চণ্ডালকুমারীর ন্যায়ানুগত বাক্য শুনিয়া বিস্মিত হইলাম এবং ফলভক্ষণ ও জলপান দ্বারা ক্ষুৎপিপাসা শান্তি করিলাম; কিন্তু কথা কহিলাম না। ক্রমে যৌবন প্রাপ্ত হইলাম। একদা পিঞ্জরের অভ্যন্তরে নিদ্রিত আছি, জাগরিত হইয়া দেখি, পিঞ্জর সুবর্ণময় ও পক্কণপুর অমরপুর হইয়াছে। চণ্ডালদারিকাকে মহারাজ যেরূপ রূপলাবণ্যসম্পন্ন দেখিতেছেন ঐরূপ আমিও দেখিলাম। দেখিয়া অতিশয় বিস্ময় জন্মিল। সমুদায় বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিয়া জানিব ভাবিয়াছিলাম। ইতিমধ্যে মহারাজের নিকট আনীত হইয়াছি। ঐ কন্যা কে, কি নিমিত্ত চণ্ডালকন্যা বলিয়া পরিচয় দেয়, আমাকেই বা কি নিমিত্ত ধরিয়াছে মহারাজের নিকটই বা কি জন্য আনয়ন করিয়াছে কিছুমাত্র অবগত নহি।
রাজা শূদ্রক, শুকের এই দীর্ঘ উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া শেষ বৃত্তান্ত শুনিবার নিমিত্ত অতিশয় কৌতুকাক্রান্ত হইলেন। প্রতীহারীকে আজ্ঞা দিলেন, শীঘ্র সেই চণ্ডালকন্যাকে লইয়া আইস। প্রতীহারী যে আজ্ঞা বলিয়া কন্যাকে সঙ্গে করিয়া আনিল। কন্যা শয়নাগারে প্রবেশিয়া প্রগল্ভ বচনে কহিল, ভুবনভূষণ রোহিণীপতে, কাদম্বরীলোচনানন্দ, চন্দ্র! শুকের ও আপনার পূর্ব্বজন্মবৃত্তান্ত অবগত হইলেন, পক্ষী অনুরাগান্ধ হইয়া পিতার আদেশ উল্লঙ্ঘন পূর্ব্বক মহাশ্বেতার নিকট যাইতেছিল তাহাও শুনিলেন। আমি ঐ দুরাত্মার জননী লক্ষ্মী, মহর্ষি কালত্রয়দর্শী দিব্য চক্ষু দ্বারা উহাকে পুনর্ব্বার অপথে পদার্পণ করিতে দেখিয়া আমাকে কহিলেন, তুমি ভূতলে গমন কর এবং যাবৎ আরব্ধ কর্ম্ম সমাপ্ত না হয় তাবৎ তোমার পুত্ত্রকে তথায় বদ্ধ করিয়া রাখ এবং যাহাতে অনুতাপ হয় এরূপ শিক্ষা দিও! কি জানি, যদি কর্ম্মদোষে আবার তির্য্যগ্জাতি অপেক্ষাও অন্য কোন নীচ জাতিতে পতিত হয়। দুষ্কর্ম্মের অসাধ্য কিছুই নাই। আমি মহর্ষির বচনানুসারে উহাকে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। অদ্য কর্ম্ম সমাপ্ত হইয়াছে এই নিমিত্ত তোমাদিগের পরস্পর মিলন করিয়া দিলাম; এক্ষণে জরামরণাদিদুঃখসঙ্কুল এই দেহ পরিত্যাগ করিয়া আপন আপন অভীষ্ট বস্তু লাভ কর, এই বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন।
৩.২ উপসংহার : লক্ষ্মীর বাক্য শুনিবামাত্র
লক্ষ্মীর বাক্য শুনিবামাত্র রাজার জন্মান্তর বৃত্তান্ত সমুদায় স্মরণ হইল। তখন মকরকেতু কাদম্বরীকে তাঁহার স্মৃতিপথে উপস্থিত করিয়া শরাসনে শর সন্ধান করিলেন। তখন গন্ধর্ব্বকুমারী কাদম্বরীর বিরহবেদনা রাজার হৃদয়ে অতিশয় যন্ত্রণা দিতে লাগিল। এ দিকে বসন্তকাল উপস্থিত। সহকারের মুকুলমঞ্জরী সঞ্চালিত করিয়া মলয়ানিল মন্দ মন্দ বহিতে লাগিল কোকিলের কুহুরবে চতুর্দ্দিক্ ব্যাপ্ত হইল। অশোক, কিংশুক, কুরুবক, চম্পক প্রভৃতি তরুগণ বিকসিত কুসুম দ্বারা দিঙ্মণ্ডল আলোকময় করিল। অলিকুল বকুলপুষ্পের গন্ধে অন্ধ হইয়া ঝঙ্কার পূর্ব্বক তাহার চতুর্দ্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিল। তরুগণ পল্লবিত ও ফলভরে অবনত হইল। কমলবন বিকসিত হইয়া সরোবরের শোভা বৃদ্ধি করিল। ক্রমে মদনমহোৎসবের সময় সমাগত হইলে, একদা কাদম্বরী সায়াহ্নে সরোবরে স্নান করিয়া ভক্তিভাবে অনঙ্গদেবের অর্চ্চনা করিলেন। চন্দ্রাপীড়ের শরীর ধৌত ও মার্জ্জিত করিয়া গাত্রে হরিচন্দন লেপন করিয়া দিলেন এবং কণ্ঠদেশে কুসুমমালা ও কর্ণে অশোকস্তবক পরাইয়া দিলেন। উত্তম বেশ ভূষায় ভূষিত করিয়া সস্পৃহ লোচনে বারংবার নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। একে বসন্ত কাল তাহাতে নির্জ্জন প্রদেশ। রতিপতিও সময় বুঝিয়া অমনি শর নিক্ষেপ করিলেন। কাদম্বরী উন্মত্ত ও বিকৃতচিত্ত হইয়া জীবিতভ্রমে যেমন চন্দ্রাপীড়ের মৃত দেহ গাঢ় আলিঙ্গন করিবার উপক্রম করিতেছেন, অমনি চন্দ্রাপীড় পুনর্জীবিত হইয়া উঠিলেন। কাদম্বরী ভয়ে কাঁপিতেছেন, চন্দ্রাপীড় সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভীরু! ভয় কি? এই দেখ, আমি পুনর্জীবিত হইয়াছি। আজি শাপাবসান হইয়াছে। এত দিন বিদিশা নগরীতে শূদ্রক নামে নরপতি ছিলাম, অদ্য সে শরীর পরিত্যাগ করিয়াছি। তোমার প্রিয়সখী মহাশ্বেতার মনোরথও আজি সফল হইবেক। আজি পুণ্ডরীকও বিগতশাপ হইয়াছেন। বলিতে বলিতে চন্দ্রলোক হইতে পুণ্ডরীক নভোমণ্ডলে অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহার গলে সেই একাবলী মালা ও বামপার্শ্বে কপিঞ্জল। কাদম্বরী প্রিয়সখীকে প্রিয় সংবাদ শুনাইতে গেলেন, এমন সময়ে পুণ্ডরীক চন্দ্রাপীড়ের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। চন্দ্রাপীড় সমাদরে হস্ত ধারণ ও কণ্ঠগ্রহণ পূর্ব্বক মৃদু মধুর বচনে বলিলেন, সখে! তোমার সৌহার্দ্দ কখন বিস্মৃত হইতে পারিব না। আমি তোমাকে বৈশম্পায়ন বলিয়াই জ্ঞান করিব। তোমাকে আমার সহিত মিত্রতা ব্যবহার করিতে হইবেক।
গন্ধর্ব্বরাজ চিত্ররথ ও হংসকে এই শুভ সংবাদ শুনাইবার নিমিত্ত কেয়ূরক হেমকূটে গমন করিল। মদলেখা আহ্লাদিত হইয়া তারাপীড় ও বিলাসবতীর নিকটে গিয়া কহিল, আপনাদের সৌভাগ্যবলে, যুবরাজ আজি পুনর্জ্জীবিত হইয়াছেন। রাজা, রাণী, শুকনাস ও মনোরমা এই বিস্ময়কর শুভসমাচার শ্রবণে পরম পুলকিত হইয়া শীঘ্র আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। চন্দ্রাপীড় জনক জননীকে সমাগত দেখিয়া বিনীত ভাবে প্রণাম করিবার নিমিত্ত মস্তক অবনত করিতেছিলেন, রাজা অমনি ভুজযুগল প্রসারিত করিয়া ধরিলেন। কহিলেন, বৎস! জন্মান্তরীণ পুণ্যফলে তোমাকে পুত্ত্ররূপে প্রাপ্ত হইয়াছি বটে; কিন্তু তুমি সাক্ষাৎ ভগবান্ চন্দ্রমার মূর্ত্তি! তুমিই সকলের নমস্য; তোমাকে দেখিয়া আজি দেবগণ অপেক্ষাও সৌভাগ্যশালী হইলাম। আজি জীবন সার্থক ও ধর্ম্ম কর্ম্ম সফল হইল। বিলাসবতী পুনঃ পুনঃ মুখচুম্বন ও শিরোঘ্রাণ করিয়া সস্নেহে পুত্ত্রকে ক্রোড়ে করিলেন। তাঁহার কপোলযুগল হইতে আনন্দাশ্রু বহিতে লাগিল। অনন্তর শুকনাস ও মনোরমাকে প্রণাম করিলেন। তাঁহারাও যথোচিত স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক যথাবিহিত আশীর্ব্বাদ করিলেন। ইনিই বৈশম্পায়নরূপে আপনাদিগের পুত্ত্র হইয়াছিলেন বলিয়া চন্দ্রাপীড় পুণ্ডরীকের পরিচয় দিলেন। পুণ্ডরীক জনক জননীকে ভক্তিভাবে প্রণাম করিলেন। কপিঞ্জল কহিলেন, শুকনাস! মহর্ষি শ্বেতকেতু আপনাকে বলিয়া পাঠাইলেন, “আমি পুণ্ডরীকের লালন পালন করিয়াছি বটে, কিন্তু ইনি তোমার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত। অতএব তোমার নিকটেই পাঠাইতেছি! ইঁহাকে বৈশম্পায়ন বলিয়া জ্ঞান করিও, কদাচ ভিন্ন ভাবিও না”। শুকনাস কহিলেন, মহর্ষির আদেশ গ্রহণ করিলাম, তিনি যাহা আজ্ঞা করিয়াছেন তাহার অন্যথা হইবেক না। বৈশম্পায়ন বলিয়াই আমার জ্ঞান হইতেছে। এইরূপ নানা কথায় রজনী প্রভাত হইল। প্রাতঃকালে চিত্ররথ ও হংস, মদিরা ও গৌরীর সহিত তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সমুদায় গন্ধর্ব্বলোক আহ্লাদে পুলকিত হইয়া আগমন করিল।
