হু কোথায় যেতে হবে। গাড়িতে চড়তে চড়তে মহীন প্রশ্ন করলো।
এ প্রশ্ন আর করো না মহীনদা যাবার পথ এক হলে ওকথা শুধাবার অধিকার থাকে।
মহেন্দ্র নিঃশব্দে বসে রইল কোন কথা বললো না। গাড়িটা গড়ের মাঠের দিকে নিয়ে যেতে বললো–কারো মুখে কোন কথা নাই! অবশেষে মাধুরীই বললো, তুমি হয়তো ভাবছো, আমি তোমার মেসে যাচ্ছিলাম। না আমি কোথাও যাচ্ছিলাম না।
আকস্মিক দেখা হয়ে গেল তোমার সঙ্গে। অবশ্য অনুপ সিংতো ওখানেই নিয়ে যেত গাড়ি।
মহেন্দ্র এখনও কোন জবাব দিল না। মাধুরী নিউ মার্কেটের সামনে গাড়ি থামালো। তারপর নেমে মহীনকে বললো, নামবে একবার।
হ্যাঁ চল। নামলো মহেন্দ্রও।
সারি সারি ফুলের দোকানগুলোতে অজস্র ফুল সাজানো রয়েছে। মাধুরী তাকাল না সটান চলেছে, কিন্তু মহেন্দ্র দেখছে শোকেস ভর্তি ফুল। বললো আস্তে, ফুল নেবে মাধুরী?
না, ওকি হবে? তোমার কাছেই গল্প শুনেছি, এক রাজকুমার এক দেশে বেড়াতে গিয়ে দেখল, সেখানকার নরনারী, পশু পক্ষী প্রজাপতি অতি সুন্দর, কিন্তু কার অভিশাপে প্রাণহীন পাথর হয়ে আছে, ওগুলো সেই পাথর, মাটির স্নেহ ওরা পায় না মহীনদা।
না, কিন্তু মানুষের স্নেহ–
না মহীনদা স্নেহ ওরা পায় না, ওরা মানুষের কামনার ইন্ধন, ওদের দিয়ে বিলাসকুঞ্জ সাজান যায়, বাইজীর গলায় মালা দেওয়া যায়, আর কিছু নয়।
মহেন্দ্র যেন গুছিয়ে বলতে পারছে না। কেমন হতভম্ব হয়ে আছে অথচ কথা তার আয়ত্তে কিন্তু মাধুরীকে কি আবার আঘাত করবে মহেন্দ্র? না, আঘাত না করে বললো
বিয়ের বাসরও সাজানো যায় মাধুরী।
সে বিয়ে বাইরের বিয়ে মহীনদা রেজিষ্টারী করা কন্ট্রাক্ট, অন্তরের বিয়েতে লাগে হলদে সুতোয় বাঁধা দুর্বাঘাস, আর কুন্দ, না হয়ে আকন্দ ফুলের মালা, ডালিয়া ভায়েস্থাস, কসমস ক্রিস্থিমাসের সেখান ঠাই নেই। এসো।
মাধুরীরের চোখে চকচক করছে জল কিন্তু মহেন্দ্ৰ যেন লক্ষ্য করে নাই এমনিভাবে বললো, ওদিকে কোথায় যাবে?
আবার কেন এ প্রশ্ন মহীনদা? কোন বন্দীশালায় তোমার নিয়ে যাচ্ছিনে নিরাপদে মেসে পৌঁছে দেব, এসো। এগুলো মাধুরী। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছলো একবার মহেন্দ্র পিছনেই আছে। সটান চললো মাধুরী সাজান দোকানের মাঝ পথ দিয়ে। একটা ফটোর দোকান, মাধুরী ঢুকে বললো দোকানদারকে–
এর ছবি তুলতে হবে একটু তাড়াতাড়ি হবে কি?
হ্যাঁ এক্ষুনি। বলে দোকানদার আয়োজন করছে। মহেন্দ্র বিস্মিত হয়ে বললো
আমার ফটো তুলবে কেন মাধুরী? আমি তো মোটেই তৈরি নই।
তুমি যেমন আছ অমনটিই তুলব, ক্লান্ত, অভুক্ত অসুন্দর।
হঠাৎ যেমন আমি এসেছিলাম তোমার কাছে?
হ্যাঁ, অর্থাৎ তুমি যেখানে সত্যি তুমি।
মহেন্দ্রকে বসিয়ে দিল মাধুরী একটা টুলে। ফটো তোলা হলে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল দোকানে ওকে খাওয়ালো, তারপর গোলদীঘির পাড়ে নামিয়ে দিয়ে বললো তুমি যে এসেছিলে, এ ফটোটা তার সাক্ষী রইল।
সাক্ষী নাইবা থাকতো মাধুরী।
স্বাক্ষরটা মুছে ফেলা যাচ্ছে না মহীনদা, তোমার হাতের কালিটা দ্রাক্ষার জীবন রক্ত, হাজার বছর ওর দাগ থাকে। গাড়ি চলে গেল মাধুরীকে নিয়ে।
মহেন্দ্র নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কতক্ষণ কে জানে?
