ভোরের দিকে কখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত হয়েছিল, সর্বাঙ্গ ছিজে গেছে মহেন্দ্রের। চোখের জলটা বৃষ্টির জলে এক হয়ে গেছে। না এ জল কি শুধু জল? মহেন্দ্রের হৃদয় শোণিত অশ্রু হয়ে নেমেছে দুটি গণ্ডে, তার রক্তাভা এখনো লেগে রয়েছে। তাড়াতাড়ি মুখ ধুতে গেলে মহেন্দ্র ট্যাঙ্কের জলে। তারপর চা তৈরি করতে লাগলো।
আজ রবিবার অফিস ছুটি, করবে কি মহেন্দ্র সারা দিনটা? কোথায় যাবে? যাবে না কোথাও, ঘরেই বসে থাকবে, কিন্তু মাধুরী যদি আসে? না মহেন্দ্র ঘরে থাকবে না। চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লো জামা গায়ে দিয়ে।
নতুন বাস লাইন খুলেছে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত। চড়ে বসলো মহেন্দ্র। পৌঁছালো এসে দক্ষিণেশ্বরে। পরম পুরুষ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের সাধনপীট। পঞ্চবটি এলে নতজানু হয়ে প্রণাম করলো মহেন্দ্র শাক্তি দাও হে গুরু শুনেছি বিবাহিতা পত্নীকে তুমি পূজা করেছিলে দেবী রূপে বিলাসের সঙ্গিনী করনি সে কাহিনী আজ বিশ্বের বিস্ময়, হে লোকোত্তর মহাজীবন, এই বৃক্ষ বটবৃক্ষ তলের প্রতি ধুলিকণায় তোমার সেই মহা তপস্যা চির জাগ্রত সেই শক্তির কিঞ্চিত আমার দান কর প্রভু। আমি যেন সইতে পারি, বইতে পারি এই দুঃসহ দুঃখের বহ্নি জ্বালা।
সারাদিন ঘুরে বেড়ালো মহেন্দ্র। গঙ্গায় কূলে কূলে নৌকায় চড়ে বেলুড় গেল। সেখান থেকে গেল আরো দূরে। কিন্তু সন্ধ্যানাগাদ ওর খেয়াল হোল সমস্ত দিন কিছু খাওয়া হয়নি। শরীর দুর্বল বোধ হচ্ছে। কাছাকাছি কোথাও খাবার পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে গিয়ে ও এসে পড়লো বলীখান নামক একটা জায়গায়? সেখান থেকে বাসে চড়ে ফিরলো। এসে ও প্রশ্ন করলো, দিদিমণি আসেনি রাম? আজ্ঞে না।
আচ্ছা যা দোকান থেকে কিছু খাবার নিয়ে আয়।
আপনার ভাত ঢাকা আছে বাবু—
ও থাক কাউকে দিয়ে দিস।
মহেন্দ্র উপরে উঠে এল, নিজের ঘরে। মাধুরী আসেনি, হয়তো আর আসবেন না। আনন্দ হচ্ছে ওর! হ্যাঁ আনন্দই তো। একে বলে আত্মঘাতী আনন্দ বিলাস–আত্মনাশা সমাধি যোগ।
ভর দুপুরবেলা আষাঢ় মাসের লম্বা দিন। মাধুরী আনমনা হয়ে ঘুরছিল? হোস্টেল ছেড়ে না এলেই ভাল হতো। ওখানে অনেক সঙ্গী ছিল–কথা কয়ে লুডু খেলে বা গান গেয়ে সময়। কাটানো যেতো, বাড়িতে তার বড্ড অভাব।
নিরুপায় হয়ে মাধুরী বাড়ির পশ্চিমদিকের সেই জানালায় গেল। দেখলো, জানালার কাছে মাদুর পেতে ঘুমুচ্ছে। ওর মেয়েটি ঘরে খেলা করছে নিজের মনে। জানালায় রয়েছে। একটা কুঁজোতে জল। অকস্মাৎ মেয়েটি মাধুরীকে দেখে জানালায় আনন্দে হাসছে কিন্তু তার কচি পা লেগে কুঁজোটা গেল উল্টে, পড়লো ওর ঘুমন্ত মার গায়ে, ছলছল কলকল জল সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বৌ উঠেই ব্যাপার দেখলো মেয়েটাকে ধরে দুই কিল তার পিঠে বসিয়ে দিল।
অ্যাঁকান্না জুড়ে দিল মেয়ে।
মাধুরী হাসি চাপতে পারছে না। বললো
মারলে কেন? কেন মারলে ওকে? নিজে অসাবধান আর ওকে পিটুনি। তাকিয়ে লজ্জায় হেসে ফেলল বৌটি। মেয়েটি কোলে নিয়ে বললো দেখ না ভাই সব ভিজিয়ে দিল–চুপ। চুপ বাপি আসছে–
বেশ করলো জলের কুজো রাখবার কি জায়গা ছিল না?
