উঠে রাস্তায় এসে মহেন্দ্র একখানা রিক্সা ভাড় করলো। নিশ্চুপ বসে যেতে পারবে– আপনার মনকে অনুভব করবে উপভোগ করবে। আনন্দ দেহের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে ওর অন্তরকে আরক্ত করে তুলেছে, কিন্তু মহেন্দ্র চিন্তাশীল ব্যক্তি। সে ভাবলো যে সহজ সত্যকে সে এতকাল স্বীকার করতে চায়নি অন্তস্থলে তলিয়ে দিয়েছে আজ যেন সেই সত্যটা অপরের দুঃখের ভাষা পেয়ে তাকে আদালতে দাঁড় করিয়ে শুধু স্বীকৃতির স্বাক্ষরই নিল না, টিপসই পর্যন্ত আদায় করে নিল কিন্তু মহীন সত্যকে অস্বীকার করে লাভ কি? চেয়ে চেয়ে দেখলো অন্তরের পরতে কখন মাধুরীর ছবি আঁকা হয়ে গেছে, এ ছাড়া কিছুই নাই আর দেখতে পাচ্ছে না মহেন্দ্র। মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সারা অঙ্গ ওর একি অন্তঃসলিল। প্রেমবন্যা, একি আন্তর্দাহী প্রেমবহ্নি?
কখন যে গোলদীঘির মোড়ে এসে পৌঁছেছে মহীন, কোন পথে কেমন করে কিছুই খেয়াল নেই। রিক্সাওয়ালা ডাক দিল বললো–
বহুত শাস্তি হো গিয়া বাবু এত্যা মাৎ পিজিয়ে!
কিয়া মাৎ পিয়েগা? মহেন্দ্র বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো।
দারু আউর ক্যা। আর রাস্তা তো বাৎলাইয়ে, কিধার যায়েগা।
মহেন্দ্ৰ কিছুমাত্র প্রতিবাদ করলো না, ওকে মাতাল বলার জন্য ঐখানেই নেমে পয়সা ক গন্ডা দিয়ে বাকী পথটুকু হেঁটে এল ভাবতে ভাবতে, সে সত্যি যেন একটা অসাধারণ মদ খেয়েছে যার নেশা ওকে এজন্মে শুধু নয় বহু জন্ম মাতাল করে রাখবে।
মেসে এসে আলো না জ্বেলেই বিছানায় শুয়ে পড়লো মহীন। আশ্চর্য যে কথা নিজেই সে ভাল করে জানেনি সেই কথা বাইরেও প্রকাশ হয়ে গেল বিশ্বে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। তার অন্তরের গোপন চাঁদ। কিন্তু মহেন্দ্র তা জানতে চায় না। কোথাও কাউকে সে বলেনি মাধুরীর কথা– বাড়িতে কে কে আছেন মহীন?
কর্তা গিন্নী তিন ছেলে বৌ আর কুমারী মেয়ে পড়ে কলেজে।
এর বেশী মহেন্দ্র আর কিছু বলেনি বৌদিকে! মাধুরীর নামটা পর্যন্ত নয় কারণ মাধুরীর স্নেহ সহানুভূতি মাখা অন্তরটা সে বৌদির অন্তরে সঞ্চারিত চায়নি। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখাতে চায় না কাউকে। কিন্তু একি সত্য হবার। একি সত্যি হবে। এই স্বপ্ন এই অলীক কল্পনা! না, সত্য কাজ নেই এ স্বপ্নেই থাক কারণ– মহেন্দ্র আর ভাবতে পারলো না।
সকালে স্নানাহার সেরে অফিসে গেলো মহেন্দ্র এবং এমনি সপ্তাহটা কেটে গেল, মাধুরী খোঁজ নিল না, বড়বৌদি ওকেও ফোন করে বললো না। কী এক অবস্বাদের হীনতা ওকে আচ্ছন্ন করে প্রতি মুহূর্তে।
কি সে? জানে না মহেন্দ্র! কি আতঙ্ক কি এক অবস্বাদ না না কি এক অনিবার্যতার ভয়াবহ পরিণাম ওকে শৃংখল, কিন্তু মহীন আর বেশী ভাবতে ভয় পেল নিদারুণ আতঙ্কে চমকে উঠলো মহীন।
ব্যাপার কি মহীনদা? আজ সাতদিন একেবারে ডুব দিয়েছ, মাধুরী বললো এসে।
লুকোবার ঐটা ভাল জায়গা মাধুরী।
পিছনে যদি মাছরাঙা থাকে তো ডুবেও নিস্তার নেই জানো? বসে পড়লো মাধুরী চেয়ারে!
