ওখানে বড় বড় লোক আসবেন, কত কি দেবেন, তার মাঝে আমার চার পয়সার ভেপু মানাবে মাধুরী। আমি খালি হাতেই যাব।
না, মাধুরী ধমক দিল চার পয়সাও খরচ করতে হবে না, একটা আর্শীবাদ ছড়া লিখে নিয়ে যেও চলে গেল মাধুরী।
মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো। না, খালি হাতে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু কি সে নিয়ে যাবে? অবশেষে একটা ছড়াই লিখলো। ছেলেটার ডাক নাম বাদল। বর্ষার দিনে ওর জন্ম তাই এই নাম। মহেন্দ্র লিখলো–
বাদল যখন আসে লুটিয়ে পড়ে ভাসে
গাছের পাতায় গড়িয়ে পড়ে ফুলের বুকে হাসে।
বাদল এলে মাদল বাজে মেঘের আঙিনায়
খালের জলে, বিলের জলে, একটি হয়ে যায়,
আমার কাছে, তোমার কাছে কোথাও কিছু ফাঁকা না আছে
সকল জুড়ে থাকে বাদল সকল জানার পাশে।
এই দুনিয়ায় বাদলকে তাই সবাই ভালবাসে।
ছড়াটা লিখে ভাবতে লাগলো মহেন্দ্র, বেপথু মধুর মত অন্তরটা তার কে জানে কি বলবে এ ছড়া দেখে। হয়তো ভালো হলো না, হয়তো হাস্যকর হবে ব্যাপারটা! কিন্তু আর কোন উপায় নাই, একখানা লাল রং এর পুরু কাগজে মহেন্দ্র লিখলো শ্রীমান বাদল পঞ্চম জন্মদিন, তার পরিস্কার গোটা গোটা অক্ষরে ছড়াটা লিখে দিল, আর্শীবাদ মহীন কাকা। অতঃপর রওনা হোল সন্ধ্যার সময়। এই কাগজটাই সে উপহার দেবে বাদলকে। সামনেই মাধুরী। বললো দেখি কি এনেছ বাদলের জন্য।
মহেন্দ্র ভয়ে ভয়ে গোটানো কাগজটা দিল তার হাতে। মাধুরী ওটা নিয়েই চলে গেল, মহীন এল বসবার ঘরে। মাধুরী নিজের ঘরে গিয়ে কাগজটা খুলে পড়লো, বেশ বড় কাগজখানা ওর পাশে তুলে দিয়ে একটা পদ্মকুড়ি এঁকে দিল আর তার পাশে আঠা এঁটে দিল বাদলের একখানা ছোট ফটো। তারপর বড় একখানা ফটো ফ্রেমের মধ্যে ভাল খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ালো। এখন ওটা বাঁধানো হয়ে গেছে দেখার মত বস্তু হয়েছে।
এত বড় বাড়িতে ছেলে ঐ একটিই, কাজেই উৎসবটা খুব জোরালো হচ্ছে। বিস্তর অতিথি আসতে লাগলেন আশীর্বাদ করতে। তাদের উপহারের মধ্যে প্লাস্টিকের খেলনা থেকে প্যারাম্বুলেটার পর্যন্ত আছে, খেলনার শেয়াল কুকুর থেকে সোনার গয়না পর্যন্ত সব সাজিয়ে রাখা হচ্ছে একটা টেবিলে।
মহেন্দ্রের হাতে কোন ফাঁকে মাধুরী কাগজ জড়ানো ফটো ফ্রেমটা দিয়ে বলল, দাও এটা বাদলের হাতে–
কি এটা?
