাচ্ছে, এতে আমার বড় মায়া হয় ওর ওপর।
বনমালীকে জিজ্ঞেস করলাম সে কিছু দেখে কিনা। সে আমার কথা বুঝতে পারলে না, বললে–কি দেখবো?
তাকে বুঝিয়ে বললাম। না,–সে কিছু দেখে না।
তারপর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ঘরে একখানা ছবি ছিল, আমি সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম–ওখানা কি তোমার ঠাকুরের ছবি?
বনমালীর গলার সুর বদলে গেল, চোখের চাউনি অন্য রকম হয়ে গেল। সে বললে– ঠিক বলেচ ভাই, আমার ঠাকুরের ছবি, চমৎকার কথা বলেচ ভাই–ওই তো আমার সব, আমার ঠাকুর শুধু কেন, তোমার ঠাকুর সবারই ঠাকুর—
বলতে বলতে দর দর করে তার চোখে জল পড়তে লাগল।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু একটু পরে বনমালীর কান্নার বেগ থামলে গর্বের সুরে বললাম–খুব গোপনীয় কথা বললাম ওকে–কারও কাছে এ পর্যন্ত মুখ ফুটে কথাটা বলিনি। বললাম–আমার ঠাকুর অন্য কেউ নয়, আমার ঠাকুর যীশুখ্রীস্ট–আমার কাছেও ছবি আছে–
বনমালী হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে রইল–তারপর অপ্রতিভভাবে বললে–ও, তোমরা খৃস্টান?
আমি চুপ করে রইলাম।
বনমালী ভেবে বললে–তাঁর কাছে সব সমান—
আমি বললাম–কার কাছে?
–শ্রীহরির কাছে ভাই, আবার কার কাছে? তাঁর কাছে কি আর হিন্দু, মোছলমান, খৃস্টান আছে? তিনি যে পতিতপাবন–অধমের ঠাকুর–
আমার মনে ব্যথা লাগল এই ভেবে, বনমালী আমাকে অধম মনে করছে। যীশুখৃস্টকে ও ছোট করতে চায়। আমি বললাম–যীশুর কাছেও সব সমান। পাপীদের জন্যে তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন–জান? মথিলিখিত সুসমাচারে লিখেছে, যে তাহাতে বিশ্বাস করে সে অনন্ত জীবন–
মথি-লিখিত সুসমাচারের বাইরে আমার আর কিছু জানা নেই। বনমালী কিন্তু সংস্কৃতে শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান আবৃত্তি করে আমায় শ্রীকৃষ্ণের রূপ বুঝিয়ে দিলে–আরও অনেক কথা বললে। আমি দু-তিন দিন তার কাছে গেলাম, তার ঠাকুর সম্বন্ধে শুনবার জন্যে।
জ্যাঠাইমাদের বাড়ির সকলের চেয়ে ও বেশী জানে ওদের ধর্ম সম্বন্ধে–এ আমার মনে হ’ল। কিন্তু বনমালী আমার খ্রীস্টভক্তি ভাল চোখে দেখলে না, বললে–হিন্দু হয়ে ভাই এ তোমার ভারি অদ্ভুত কাণ্ড যে তুমি অপরের দেবতাকে ভক্তি করো। গীতায় বলেছে, স্বধর্মে নিধনং শেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ—-অর্থাৎ নিজের ধর্মে–
আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, হিন্দু আমি কখনই না। আমরা যেখানে যে-অবস্থায় মানুষ হয়েচি সেখানে হিন্দুধর্মের কথা কিছু শুনিনি কোনো দিন কেউ বলত না। যা বলত, তাই শুনেচি, তাই বিশ্বাস করেছি–তা মনে লেগেছে। এতে আমার কি কোনো দোষ হয়েছে ভাই?
সেদিন সন্ধ্যার সময় আমাদের দালানে আমি বসে পড়চি, এমন সময় কার পায়ের শব্দ শুনে চেয়ে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম–ছোটকাকীমা দাঁড়িয়ে! ছোটকাকীমা বড় মানুষের মেয়ে, তিনি তো কস্মিনকালে আমাদের ভাঙা দালানে পা দেননি–বিশেষ করে আমাদের দু-চোখে তিনি দেখতে পারেন না কোনো কালে–বরং মেজকাকীমা সময়ে অসময়ে নরম হন, ছোট কাকীমার মুখে মিষ্টি কথা কোনো দিন শুনিওনি। আমাদের ঘরে আর কেউ নেই–দাদা এখনও ফেরেনি–সীতা ও মা জ্যাঠাইমাদের অন্দরে। আমি দাঁড়িয়ে উঠে থতমত খেয়ে বললাম–কি কাকীমা?
