যদু অধিকারীর বাড়ির মেয়েরা তাকে নাকি জিজ্ঞেস করেছে–শোন সীতা, আচ্ছা উমার যদি বিয়ে না হয় ওখানে, তোর বিয়ে দিয়ে যদি দিই, তোর পছন্দ হয় কাকে বল তো?
সীতা বুঝতে পারেনি যে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করচে–বলেচে নাকি চোখে-চশমা কে একজন এসেছিল তাকে।
ওরা সে কথা নিয়ে হাসাহাসি করচে। জ্যাঠাইমার কানেও গিয়েছে কথাটা। জ্যাঠাইমা ও সেজকাকীমা মিলে সীতাকে বেহায়া, বোকা, বদমাইশ জ্যাঠা মেয়ে, যা তা বলে গালাগালি আরম্ভ করলেন। আরও এমন কথা সব বললেন যা ওঁদের মুখ দিয়ে বেরুলো কি করে আমি বুঝতে পারিনি। আমি সীতাকে বকলাম, মাও বকলেন–তুই যাস কেন যেখানে সেখানে, আর না বুঝে যা তা বলিসই বা কেন? এ-সব জায়গার ধরন তুই কি বুঝিস?
সীতার চোখ ছল ছল ক’রে উঠল। সে অতশত বোঝেনি, কে জানে ওরা আবার এখানে বলে দেবে! সে মনে যা এসেছে, মুখে সত্যি কথাই বলেচে। এ নিয়ে এত কথা উঠবে তা বুঝতেই পারেনি।
২. পৌষ মাসের শেষে
০৫.
পৌষ মাসের শেষে আমাদের বাড়ি সরগরম হয়ে উঠল–শুনলাম ওঁদের গুরুদেব আসবেন বলে চিঠি লিখেছেন।
এই গুরুদেবের কথা আমি এঁদের বাড়িতে এর আগে অনেক শুনেচি–জ্যাঠামশায়ের ঘরে তাঁর একটা বড় বাঁধানো ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম–গুরুদেব চেয়ারে বসে আছেন, জ্যাঠামশায় ও জ্যাঠাইমা দুজন দু-দিকে মাটিতে বসে তাঁর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছেন। অনেক দিন থেকে ছবিখানা দেখে গুরুদেব সম্বন্ধে আমার মনে একটা কৌতূহল হয়েছিল–কিরকম লোক একবার দেখবার বড় ইচ্ছে হত।
স্টেশনে তাঁকে আনতে লোক গিয়েছিল–একটু বেলা হ’লে দেখি দাদা এক ভারী মোট বয়ে আগে আগে আসচে-পেছনে ব্যাগ-হাতে জ্যাঠামশায়দের কৃষাণ নিমু গোয়ালা। গুরুদেব হেঁটে আসচেন, রং কালো, মাথার সামনের দিকে টাক–-গায়ে চাদর, পায়ে চটি। আমার জাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা দরজার কাছে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল–পায়ের ধুলো নেওয়ার জন্যে তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। আমি এগিয়েও গেলাম না, পায়ের ধুলোও নিলাম না। জ্যাঠাইমা গুরুদেবের পা নিজের হাতে ধুইয়ে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলেন, খুড়ীমারা বাতাস করতে লাগলেন–ছেলে-মেয়েরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, তিনি সেজ-খুড়ীমাকে জিজ্ঞেস করলেন–বৌমা, ছেলের তোতলামিটা সেরেচে? মেজখুড়ীমাকে বললেন–গোষ্ঠ মেজকাকার নাম আজকাল কি বাদার কাছারী থেকে গরমের সময় একদম আসে না?..কতদিন আগে এসেছিল বললে?
বাড়ির ছেলেমেয়েদের একে ওকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন, দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন–কিন্তু দাদা যে অত বড় ভারী মোট বয়ে আনলে স্টেশন থেকে, সে-ও সেইখানে দাঁড়িয়ে–তাকে একটা মিষ্টি কথাও বললেন না। আমার রাগ হ’ল, তিনি কি ভেবেচেন দাদা বাড়ির চাকর? তাও ভাবা অসম্ভব এইজন্যে যে, ওখানে যতগুলো ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে ভিড় করে আছে, তাদের মধ্যে দাদার রূপ সকলের আগে চোখকে আকৃষ্ট করে-এ গায়ে দাদার মত রূপবান বালক নেই, শুধু এ বাড়ি তো দূরের কথা। আশা করে দাঁড়িয়ে আছে, একটা ভাল কথাও তো বলতে হয় তার সঙ্গে?
