গুরুদেব মুখে মুখে ধর্মের কথা বলতে লাগলেন। আমি আর একটু এগিয়ে গেলাম ভাল করে শোনবার জন্য। এ-সব কথা শুনতে আমার বড় ভাল লাগে।
একবার কি একটা যোগ উপস্থিত–গঙ্গাস্নানে মহাপুণ্য, সকল পাপ ক্ষয় হয়ে যাবে, স্নান করলেই মুক্তি। পার্বতী শিবকে বললেন–আচ্ছা প্রভু, আজ এই যে লক্ষ লক্ষ লোক কাশীতে স্নান করবে, সকলেই মুক্তি পাবে? শিব বললেন, তা নয় পার্বতী। চলো তোমায় দেখাব।
দুজনে কাশীতে এলেন মণিকর্ণিকার ঘাটে। শিব বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের শব সেজে ঘাটের ধারে পড়ে রইলেন। পার্বতী তাঁর স্ত্রী সেজে পাশে বসে কাঁদতে লাগলেন। যারা এল, তাদের বললেন আমার বৃদ্ধ স্বামী মারা গিয়েছেন, এর সৎকার করার ব্যবস্থা আপনারা করুন। কিন্তু একটা মুশকিল আছে, শব যিনি স্পর্শ করবেন, তাঁর সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হওয়া চাই, নইলে শব-স্পর্শেই মৃত্যু ঘটবে।
এ-কথা শুনে সাহস করে কেউ এগোয় না। সবাই ভাবে পাপ তো কতই করেচি। প্রাণ দিতে যাবে কে? সারাদিন কাটলো। সন্ধ্যা নামে-নামে। একজন চণ্ডাল ঘাটের ধারে অশ্রুমুখী ব্রাহ্মণপত্নীকে দেখে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে। পার্বতী সকলকে যা বলে এসেছেন তাকেও তাই বললেন। চণ্ডাল শুনে ভেবে বললে–তার জন্য ভাবনা কি মা? আজ গঙ্গাস্নান করলে তো নিষ্পাপ হবোই, এত বড় যোগ যখন, এ জন্ম তো দূরের কথা শত জন্মের পাপ ক্ষয় হয়ে যাবে পাঁজিতে লিখেচে। তা দাঁড়ান, আমি ডুবটা দিয়ে আসি এবং একটু পরেই ডুব দিয়ে উঠে এসে বললে–মা ধরুন ওদিক, আমি পায়ের দিকটা ধরচি–চলুন নিয়ে যাই।
শিব নিজমূর্তি ধারণ করে চণ্ডালকে বর দিলেন। পার্বতীকে বললেন–পার্বতী দেখলে? এই লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে এই লোকটি মাত্র আজকের যোগের ফল লাভ করবে। মুক্তি যদি কেউ পায় এই চণ্ডালই পাবে।
গল্পটা আমার ভারি ভাল লাগল। সে-দিনকার চৈতন্যচরিতামৃতে পড়া সেই কথাটা মনে পড়ল–জ্যাঠাইমাকে বলেছিলাম, জ্যাঠাইমা বিশ্বাস করেন নি। ওঁদের শাস্ত্রের কথাতেই ওঁর বিশ্বাস নেই। অথচ মুখে হিন্দুয়ানি তো খুব দেখান! আর আমাকে, মাকে, সীতাকে, দাদাকে বলেন খিরিস্টান।
আজযের গুরুদেবের এই গল্পটা কি জ্যাঠাইমা কাকীমারা বুঝতে পারলেন? চণ্ডালের ওপর আমার ভক্তি হ’ল। আমি যেন মনে মনে কাশী চলে গিয়েচি, আমি যেন মণিকর্ণিকার ঘাটে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণবেশী শিব ও ক্রন্দনরতা পার্বতীকে প্রত্যক্ষ করেছি।
ও-বছর বড়দিনের সময় মিশনারী মেয়েরা আমাদের রঙীন কার্ড দিয়েছিল, ছোট একখানা ছবিওয়ালা বই দিয়েছিল। তাতে একটি কথা সোনার জলে বড় বড় করে লেখা আছে মনে পড়ল–তাহারা ধন্য যাহারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। কারণ তাহারা জীবনমুকুট প্রাপ্ত হইবে।
