মহেন্দ্র ঘরের টালিগুলোর দিকে চেয়ে ছিল, অন্ধকার ঘর কিন্তু আকাশের জ্যোত্সা টালির ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে ছোট বিন্দুর মত, দু’তিনটে ফাঁকে এমনি ঘরে নিবিড় অন্ধকার, অথচ বাইরে জ্যোৎস্নার প্লাবন ছুটছে। মহেন্দ্রের অন্তরটাও যেন তাই। ভেতরে অশ্রু সাগর, বাইরে আনন্দের তুফান। মহেন্দ্র চেয়েই রইল টালির একটা ফটোর পানে দূর।
অন্ধকূপ থেকে দেখছে যেন অসীম আলোর সমুদ্রকে। ও আলো ছোঁয়া যায় না। ও আলোতে সঞ্চারণ করবার জন্য যে চাঁদের সৃষ্টি, সেই ওখানে বিরাজ করুক, মহেন্দ্র নিঃশব্দে সরে যাবে আরো গভীর অন্ধকারে।
৭. পরদিন রবিবার, অফিস নাই
পরদিন রবিবার, অফিস নাই। মুখ হাত ধুয়ে মহেন্দ্র চা খেলো, দাড়ি কামালো, তারপর পরিস্কার জামা কাপড় পরে গেল ওদের অফিসার ইনচার্জের বাড়ি। মহেন্দ্র অল্পদিন চাকরি নিলেও কর্মদক্ষতায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অফিসার বাড়িতে ওকে সস্নেহে আহ্বান করে প্রশ্ন করলেন, কি খবর মহীন? মাদ্রাজ অফিসের জন্য আমাদের কাকে পাঠাবেন ভাবছিলেন? অফিসে আমাকে যদি পাঠান তো আমিও যেতে প্রস্তুত আছি।
তুমি যেতে চাও? বেশ, কিন্তু অনেক দূর আর মাইনেতো বেশি বাড়াতে পারবো না, শুধু এই টাকার মধ্যে চলতে পারবে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আর আজকালকার যুগে দূরত্ব বলে কিছুই নেই। আমি যেতে চাইছি, দেশ দেখা আর একটা চেঞ্জও হবে।
আচ্ছা, যাও আমি তোমার মত বিশ্বাসী একজন ইয়ংম্যান খুঁজছিলাম। তাহলে কালই অর্ডার করে দেব, তুমি মাদ্রাজ মেলে রওয়ানা হয়ে যাবে কেমন?
একেবারে মাদ্রাজ, কতদূর কে জানে? কিন্তু উত্তর মেরুতে যেতেও আজ সে প্রস্তুত। মাধুরীকে তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এর জন্যে কিনা করতে পারে। মহেন্দ্র আর দেরী করতে পারে না।
বাসায় এসে সব গুছিয়ে ফেললো, ভাঁজ করে ইজিচেয়ার শেকল প্যাক করে পাঠিয়ে দিল বাড়ির ঠিকানায়, সুটকেস আর বিছানা বালিশ মাত্র সঙ্গে নেবে কয়েক খানা বইও, ব্যাস।
কিন্তু নিজের উপর কেমন রুদ্ধ হয়ে উঠেছে মহেন্দ্র। এতটা বেলা হলো রবিবার মহেন্দ্র যখন খেতে এলো ভাত তখন শুকনো হয়ে গেছে। যাক, একদিন না খেলেও চলবে। কোকো, ওভালটিন মাল্টা বিস্তর রয়েছে মহেন্দ্ৰ সন্ধ্যাবেলা সব বাবুদের ডেকে খাইয়ে দিল যা ছিল। কিন্তু কাউকে বললো না সে কোথায় যাচ্ছে, শুধু বললো দিন কয়েকের জন্য বাইরে যাচ্ছি।
গভীর রাত, মাধুরীর দেওয়া সেতারটায় ঝঙ্কার তুলে মহেন্দ্র। সুপ্ত কলকাতার বুকের উপর এক অশরীরী যেন প্রিয়াদের স্কন্ধে নৃত্য করে চলেছেন, মৃত্যুর অমৃতময় পথে, গর, লর গরীয়ান ভূমিতে ত্যাগের অগ্নিময় তপস্যায়, সাধনা নির্বিকল্প সমাধিতে।