গুরুদেবের জন্যে বিকেলে বাড়িতে কত কি খাবার তৈরি হ’ল–মেজখুড়ীমা, সদুর-মা, জ্যাঠাইমা–সবাই মিলে ক্ষীরের, নারিকেলের, ছানার কি সব গড়লেন। মাকে এ-সব কাজে ডাক পড়ে না, কিন্তু দেখে একটু অবাক হলাম সদুর মাকে ওঁরা এতে ডেকেচেন। মা আর সদুর মা’র ওপর যত উঞ্ছ কাজের ভার এ বাড়ির। সদুর মা’র অদৃষ্ট ভাল হয়েচে দেখচি।
গুরুদেব সন্ধ্যা-আহ্নিক সেরে বাইরে এলে তাঁকে যখন খাবার দেওয়া হ’ল, তখন সেখানে বাড়ির ছেলেমেয়ে সবাই ছিল–আমরাও ছিলাম। কিন্তু হিরণদিদি ও সেজকাকীমা সকলকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। গুরুদেব বললেন–কেন ওদের যেতে বলচ বৌমা, থাক না, ছেলেপিলেরা গোলমাল করেই থাকে–
গুরুদেব তিন-চারদিন রইলেন। তাঁর জন্যে সকালে বিকালে নিত্যনূতন কি খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাই যে হ’ল! পিঠে, পায়েস, সন্দেশ, ছানার পায়েস, ক্ষীরের ছাঁচ, চন্দ্রপুলি, লুচি–তিনি তো খেতে পারতেন না–আমরা বাদে বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা তাঁর পাতের প্রসাদ পেত। তিনি জলখাবার খেয়ে উঠলে তাঁর রেকাবিতে বা থালায় যা পড়ে থাকত, কাকীমারা ডেকে ছেলেমেয়েদের দিতেন–আমরা সেখানে থাকতাম না–কারণ প্রথম দিকে ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকলে কাকীমা বকতেন–তার পর গুরুদেবের খাওয়া হয়ে গেলে যখন তাদের ডাক পড়ত, তখন বাড়ির ছেলেরা কাছেকাছেই থাকতো ব’লে তারাই যেত–আমি কারুর পাতের জিনিস খেতে পারিনে, এই জন্যে আমি যেতাম না। ওঁরা ডেকেও কোনো খাবার জিনিস আমাদের কোনো দিন দিলেন না–কিন্তু মনে মনে আমি হতাশ হলাম–আমি একেবারে যে আশা করিনি তা নয়, ভেবেছিলাম গুরুদেব এলে আমরা সবাই ভাল খাওয়ার ভাগ পাব কিছু কিছু।
সন্ধ্যাবেলা। বেশ শীত পড়েছে। গুরুদেব আমলকীতলায় কাঠের জলচৌকিতে কম্বল পেতে বসে আছেন। গায়ে সবুজ পাড়-বসানো বালাপোশ-ছেলেমেয়েরা সব ঘিরে আছে, যেমন সর্বদাই থাকে একটু পরে জ্যাঠাইমা, মেজকাকীমা, সদুর মা, হিরণদিদি এলেন।
গুরুদেবের খুব কাছে আমি কোনো দিন যাইনি–আমি গোয়ালঘরের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, ছেলেমেয়েরা গল্প শুনচে গুরুদেবের কাছে, আমার কিন্তু গল্পের দিকে মন নেই, আমার জানবার জন্যে ভয়ানক কৌতূহল যে গুরুদেব কি ধরনের লোক, তাঁর অত খাতির, যত্ন, আদর এরা কেন করে, তাঁর পায়ে জ্যাঠাইমা ও জ্যাঠামশায় পুস্পাঞ্জলি দেনই বা কেন, তাঁর ফটো বাঁধিয়েই বা ঘরে রাখা আছে কেন? এসবের দরুন গুরুদেব সম্বন্ধে আমার মনে এমন একটা অদ্ভুত আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মে গিয়েছে যে, তিনি যেখানেই থাকুন, আমি কাছে কাছে আছি সর্বদাই–অথচ খুব নিকটে যাইনে!
