অকস্মাৎ আলো জ্বলে উঠলো, শেষ হলো ছবি, মাধুরী ত্বরিত আঁচল দিয়ে চোখ ঢাকলো? কিন্তু তবু দেখতে পেয়েছে মহেন্দ্র ওর চোখে জল। স্নেহের সুকোমল স্বরে বললো।
মানুষ বড় অসহায় মাধুরী তার জীবনে মধু থেকে জল বেশী, তার বিষ মধুর মধুকেই শুধু নষ্ট করে না মৌচাকেও শত ছিদ্র করে দেয়।
মধুটা তা বলে ফেলনা নয়।
না, কিন্তু তাকে ধরবার শক্তি মৌচাকের থাকা দরকার নইলে গড়িয়ে যাবে।
গোপাল মল্লিক লেন পর্যন্ত আর কোন কথা হয়নি। কিন্তু মহীন নামবার পর মাধুরী বলেছিল, তোমার মধু গড়িয়ে যাবে না, জমে মোমের পুতুল হয়ে থাকবে।
গাড়ী চলে গেল, কিন্তু মহীন দেখছে, গাড়ীর ভিতরে ঐ মানুষ পুতুলটার চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে। কিছু বললো না মহীন নিঃশব্দে ঘরে এসে দাঁড়াল।
চোখের জল যার পড়ে তার ভাগ্য ভালো, মহীনের চোখ দুটা জ্বালা করছে, সইতে পারছে না কিন্তু চোখ বুজেও ঐ রকম অবস্থা। আকাশের তারা যে স্নেহ সজল দুটি চোখ, বাতাসের শিহরে শিহরে যেন সেই উত্তপ্ত নিঃশ্বাস, জ্যোৎস্নার ধারায় যেন সেই ব্যথা করুণ, সমর্পণ, না মহীন ঘরে টিকতে পারবে না। কোথায় যাবে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবে মহীন।
আঘাত, নিষ্ঠুর আঘাত করেছে সে মাধুরীকে, অতখানা না করলেও কি হোত না? আরো হয়ত করতে যাবে আঘাত, রক্তাক্ত করে দিতে হবে ওর অন্তর, আর সেই সঙ্গে মহীনেরও সর্বাঙ্গ রক্তাপ্লুত হয়ে যাবে। কিন্তু যে আঘাত আজ হয়েছে, তাই কি যথেষ্ট নয় তার। মাধুরীর শেষের ওই কথাগুলো। মোমের পুতুল হয়ে থাকবে সে। কেন সে বললো এক
যতখানি মাধুরী আজ এসেছিল, কোন মেয়ে এতটা আসে না, কিন্তু মহীনের প্রত্যাখান কি ফিরে তাকে নিয়ে যাবে না তার আপন স্বর্ণ সিংহাসনে? ফিরে যাক মাধুরী, আপন আসনে ফিরে যাক।
মহীন কি কোনদিন মাধুরীর অন্তর জয় করবার চেষ্টা করেছে। কৈ মনে তো পড়ে না, কিন্তু এতদিনের কত কথা কাকলী কে জানে দুর্বল মুহূর্তে কি বলে ফেলেছে মহেন্দ্র। হ্যাঁ একদিন বলেছিল মহীনকে খাওয়াবার অধিকার মাধুরীর আছে, উত্তরে মহীন বলেছিল তা আছে, কিন্তু খাওয়াবার অধিকার প্রতি নারীর আছে, এ অধিকার এদের বক্ষ পীযুষের স্বাক্ষর। হ্যাঁ আর একদিন মাধুরী বলেছিল, নিজেরটাই দাবী করে আনন্দ। মহীন বিশেষ কিছু বলে নাই উত্তরে। কেন বলে নাই? বললেই হোত যে যোগ্যপাত্রে দান করতে হয়। অনেক ভুল করেছে মহেন্দ্র, অনেক অন্যায় অকর্তব্য হয়ে গেছে তার। আরো সোনায় বাধানো নোয়া নিয়ে করা মাধুরী, প্রমাণ করেছিল ওকে ওই প্রণামটা ওর আত্মসমর্পণের প্রণাম নাকি। আরো কত কথা কি ঘটনা অঘটন সংঘাত। কে জানে মহীন তাকে আকর্ষণ করছে। সজ্ঞানে যেটা করতে চায়নি, অজ্ঞাত মন সেটা করিয়ে নিয়েছে ওকে দিয়ে।