যেখানে রাখবো ও যাবে–ভয়ানক দামাল। ছাড় এখন ঝাট দিয়ে ঘর পরিস্কার করতে আরম্ভ করলো। মাধুরী দেখলো সীমাহীন আনন্দ অনুভূতিতে অন্তর ওর পূর্ণ হয়ে উঠেছে। কত দুঃখ তবু কত আনন্দ এই ছোট বধুটির বুকে? কি এক অপার্থিত প্রেম ওকে ঘিরে রেখেছে স্বামীর প্রতি সংসারের প্রতি। এ প্রেম আত্মকেন্দ্রিক কিন্তু আত্মাকে বাদ দিয়ে তো। বিশ্ব নয়। আমি আছি তাই বিশ্বে প্রেম রয়েছে প্রকাশ আমাকে ঘিরেই সব! কিন্তু এ সব দর্শনের কথা। মাধুরী হাসলো আপন মনে দার্শনিক হবার মতলব নেই ওর। কি তাহলে হবে। ও? কিছু না মাধুরী একটা না ফোঁটা কুড়িতেই যাকে পোকায় খেয়েছে–
আজ কলেজ নেই তোমার। বধুটি প্রশ্ন করলো।
না ছুটি আছে। আজ তো শনিবার।
তোমার উনি এখনো আসে নি?
কৈ আড়াইটে বেজেছে নাকি।
প্রায় বাজে।
তাহলে এক্ষুণি এসে পড়বে। আজ আবার সিনেমা দেখতে যাবে বলেছে। কে জানে কখন যাবে। হয়ত সন্ধ্যার শোতে।
তুমি যাবে তো?
হা–একা যায় না তো। সিনেমা দেখার পয়সা তো কম তবু যখন যাই দু’জনেই যাই, আমি বেশি যেতে চাই না ভাই। অভাবের সংসার ও কিন্তু বড় বেশি জেদ করে, বলে পৃথিবীতে বাঁচতে খাদ্যের মতন এও দরকার।
হাসলো মাধুরী মুখে কিছু বললো না, হয়তো বলতো কিন্তু ওর স্বামী এসে পড়লো। মাধুরী সরে এলো ওখান থেকে। ওই বধুটিকে দেখে হিংসা হচ্ছে মাধুরীর কত মান অভিমান আদর আবদার কত অভাব অনটনের মধ্যে আনন্দের অমৃতকুঞ্জ একে বলে নীড়। তুচ্ছ এক ফ্লাট বাড়ির ছোট এক কুঠুরীতে একজোড়া কবুতর আর তাদের একটা বাচ্ছা অন্ন নাই, আলো নাই, আয়ু ও হয়ত বেশি নাই, নাইবা থাকলে যতক্ষণ ওরা আছে ফুলের মত ফুঠে আছে। ফুলের আয়ু কম বলে তার ফোঁটার গৌরব কম হবে?
মাধুরী আপন ঘরে গিয়ে ভাবছে। চুল বাধলো গা ধুলো কাপড় বদলালো এবার কোথাও এবার কোথাও বেরুতে হয় কিম্বা মেজদার খেলায় যোগ দিতে হয়; অথবা না? যাবে না মাধুরী আর মহীনের বাসায়। কিন্তু অনুপ সিং এসে জানাল গাড়ি আনা হয়েছে। মাধুরী এসে। উঠলো গাড়িতে।
উঠলো মাধুরী অনুপ সিং গাড়ি চালিয়ে দিল। কোথায় যাচ্ছে কোন প্রশ্ন করলো না নির্দেশও দিল না মাধুরী। যেখানে যায় যাক খানিকটা বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সিংজী সেন্ট্রাল এভিন্যর সোজা রাস্তা ধরে সটান এসে কুলুটোলায় মোড় ঘোরালো। তারপর গোলদীঘির কোনায় আসতেই দেখতে পেল ট্রাম থেকে মহীন নামছে। মাধুরীও দেখলো, বললো এসে উঠে পড় বাসায় আজ নাইবা গেলে।
