অনন্তর নিঃশব্দ নিশীথপ্রভাবে দূর হইতেই “হা হতোঽস্মি—হা দগ্ধোঽস্মি—হায় কি হইল—রে দুরাত্মন্ পাপকারিন্ পিশাচ মদন! কি কুকর্ম্ম করিলি—আঃ পাপীয়সি দুর্ব্বিনীতে মহাশ্বেতে! ইনি তোমার কি অপকার করিয়াছিলেন—রে দুশ্চরিত্র চন্দ্র চণ্ডাল! এক্ষণে তুই কৃতকার্য্য হইলি—রে দক্ষিণানিল! তোর মনোরথ পূর্ণ হইল—হা পুত্ত্রবৎসল ভগবন্ শ্বেতকেতো! তোমার সর্ব্বস্ব অপহৃত হইয়াছে বুঝিতে পারিতেছ না? হে ধর্ম্ম তোমাকে আর অতঃপর কে আশ্রয় করিবে? হে তপঃ! এত দিনের পর তুমি নিরাশ্রয় হইলে। সরস্বতি! তুমি বিধবা হইলে। সত্য! তুমি অনাথ হইলে। হায়! এত দিনের পর সুরলোক শূন্য হইল। সখে! ক্ষণকাল অপেক্ষা কর, আমি তোমার অনুগমন করি। চিরকাল একত্র ছিলাম, এক্ষণে সহায়হীন, বান্ধবহীন হইয়া কিরূপে এই দেহভার বহন করিব? কি আশ্চর্য্য! আজন্মপরিচিত ব্যক্তিকেও অপরিচিতের ন্যায় অদৃষ্টপূর্ব্বের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেলে? যাইবার সময় এক বার জিজ্ঞাসাও করিলে না? এরূপ কৌশল কোথায় শিখিলে? এরূপ নিষ্ঠুরতা কাহার নিকট অভ্যাস করিলে? হায়! এক্ষণে সুহৃৎশূন্য, সহোদরশূন্য হইয়া কোথায় যাইব? কাহার শরণাপন্ন হইব? কাহার সহিত আলাপ করিব? এত দিনের পর অন্ধ হইলাম। দশ দিক্ শূন্য দেখিতেছি। সকলই অন্ধকারময় বোধ হইতেছে। এই ভারভূত জীবনে আর প্রয়োজন কি? সখে! এক বার আমার কথায় উত্তর দাও। এক বার নয়ন উন্মীলন কর। আমি তোমার প্রফুল্ল মুখকমল এক বার অবলোকন করিয়া জন্মের মত বিদায় হই। আমার সহিত তোমার সেই অকৃত্রিম প্রণয় ও অকপট সৌহার্দ্দ কোথায় গেল? তোমার সেই অমৃতময় বাক্য, স্নেহময় দৃষ্টি স্মরণ করিয়া আমার বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ হইতেছে।” কপিঞ্জল আর্ত্ত স্বরে মুক্তকণ্ঠে এইরূপ ও অন্যরূপ নানাপ্রকার বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন শুনিতে পাইলাম।
কপিঞ্জলের বিলাপবাক্য শ্রবণ করিয়া আমার প্রাণ উড়িয়া গেল। মুক্ত কণ্ঠে রোদন করিতে করিতে দ্রুত বেগে দৌড়িলাম। পদে পদে পদস্খলন হইতে লাগিল, তথাপি গতির প্রতিরোধ জন্মিল না। তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, যাঁহার শরণাপন্ন হইতে বাটীর বহির্গত হইয়াছিলাম, তিনি সরোবরের তীরে লতামণ্ডপমধ্যবর্ত্তী শিলাতলে শৈবালরচিত শয্যায় শয়ন করিয়া আছেন। কমল, কুমুদ, কুবলয় প্রভৃতি নানাবিধ কুসুম, শয্যার পার্শ্বে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। মৃণাল ও কদলীপল্লব চতুর্দ্দিকে বিকীর্ণ আছে। তাঁহার শরীর নিস্পন্দ, বোধ হইল যেন, মনোযোগ পূর্ব্বক আমার পদশব্দ শুনিতেছেন; মনঃক্ষোভ হইয়াছিল বলিয়া যেন একমনা হইয়া প্রাণায়াম দ্বারা প্রায়শ্চিত্ত করিতেছেন; আমা হইতেও আর এক জন প্রিয়তম হইল বলিয়া যেন, ঈর্ষ্যা প্রযুক্ত প্রাণ দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে। ললাটে ত্রিপুণ্ড্রক, স্কন্ধে বল্কলের উত্তরীয়, গলে একাবলী মালা, হস্তে মৃণালবলয়ধারণ পূর্ব্বক অপূর্ব্ব বেশ রচনা করিয়া যেন, আমার সহিত সমাগমের নিমিত্ত অনন্যমনা হইয়া মন্ত্র সাধন করিতেছেন। কপিঞ্জল তাঁহার কণ্ঠ ধারণ করিয়া রোদন করিতেছেন। অচিরমৃত সেই মহাপুরুষকে এই হতভাগিনী ও পাপকারিণী আমি গিয়া দেখিলাম। আমাকে দেখিয়া কপিঞ্জলের দুই চক্ষু হইতে অশ্রুস্রোত বহিতে লাগিল। দ্বিগুণ শোকাবেগ হইল। অতিশয় পরিতাপ পূর্ব্বক হা হতোস্মি বলিয়া আরও উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন।