তার পরদিন সন্ধ্যাবেলাতেও গুরুদেব আমলকীতলায় আসন পেতে বসে গল্প বলছিলেন ছেলেমেয়েদের। একবার উঠে আহ্নিক করতে গেলেন, আবার এসে বসলেন। মেয়েরাও এলেন।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার দিকে আঙুল দিয়ে বললেন–ও ছেলেটি কে? রোজ দেখি দাঁড়িয়ে থাকে। এস এস বাবা, এদিকে এস।
প্রথমটা আমার বড় লজ্জা হ’ল কিন্তু কেমন একটা আনন্দও হ’ল। একটু এগিয়ে গেলাম। জ্যাঠাইমা বললে–ও আমার এক খুড়তুতো দেওরের ছেলে। ওরা এখানে থাকতো না, চা-বাগানে ওর বাবা কাজ করতো। এখানে এসে অসুখ হয়ে মারা গেল আর তো কেউ নেই, ওরা এ বাড়িতে থাকে।
গুরুদেব বললেন–এস দেখি বাবা, হাতটা দেখি, সরে এস। তারপর জ্যাঠাইমাদের দিকে চেয়ে বললেন–খুব লক্ষণযুক্ত ছেলে। এর বয়স কত?
আমায় লক্ষণযুক্ত বলাতে–বিশেষত অত ছেলের মাঝ থেকে-জ্যাঠাইমা কাকীমারা নিশ্চয়ই খুব খুশি হননি। জ্যাঠাইমা প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন আমার বয়স নাকি পনেরো বছর–আমি ওঁর ছেলে হাবুর চেয়েও দেড় বছরের বড়। আসলে আমার বয়স তেরো–জ্যাঠাইমার বড় ছেলে হাবুকে আমরা হাবুদা বলে ডাকি, সে আমাদের সবার চেয়ে দু-বছরের বড়। স্কুলে তার যা বয়েস লেখানো আছে, তাই ধরে বলচি।
তারপর গুরুদেব আমায় জিজ্ঞেস করলেন–কি পড় বাবা?
আমি কোন ক্লাসে পড়ি বললাম।
ধাতুরূপ কতদূর পড়েচ? লুঙ লিট বোঝ? এই শোনো একটি শ্লোক-
সোধ্যৈষ্ট বেদাংস্ত্রিদশানষ্ট
পিতৃতার্প্সীৎ সমমংস্তে বন্ধুন
ব্যজৈষ্ঠ ষড়বর্গমরংস্ত নীতৌ
সমূলঘাতংন্যবধীদরীংশ্চ।
হেসে বললেন—কত রকম ধাতুর ব্যবহার দেখেছ? এ হ’ল ভট্টিকাব্যের শ্লোক।
আমার বেশ ভালো লাগলো, গুরুদেবকেও এবং তাঁর শ্লোককেও। আমি এর আগে সংস্কৃত শ্লোক বেশি শুনিনি। চা-বাগানে কেউ বলতো না। শ্লোকটা আমি মুখস্থ করে নিলাম।
একদিন তিনি বাড়ির পাশের মাঠে শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বেলেচেন। আমায় দেখে বললেন–এসো জিতু–
আমি বললাম–কি করবেন আগুন জ্বেলে?…
—তামাক পোড়াবো!
— আমি বললাম, আমি পুড়িয়ে দিচ্চি।
গুরুদেব অনেক সংস্কৃত শ্লোক আমাকে শোনালেন। কুবেরের শাপে এক যক্ষ গৃহ থেকে বহুদূরে কোন পর্বতে নির্বাসিত হয়েছিল, বাড়ির জন্যে ভেবে ভেবে তার হাতের সোনার বালা ঢল হয়ে গিয়েছিল, তারপর আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে সেই পাহাড়ের মাথায় বর্ষার নতুন কালো মেঘ নামল–এই রকম একটা, শ্লোকের মানে। আমি তো সংস্কৃত পড়ি মোটে ঋজুপাঠ, কিন্তু আমাকেই তিনি আগ্রহের সঙ্গে এমনি ভাল ভাল অনেক শ্লোক শোনাতে লাগলেন–যেন আমি কত বুঝি!
