তিনি অনেক ক্ষণের পর নয়ন উন্মীলন ও দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক, সখে! তুমি আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্ত অবগত হইয়াও অজ্ঞের ন্যায় কি জিজ্ঞাসা করিতেছ! এই মাত্র উত্তর দিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সেইরূপ অবস্থা ও আকার দেখিয়া স্থির করিলাম, এক্ষণে উপদেশ দ্বারা ইঁহার কোন প্রতিকার হওয়া সম্ভব নহে। কিন্তু অসন্মার্গপ্রবৃত্ত সুহৃদ্কে কুপথ হইতে নিবৃত্ত করা সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য কর্ম্ম। যাহা হউক, আর কিছু উপদেশ দিই। এই স্থির করিয়া তাঁহাকে বলিলাম, সখে! হাঁ আমি সকলই অবগত হইয়াছি; কিন্তু ইহাই জিজ্ঞাসা করি, তুমি যে পদবীতে পদার্পণ করিয়াছ উহা কি সাধুসঙ্গত? কি ধর্ম্মশাস্ত্রোপদিষ্ট পথ? কি তপস্যার অঙ্গ? কি স্বর্গ ও অপবর্গ লাভের উপায়? এই বিগর্হিত পথ অবলম্বন করা দূরে থাকুক এরূপ সঙ্কল্পকেও মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়। মূঢ়েরাই অনঙ্গপীড়ায় অধীর হয়। নির্ব্বোধেরাই হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে না। তুমিও কি তাহাদিগের ন্যায় অসৎ পথে প্রবৃত্ত হইয়া সাধুদিগের নিকট উপহাসাস্পদ হইবে? সাধুবিগর্হিত পথ অবলম্বন করিয়া সুখাভিলাষ কি? পরিণামবিরস বিষয়ভোগে যাহারা সুখ প্রাপ্তির আশা করে, ধর্ম্মবুদ্ধিতে বিষলতাবনে তাহাদিগের জলসেক করা হয়, তাহারা কুবলয়মালা বলিয়া অসিলতা গলে দেয়, মহারত্ন বলিয়া জ্বলন্ত অঙ্গার স্পর্শ করে, মৃণাল বলিয়া মত্ত হস্তীর দন্ত উৎপাটন করিতে যায়, রজ্জু বলিয়া কালসর্প ধরে। দিবাকরের ন্যায় জ্যোতি ধারণ করিয়াও খদ্যোতের ন্যায় আপনাকে দেখাইতেছ কেন? সাগরের ন্যায় গম্ভীরস্বভাব হইয়াও উন্মার্গপ্রস্থিত ও উদ্বেল ইন্দ্রিয়স্রোতের সংযম করিতেছ না কেন? এক্ষণে আমার কথা রাখ, ক্ষুভিতচিত্তকে সংযত কর, ধৈর্য্য ও গাম্ভীর্য্য অবলম্বন করিয়া চিত্তবিকার দূর করিয়া দেও।
এইরূপ উপদেশ দিতেছি এমন সময়ে ধারাবাহী অশ্রুবারি তাঁহার নেত্রযুগল হইতে গলিত হইল। আমার হস্ত ধারণ পূর্ব্বক বলিলেন, সখে! অধিক কি বলিব, আশীবিষবিষের ন্যায় বিষম কুসুমশরের শরসন্ধানে পতিত হও নাই, সুখে উপদেশ দিতেছ! যাহার ইন্দ্রিয় আছে, মন আছে, দেখিতে পায়, শুনিতে পায়, হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে, সেই উপদেশের পাত্র। আমার তাহা কিছুই নাই। আমার নিকটে ধৈর্য্য, গাম্ভীর্য্য, বিবেচনা এ সকল কথাও অস্তগত হইয়াছে। এ সময় উপদেশের সময় নয়; যাবৎ জীবিত থাকি এই অচিকিৎসনীয় রোগের প্রতীকারের চেষ্টা পাও। আমার অঙ্গ দগ্ধ ও হৃদয় জর্জ্জরিত হইতেছে। এক্ষণে যাহা কর্ত্তব্য কর, এই বলিয়া নিস্তব্ধ হইলেন।