সত্যি মোছা যাবে না দ্রাক্ষার কালি। পাঁচশো বছরের পুরোনো পুঁথি আছে মহেন্দ্রর বাড়িতে ঐ দ্রাক্ষার কালি দিয়ে লেখা আজও সে অক্ষর যেমন উজ্জ্বল একথা সেই একদিন মাধুরীকে বলেছিল। কিন্তু কালি মুছে না গেলেও পুঁথি পুরানো হয়ে যায়, অপাঠ্য না হোক দুপ্রাপ্য হয়ে ওঠে, তখন তাকে কুলঙ্গীর এক কোনায় ফেলে রাখা হয়। ঊই ইঁদুর তার ধ্বংস সাধন করে কেউ দেখে না কেউ দেখতে চায় না, মহেন্দ্র উঠে এলো ওর মেসের ঘরে বুকের ভেতরটা কেমন করছে কেমন অসস্তি–কেমন অব্যক্ত যন্ত্রণা। কিন্তু কিছুই করবার নেই। মাধুরীর অন্তরে মহেন্দ্রের স্বাক্ষর যতই উজ্জ্বল হয়ে হয়ে থাক, পুরানো পুঁথির মত তাকে অপাঠ্য হয়ে যেতে হবে, কিন্তু মহেন্দ্রের অন্তরে মাধুরীর স্বাক্ষর নয় ক্ষোদিত শিলামূর্তি যার মৃত্যু নাই, অমরত্বের অনির্বান অগ্নিতে সে দগ্ধ হচ্ছে। বুকখানা দু’হাতে চেপে মহেন্দ্র শুলো বিছানায়, সর্বাঙ্গে ওর আগুন, এই অগ্নিতে নির্বাপিত করবার শীতল সলীল সম্মুখে কিন্তু সেখানে যাবার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ তার কাছে কেন? বহুবার ভাবা ভাবনাটা আবার ভাবতে লাগলো মহেন্দ্র। মাধুরীর অবাল্য পরিচিত সমাজ সংস্কার শিক্ষা, তার স্বাধীন চিত্তের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ বেদনার অভিব্যক্তি তার অসামন্যতা রাজপ্রসাদে করার যোগ্য, মহেন্দ্র। কেমন করে তাকে দারিদ্রের পঙ্ককুন্ডে নামিয়ে আনবে? মাধুরীর তরুন মনের উচ্ছাস আজ হয়তো উদ্বেল আকুল বর্ষাস্রোতে, বর্ষাস্রোত দুকূল প্লাবিত করে, সে হয়তো চন্ডীপুরের জীর্ণ কুটিরে গিয়ে ঢুকতে চায় কিন্তু শীতের শুকনো দিনে জীবন হয়ে যাবে শীর্ণ, বিবর্ণ, বিকৃত, ব্যাধিগ্রস্ত। হয়তো মাধুরীর মা বাবা ভাই বৌদি তাকে ঘর বাড়ি টাকা কড়ি দিয়ে কলকাতায় বিশাল নিকেতনেই রাখতে চাইবে, কিন্তু মহেন্দ্র তার অন্ধ দাদা আর একমাত্র ভ্রাতুস্পুত্র কে পরিত্যাগ করে স্বর্গেও যেতে সম্মত নয়। আর সে কথা একান্তই অবাস্তব, কারণ তার বংশ। গৌরবের পরিপন্থী! কিন্তু এ সব কোন কারণই নয়, কোন বাধাই নয় মাধুরীকে লাভ করার। পক্ষে। তার প্রেম যদি সত্য হয়, সব বাধাই অতিক্রম করতে পারা যায়। কিন্তু না, নিয়তির। নিষ্ঠুর বাধাটাকে অতিক্রম করতে পারে না মানুষ নিরুপায় অসহায় মহেন্দ্রও চিন্তা বন্ধ করে ভাবলো, মাধুরীর মনে যদি স্বাক্ষর সে দিয়েই থাকে নিজের অজ্ঞাতসারে, তবে সে স্বাক্ষর যতই স্থায়ী কালিতে লেখা হোক, পুরানো অপাঠ্য হয়ে যাবার সুযোগ দিতেই হবে। মহেন্দ্রের অন্তরে শিলা মূর্তি অক্ষয় মহেন্দ্র তাকে জীবনের পর জীবন বহন করবে, কিন্তু মাধুরীর অন্তর। আকাশের মত নির্মল হয়ে উঠুক মেঘ সরে যাক সেখানে দেখা দিক পূর্ণ চন্দ্রের উজ্জ্বলতা পূর্ণ। চন্দের অমিয় ধারা।