সকালের উদয়সূর্য ওকে দেখলো, বুকের রক্ত চোখের পাতায় চিকচিক করছে, কিন্তু গ্রীষ্মকালে বাবুদের কেউ কেউ ছাদে শুয়ে থাকবেন। তারা দেখবার পূর্বেই মহেন্দ্ৰ হাতমুখ ধুয়ে ফিটফাট হয়ে নিল। সারারাত ও ঘুমায়নি ঘুমাবে না আর কোন রাত। ওর রাতের ঘুম রইল এই কলকাতার দিনের জাগরণে সম্বল করে ও চলে যাবে দূর দক্ষিণ সমুদ্রের উপকূলে, কূলহারা এক জীর্ণ তরণী ডুবে যাবে।
মেসের বাবুদের চিঠি একটা কাঠের বাক্সে পিওন দিয়ে যা, মহেন্দ্র নামবার সময় দেখলো ওর নামে একখানা কার্ড রয়েছে, বাড়ির চিঠি বৌদি লিখেছে। পড়ে একটা ম্লান হাসলো মহেন্দ্র, চিঠিখানা আবার বাক্সে ফেলে দিয়ে গেল।
মাদ্রাজ মেল, উঠে পড়ল মহেন্দ্র। কোণার একদিকে নিঃশব্দে বসল গিয়ে বাক্স বিছানা সেতার সমেত, চোখ বুঝলো, লক্ষ স্মৃতিঘেরা কলকাতা ওর কাছে বিলুপ্ত হয়ে যাক, মুছে যাক, মুছে যাক কর্মের মন্দির থেকে।
সেদিন বাড়ি ফিরে মাধুরী কারো সঙ্গে কথা বলেনি, নিজের ঘরে শুয়েছিল গিয়ে কি পরদিন স্নান সেরে মার পূজার ঘরে গিয়ে নানা কাজ করলো, দুপুরে নিজের ঘরটা গোছালো। বিকালে প্রসাধন শেষ করে মেজদার খেলায় যোগদিল। ছোড়দিকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। মেজবৌদি বললো হেসে।
কোন দিন কম সুন্দর দেখায়, প্রশ্ন করলো মাধুরী।
না, কম না, আজ যেন বেশ উজ্জ্বল তাহলে আর দেরী নাই, দীপ নিভার আগে জ্বলে উঠে।
ছিঃ মাধুরী, ওসব কি কথা। মেজদা ধমক দিল ওকে। কুমার ছিল আর বরুণ। মাধুরী একটুখানি চুপ থেকে হেসে বললো
খারাপ নয় মেজদা, বেশি জ্বললে প্রদীপের বুক জলে যায়, তার চেয়ে নিভে যাওয়া ভালো।
কেন এসব কথা বলছিস বোনটি, কি হলো? মেজদা ওর বেণীটা সস্নেহে আকর্ষণ করলো হাতে নিয়ে শেষে ফুলগুচ্ছটা দেখছে। মাধুরী বললো
নিভে আমি যাবো না মেজদা, আমি প্রদীপ নই, হাসছে মাধুরী অম্লান হাসি। আমি হলুম সাপের মাথার মনি গল্পে আর গরলে আমার বাসা।
গল্পে থাকতে চান থাকুন কিন্তু গরল কেন? বরুণ বললো চা খেতে খেতে।
গরলে না হলে গল্প হয় না। সমুদ্র মন্থনে আগে গরল উঠেছিল, তবে পুরানের গল্প জমলো। চলুন খেলা যাক, আমি আর মেজদা, ভাই বোন একদিকে।
অতঃপর খেলা আরম্ভ হলো। মাধুরী ভালো খেললো। হাসি মুখেই খেলছে কিন্তু কেমন যেন আনমনা। কুমার দেখে বললো।
আপনি বড্ড অন্যমনস্ক রয়েছেন–
আচ্ছা, মেজবৌ খেলুক এবার বলে চলে গেল মাধুরী বাবার কাছে। উমেশবাবু বসেছিলেন এক জায়গায়। মাধুরী এসে দাঁড়ালো।
বাবা দমদমার বাগানটার আমি কিছু করবো বলেছিলাম মনে আছে?