যখন উপদেশবাক্যের কোন ফল দর্শিল না এবং দেখিলাম তাঁহার হৃদয়ে অনুরাগ এরূপ দৃঢ় রূপে বদ্ধমূল হইয়াছে যে, তাহা উন্মূলিত করা নিতান্ত অসাধ্য, তখন প্রাণরক্ষার নিমিত্ত সরোবরের সরস মৃণাল, শীতল কমলিনীদল ও স্নিগ্ধ শৈবাল তুলিয়া শয্যা করিয়া দিলাম এবং তথায় শয়ন করাইয়া কদলীপত্র দ্বারা বীজন করিতে লাগিলাম। তৎকালে মনে হইল, দুরাত্মা দগ্ধ মদনের কিছুই অসাধ্য নাই। কোথায় বা বনবাসী তপস্বী, কোথায় বা বিলাসরাশি গন্ধর্ব্বকুমারী। ইহাদিগের মনে পরস্পর অনুরাগ সঞ্চার হইবে ইহা স্বপ্নের অগোচর। শুষ্ক তরু মঞ্জরিত হইবে এবং মাধবীলতা তাহাকে অবলম্বন করিয়া উঠিবে ইহা কাহার মনে বিশ্বাস ছিল? চেতনের কথা কি, অচেতন তরু লতা প্রভৃতিও উহার আজ্ঞার অধীন। দেবতারাও উহার শাসন উল্লঙ্ঘন করিতে পারেন না। কি আশ্চর্য্য! দুরাত্মা এই অগাধ গাম্ভীর্য্যসাগরকেও ক্ষণ কালের মধ্যে তৃণের ন্যায় অসার ও অপদার্থ করিয়া ফেলিল। এক্ষণে কি করি, কোন্ দিকে যাই, কি উপায়ে বান্ধবের প্রাণরক্ষা হয়। দেখিতেছি মহাশ্বেতা ভিন্ন আর কোন উপায় নাই। বন্ধু স্বভাবতঃ ধীর, প্রগল্ভতা অবলম্বন করিয়া আপনি কদাচ তাহার নিকট যাইতে পারিবেন না। শাস্ত্রকারেরা গর্হিত অকার্য্য দ্বারা সুহৃদের প্রাণরক্ষা কর্ত্তব্য বলিয়া থাকেন; সুতরাং অতি লজ্জাকর ও মানহানির কর্ম্মও আমার কর্ত্তব্যপক্ষে পরিগণিত হইল। ভাবিলাম, যদি বন্ধুকে বলি যে, তোমার মনোরথ সফল করিবার জন্য মহাশ্বেতার নিকট চলিলাম, তাহা হইলে, পাছে লজ্জাক্রমে বারণ করেন এই নিমিত্ত তাঁহাকে কিছু না বলিয়া ছলক্রমে তোমার নিকট আসিয়াছি। এই সময়ের সমুচিত, সেইরূপ অনুরাগের সমুচিত ও আমার আগমনের সমুচিত যাহা হয় কর, বলিয়া কি উত্তর দি শুনিবার আশয়ে আমার মুখ পানে চাহিয়া রহিলেন।
আমি তাঁহার সেই কথা শুনিয়া সুখময় হ্রদে, অমৃতময় সরোবরে নিমগ্ন হইলাম। লজ্জা ও হর্ষ একদা আমার মুখমণ্ডলে আপন আপন ভাব প্রকাশ করিতে লাগিল। ভাবিলাম, অনঙ্গ সৌভাগ্যক্রমে আমার ন্যায় তাঁহাকেও সন্তাপ দিতেছে। শান্তস্বভাব তপস্বী কপিঞ্জল স্বপ্নেও মিথ্যা কহেন না; ইনি সত্যই কহিতেছেন, সন্দেহ নাই। এক্ষণে আমার কি কর্ত্তব্য ও কি বক্তব্য এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময়ে প্রতিহারী আসিয়া কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! তোমার শরীর অসুস্থ হইয়াছে শুনিয়া মহাদেবী দেখিতে আসিতেছেন। কপিঞ্জল এই কথা শুনিয়া সত্বরে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক কহিলেন, রাজপুত্ত্রি! ভগবান্ ভুবনত্রয়চূড়ামণি দিনমণি অস্তগমনের উপক্রম করিতেছেন। আর আমি অপেক্ষা করিতে পারি না; যাহা কর্ত্তব্য করিও, বলিয়া আমার উত্তরবাক্য না শুনিয়াই শীঘ্র প্রস্থান করিলেন। তিনি প্রস্থান করিলে, এরূপ অন্যমনস্ক হইয়াছিলাম যে, জননী আসিয়া কি বলিলেন, কি করিলেন, কিছুই জানিতে পারি নাই। কেবল এইমাত্র স্মরণ হয়, তিনি অনেকক্ষণ আমার নিকটে ছিলেন।