তখন মূর্চ্ছা দ্বারা আক্রান্ত ও মোহে নিতান্ত অভিভূত হইয়া বোধ হইল যেন, অন্ধকারময় পাতালতলে অবতীর্ণ হইতেছি। তদনন্তর কোথায় গেলাম, কি বলিলাম কিছুই মনে পড়ে না। স্ত্রীলোকের হৃদয় পাষাণময় এজন্যই হউক, এই হতভাগিনীকে দীর্ঘ শোক ও চিরকাল দুঃখ সহ্য করিতে হইবে বলিয়াই হউক, দৈবের অত্যন্ত প্রতিকূলতাবশতই বা হউক, জানি না কি নিমিত্ত এই হতভাগিনীর প্রাণ বহির্গত হইল না। অনেক ক্ষণের পর চেতন হইয়া ভূতলে বিলুণ্ঠিত ও ধূলিধূসরিত আত্মদেহ অবলোকন করিলাম। প্রাণেশ্বর প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, আমি জীবিত আছি, প্রথমতঃ ইহা নিতান্ত অসম্ভাব্য, অবিশ্বাস্য ও স্বপ্নকল্পিত বোধ হইল। কিন্তু কপিঞ্জলের বিলাপ শুনিয়া সে ভ্রান্তি দূর হইল। তখন হা হতোঽস্মি বলিয়া আর্ত্তনাদ ও পিতা মাতা সখিদিগকে সম্বোধন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে লাগিলাম।
হে জীবিতেশ্বর! এই অনাথাকে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গেলে? তুমি তরলিকাকে জিজ্ঞাসা কর আমি তোমার নিমিত্ত কত কষ্ট ভোগ ও কত ক্লেশ সহ্য করিয়াছি। তোমার বিরহে একদিন যুগসহস্রের ন্যায় বোধ হইয়াছে। প্রসন্ন হও, একবার আমার কথায় উত্তর দাও। আমি লজ্জা, ভয়, কুলে জলাঞ্জলি দিয়া তোমার শরণাপন্ন হইতে আসিয়াছি, তুমি রক্ষা না করিলে আর কে রক্ষা করিবে? একবার নেত্র উন্মীলন করিয়া এই অভাগিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত কর, তাহা হইলে কৃতার্থ হই। আমার আর উপায়ান্তর নাই। আমি তোমার ভক্ত ও তোমার প্রতিই সাতিশয় অনুরক্ত। তোমা বই কাহাকেও জানি না। তুমি দয়া না করিলে আর কে দয়া করিবে? আঃ! এখনও জীবিত আছি! না পিতা মাতার বশবর্ত্তিনী হইলাম, না বন্ধুবর্গের ভয় রাখিলাম, না আত্মীয়গণের অপেক্ষা করিলাম। সমুদায় পরিত্যাগ করিয়া যাঁহার আশ্রয় লইতে আসিয়াছি, সেই প্রাণেশ্বর কোথায়? তিনি কি আমার নিমিত্ত প্রাণত্যাগ করিয়াছেন? অরে কৃতঘ্ন প্রাণ! তুই আর কেন যাতনা দিস্? আ—এই হতভাগিনীর মৃত্যু নাই! যমও এই পাপকারিণীকে স্পর্শ করিতে ঘৃণা করেন। কি জন্য আমি তোমাকে তাদৃশ অনুরক্ত দেখিয়াও গৃহে গমন করিয়াছিলাম? আর গৃহে প্রয়োজন কি? পিতা, মাতা, বন্ধুজন ও পরিজনের ভয় কি? হায়—এক্ষণে কাহার শরণাপন্ন হই। কোথায় যাই। অয়ি বনদেবতে! ভগবতি ভবিতব্যতে! অম্ব বসুন্ধরে! করুণা প্রকাশ করিয়া দয়িতের জীবন প্রদান কর। গ্রহাবিষ্টার ন্যায়, উন্মত্তার ন্যায় এইরূপ কত প্রকার বিলাপ করিয়াছিলাম সকল এক্ষণে স্মরণ হয় না। আমার বিলাপ শ্রবণে অজ্ঞান পশু পক্ষীরাও হাহাকার করিয়াছিল এবং পল্লবপাতচ্ছলে তরুগণেরও অশ্রুপাত হইয়াছিল। এত ক্ষণে পুনর্জীবিত হইয়াছেন মনে করিয়া প্রাণেশ্বরের হৃদয় স্পর্শ করিয়া দেখিলাম, কিন্তু জীবন কোথায়? প্রাণবায়ু একবার প্রয়াণ করিলে আর কি প্রত্যাগত হয়? দৈব প্রতিকূল হইলে আর কি শুভগ্রহ সঞ্চার হয়? আমার আগমন পর্য্যন্ত তুই প্রিয়তমের প্রাণ রক্ষা করিতে পারিস্ নাই বলিয়া একাবলী মালাকে কত তিরস্কার করিলাম। প্রসন্ন হও, প্রাণেশ্বরের প্রাণ দান কর বলিয়া কপিঞ্জলের চরণ ও তরলিকার কণ্ঠ ধারণ পূর্ব্বক দীন নয়নে রোদন করিতে লাগিলাম। সে সময়ে অভূতপূর্ব্ব, অশিক্ষিতপূর্ব্ব, অনুপদিষ্টপূর্ব্ব, যে সকল করুণ বিলাপ মুখ হইতে নির্গত হইয়াছিল তাহা চিন্তা করিলেও আর মনে পড়ে না। সে এক সময়, তখন সাগরের তরঙ্গের ন্যায় দুই চক্ষু দিয়া অনবরত অশ্রুধারা পড়িতে লাগিল ও ক্ষণে ক্ষণে মূর্চ্ছা হইতে লাগিল।