অত খবরে কাজ কি? দাও গিয়ে যাও–
মহেন্দ্র নিশ্চয় জানে মাধুরী তাকে বিপন্ন করবে না। এতখানি বিশ্বাস আর কাউকে করতে পারে না এখানে। নিঃশব্দে নিল জিনিসটা? গিন্নীর স্বয়ং কোলে নিয়েছিলেন বাদলকে। কাগজ খুলে দেখলেন ঝকঝকে একটা ফ্রেম আর তার মধ্যে কি যেন লেখা হাসিমুখে রেখে দিলেন। ধানদুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ সেরে মহেন্দ্র এসে বসলো একধারে।
কত রকমের কত উপহার এসেছে কিন্তু মহেন্দ্রের উপহারে অভিনবত্ব অবাক করে দিয়েছে সকলকে। বড়বৌদি স্বয়ং দেখে অত্যন্ত খুশী হোল বড়দাও আনন্দিত একবারে। সামনেই ওটা রেখে দেওয়া হয়েছে। বাদলের মামা বরুণবাবু ওটা তুলে নিয়ে পড়লো জোরে। বললো, তুমি চমৎকার লেখ তো মহীন?
কবিতা এমন একটা জিনিস যা বাজারে কেনা যায় না। এত লোকদের এত মূল্যবান উপহার মলিন হয়ে গেল, এ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে মহেন্দ্রকে। কিন্তু ভেবে লাভ নাই মহেন্দ্র তৃণখন্ডবৎ উড়ে চলে যাবে নিয়তির নিষ্ঠুর পান্থশালায়।
সুন্দর কবিতা হয়েছে ঠাকুরপো, বড়বৌদি বললো হেসে। খাওয়ার পর তোমাকে একটা কথা বলবো শুনে যেও। চলে গেল বড়বৌদি। নানা কাজে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু কি বলবে কথা, যদি কিছু বলবার থাকে তো এক্ষুনি বললেই হোত। মহেন্দ্র মহা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে গিয়ে ভাল করে খেতেই পারলো না। কিন্তু বড়বৌদি খারাপ কিছু বলবে না নিশ্চয়।
তবু মহেন্দ্র দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে রইল, শুধু দুশ্চিন্তা নয় একটু আতঙ্কিত খাওয়া হলো, অতিথিরা সব বিদায় গ্রহণ করেছেন, বড়বৌদি তখনও কাজে ব্যস্ত। অবশেষে এসে বললো–
এতক্ষণে ফুরসৎ পেলাম ভাই—
তাহলে কথাটা এবার বলুন বৌদি।
হ্যাঁ, মাধুরীকে তোমার কেমন লাগে মহীন? হাসছে বড়বৌদি।
কিন্তু মহেন্দ্র ভয় পেয়ে গেল রীতিমত। এ রকম প্রশ্ন করার অর্থ কি? মহীন কি কোন রকম অবিশ্বাস ভাজন হয়েছে। কিন্তু চুপ করে থাকা চলে না, বললো কেন, বৌদি, হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন।
করলাম, আমার মনে হয় ঠাকুরপো, মাধুরী তোমাকে ভালবাসে
ভালবাসে? আমায়?
হ্যাঁগো মশাই তোমায়, বলে আবার হাসলো বড়বৌদি, আর যতটা বুঝেছি তুমিও ভালবাস তাকে।
না, বৌদি একি আপনি বলছেন, আমি তার কোনো রকমে যোগ্য নই–যোগ্য কিনা সেটা আমরা বুঝবো, মাধুরীকে আমরা সুখী করতে চাই মহীন।
হ্যাঁ নিশ্চয় আমিও চাই সে রাণী হোক—
রাণী হলেও সুখী হয় না বোকারাম। তুমি কবি তোমাকে এর চেয়ে কি বোঝাব! ওকে আর আমরা সুতো ছেঁড়া লাটাইয়ের মত ঘুরতে দেব না। মহীন লাটাই এ বেঁধে দেবো।
সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি–
না তো কি। বোম্বাই, সিংহল কোয়েম্বাটোরে, এত কি কাজ। তোমার বাড়ি না যেতে পারার অভিমান জানো। হাসলো বৌদি, বললো রাত হোল যাও। তোমার কবিতাটা আমার বড় ভাল লেগেছে। টাকা দিয়ে তুমি হাতি কিনে আনলেও আমরা খুশী হতাম না।
চলে গেল বড়বৌদি মহেন্দ্ৰ নতমুখে বসেছিল। কিন্তু আর বসে থাকা চলে না। ট্রাম বাস বন্ধ হয়ে যাবে তার।