একি হোল? এটা তো মহীন কোনদিন চায়নি, মাধুরীর প্রতি তার প্রেম সে নিজেই করতে চায়নি, এতই গোপন করে রেখেছিল যে তার স্বপ্নও তাকে সজাগ করতে পারেনি এ সম্বন্ধে, অথচ বাইরে সেটা প্রকাশ হয়ে গেছে আশ্চৰ্য্য
কিন্তু ভেবে লাভ নেই। ওকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিতে হবে। হবেই, এর জন্যে মহীনের যা কিছু ক্ষতি হয় হোক, যতখানা যাবার যাক, মাধুরীকে সে কোন রকম কেরাণী বন্ধুত্বের গহ্বরে নামাতে পারবেনা শুধু তাই নয় দারিদ্রের কঠোর আঘাত নয়, অশিক্ষার আর অন্ধ সংস্কারের কারাগারে অনভ্যস্ততার কন্টকাকীর্ণ পথ আর অপচয়ের অবজ্ঞা সহ্য করে মাধুরী দুদিনও টিকতে পারবে না ওখানে। বড় বৌদি বলেছেন যোগ্যতার কথা তারা ভাববেন। কিন্তু তারা ভাবলেই মহেন্দ্র যোগ্য হয়ে যাবেনা–যাওয়া সম্ভব নয়। অনেক কারণে নয়। অন্ধ দাদা অসহায় বৌদি আর আদরের খোকনকে ছেড়ে মহেন্দ্র মাধুরীকে নিয়ে কলকাতায় সুখস্বর্গ রচনা করবে অপরের সাহায্যে এও কল্পনাতীত। কিন্তু এসব কারণ নিতান্ত গৌণ, বাইরের লোক ভাববে এগুলো। ভিতরে আরো আরো গভীরতর কারণ আছে, কিন্তু কি সে কারণ? মহেন্দ্র শিউরে উঠলো। সচকিত হয়ে উঠলো কেউ কোথাও নেই তো? না মহেন্দ্র স্থির আরো কঠোর আঘাত করবে মাধুরীকে।
কিন্তু আজ এখন কি করা যায়? শয্যায় অঙ্গ দিতে ইচ্ছে করছে না। ও শয্যা ঐ পেলব হাতের স্পর্শে লাঞ্ছিত কিন্তু এখনো যা কিছু আছে সবই তো ওর। নিরুপায় মহেন্দ্র ছাদের কার্নিশের ধারে এসে দাঁড়ালো? কেমন যেন জ্বর জ্বর বোধ হচ্ছে, জ্বর নয় মাধুরীকে আঘাত করার উত্তাপ। হাতুড়ি দিয়ে কিছুতে আঘাত করলে হাতুড়িটাও গরম হয়ে যায়–এতো তাই। কিন্তু অসহায় বোধ হচ্ছে। একি জ্বর। একি জ্বালা যন্ত্রণার তীব্রতম বহিঃপ্রকাশ। মহেন্দ্র মাথার চুলগুলো দু’হাতে আংগুল দিয়ে টেনে ধরলো। না সহ্য করা যাচ্ছে না, শুতে হবে। ছাদে কেউ হয়তো সন্ধ্যাবেলা শুয়েছিল, ছেঁড়া মাদুরখানা পড়ে রয়েছে। মহেন্দ্র এসে ওরে পড়লো সেই মাদুরে–
খোকন খোকন। আয়? মহেন্দ্র দু’হাত দিয়ে নিজের বুকখানা চেপে ধরলো। যেন তাঁর শিশু দেবতাকে আলিঙ্গন করছে, বলছে মহেন্দ্র আকাশকে লক্ষ্য করে–
এক ছিল রাজকন্যা চাঁদের মত রূপ, মেঘের মত চুল, তারা মতন চোখ ওহো না এ কার কথা বলছে মহেন্দ্র উপুড় হয়ে পড়লো ছেঁড়া সেই মাদুরটায় স্তব্ধ রাত্রি জেগে পাহারা দিচ্ছে ওকে।
চায়ের জল নিয়ে চাকর রামচন্দ্র এসে ডাক দিল সকালে ও বাবু, ওঠো, ভিজে গেছো যে, ও মহীনবাবু।