মাছরাঙা আকাশের জীব বলে জলে বেশীক্ষণ থাকতে পারে না। তার খাদ্যের জন্যে একটা মাছ পালালে আর একটা মাছ সে ধরতে চেষ্টা করবে জলে ডুবে মরবে কেন?
কেন এমন কথা বলছে মহীনদা–মাধুরীর চোখে সীমাহীন বেদনার পাবার উথলে উঠলো মাছরাঙাদের পেশা বুঝি একটা না পেলে আরেকটা ধরা। খেয়ে তাদের বাঁচতে হয়, মাধুরী মহেন্দ্র অতি অল্প কথায় উত্তর দিল।
মাধুরীর চোখের করুণা দেখে দু’জনেই চুপচাপ। তারপর মহেন্দ্র আবার বললো চা খাবে মাধুরী?
না, চলো বাইরে গিয়ে খাব, অকস্মাৎ বললো, তুমি কি আমাকে মাছরাঙা মনে কর মহীনদা?
তুমি নিজেই মাছরাঙার উপমা দিয়েছ মাধুরী আমি নই।
হ্যাঁ কিন্তু শোন।
থাক মাধুরী, কথার কথা গেঁথে লাভ কি।
লাভ, কাব্য হয়।
হ্যাঁ কিন্তু কাব্য জীবন নয়। জীবন থেকে কাব্য জন্মায়, কাব্য থেকে জীবন জন্মায় না। কবিতা জীবনে ভোজ্য জীবন তো কবিতার ভোজ্য নয় মাধুরী। জীবন তপন ক্লিষ্ট ঋষি দুঃখ দৈন্য স্বভাব উৎপীড়নে আনন্দে অবসাদে চলে তার তপস্যা কখনও আলোতে কখনও অন্ধকারে কখনও দীর্ঘায়ুতে, কখনো ক্ষীণায়ুতে কখনো ধনীর প্রসাদে কখনো দরিদ্রের কুটিরে আপনাকে পূর্ণ করে চলে, তারপর তপোবনে শুধু হরিণ শিশুই চরেনি শাদুলি সারমেরাও বিচরণ করে চলে। কোথায় যেতে হবে?
এ প্রশ্ন কেন করলে আজ আবার মহীনদা? আমি যেখানে নিয়ে যেতে চাই, তুমি কেন সেখানে যেতে ভরসা করছ না, কেন? মাধুরীর স্পষ্ট ক্রন্দন যেন।
মাছরাঙা মাছের শক্র মাধুরী, মহীন হাসলো কথাটা বলে। কিন্তু মাধুরীর মুখ তেমনি করুণ গম্ভীর। দুজনে একটা দোকানে ঢুকে গেল, মাঝে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালো গাড়ীতে চড়ে, কিন্তু প্রয়োজনীয় কয়েকটা কথা ছাড়া আর কোন কথা হল না ওদের? অবশেষে একটা সিনেমায় গিয়ে কিছুক্ষণ কাটাল সেখানে সেই নীরবতা। অবশেষে মাধুরী বললো জোর করে যেন।
পায়ে পড়ে ফুলকে মাড়িয়ে যেও না মহীনদা।
না মাধুরী, পাশ কেটে চলে যেতে চাই
না– মাধুরীর কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। অন্ধকার ঘরের মধ্যে, চোখের দীপ্তিও। সব ফুল সব পূজায় লাগে না মাধুরী, শাস্ত্রের নিষেধ আছে।
লাগলে কি হয়? মাধুরীর মুখখানা অত্যন্ত কাছে আনলো মহেন্দ্র। অন্ধকার ঘর সুরভিত মুখমল, মহেন্দ্র অতিকষ্টে নিজেকে সংবরণ করে আস্তে আস্তে বললো পূজা ব্যর্থ হয় না, কিন্তু কথাটা মাধুরীর গলায় আটকে গেল।
