একই সঙ্গে হাওড়া এল সব। উমেশবাবু সাতটা দশের ট্রেনে উঠেছেন। আর আটটা ছত্রিশের ট্রেনে মহেন্দ্র মাধুরী ছাড়বে। উমেশবাবু এবং অন্য সবাই গাড়িতে উঠলেন মাধুরী ও উঠলো। মহেন্দ্র দেখে প্রশ্ন করলো
ও কি? তুমি উঠছ যে আমাদের বাড়ি যাবে না?
কৈ আর গেলাম–বাবাকে একলা ছেড়ে দিতে ভরসা হচ্ছে না।
একলা কোথায় মাধুরী–সবাই তো যাবেন ওর সঙ্গে?
তা হোক আমি না থাকলে বাবা বড় অসহায় হয়ে পড়েন, তাছাড়া তোমার বাড়ি দেখা : পালিয়ে যাচ্ছে না, পরে গেলেই হবে।
ট্রেন ছেড়ে দিল–যেন পশ্চিম দেশটাই পালিয়ে যাচ্ছে, এমনি ভাবে মাধুরীও। অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ভাবলো মহেন্দ্র, তারপর নিজেই ট্রেনে উঠলো এসে। মাধুরী না আসায় ওর অনেক চিন্তার অবসান ঘটেছে কিন্তু কেন মাধুরী আসবে বলে এল না এইটা মহাচিন্তার ব্যাপার। কিন্তু এ নিয়ে কারো সঙ্গে কিছু আলোচনা করা চলে না। আপনার অন্তরেই মাধুরীর কথা গোপন রেখে মহেন্দ্র হুল্লোড় করে কাটিয়ে দিল। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব, খোকনের অভিনয় এবং মহেন্দ্রের সেতার বাদ্য সব মিলে বাড়িটা বেশ গমগম হয়ে রইল এই কটা দিন।
যথাকালে মহেন্দ্র আবার যাত্রা করলো কলকাতায়। মেসে এলে একটা ঘরে শুয়ে ভাবতে লাগলো, মাধুরী কলকাতায় নেই, শনিবার কেউ আর গাড়ি নিয়ে এসে ডাকবে না, চলো মহীনদা। পরদিন মহীন একখানা চিঠি পেল মাধুরী লিখেছে।
শ্রীচরণেষু মহীনদা, তুমি আমায় নেহাৎ দায়ে পড়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে। এতবড় ধিঙ্গি মেয়েকে নিতে তোমার ইচ্ছে ছিল না। লোকে হয়তো খারাপ কিছু ভাবতে পারে এই কথা তুমি ভাবছিলে তাই গেলাম না। বড়লোকে প্রণাম করতে যদি সময় সুযোগ কখনো হয় তো যাব। প্রণাম জেনো, মাধুরী।
কথাগুলোতে একটা তীক্ষ্ণ সত্য রয়েছে। মহেন্দ্র চিটিখানা পড়ে জবাব লিখে দিল– মাধুরীর বুদ্ধি তাকে ঠিক পথেই চালিত করেছে।
মেসের লোক কিন্তু বড় নিরাশ হয় শনিবার দিন। বরাবর প্রশ্ন করে, এখনো তিনি কলকাতায় ফেরেন নি? না, দেরী আছে ফিরতে বলে মহেন্দ্র হেসে চলে যায়। মাধুরী না আসায় মহেন্দ্রের চেয়ে এদের দুঃখই যেন বেশি হয়ে উঠেছে, অমনি ভাব। মাধুরীর পরবর্তী পত্র এল। সে লিখেছে
দেশে ইনফেকশান চলছে, কিন্তু মানুষের এত দৈন্য যে, দেখা যায় না। ভাত নাই, কাপড় নাই, কচি ছেলের দুধ নাই, কি আছে মহীনদা জানো? আছে ভাষণ, আছে ভেজাল, আছে ভন্ডামী।
মহেন্দ্র পড়ে একটু হাসলো, তারপর বেরিয়ে গেল অফিসে। মাধুরীদের ফেরার সময় হয়েছে, এবার হঠাৎ একদিন সে এসে পড়বে মেসের দরজায় কিন্তু দিন পার হয়ে যাচ্ছে, মাধুরী ফিরছেই না। শুনলো সে নাকি মেজদার সঙ্গে বোম্বাই গেছে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে। তারপর শুনলো মালয়ে গেছে সে মেজবৌদির সঙ্গে–এরপর হয়তো শুনবে আমেরিকায় গেছে মাধুরী।
মহেন্দ্র গভীর নিশীথে সেতারটা কোলে নিয়ে বসে ভাবে কতদূর আজ সেতারের অধিকারিণী। বর্ষার আকাশ আর্দ্র করে মহেন্দ্র কণ্ঠ থেকে করুণ রাগিণী ঝঙ্কার তোলে সে। কথা কি গেছে ভুলে?
নিস্তব্ধ নিশীতে মহেন্দ্র সেদিন অনুভব করলো মাধুরীকে লাভ করবার যোগ্যতা তার থাকলেও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু একটা অন্তরায় রয়েছে, যাকে অতিক্রম করা অসাধ্য। পাংশু মখে কথাটা চিন্তা করতে করতে মহেন্দ্রের চোখ ফেটে জল পড়তে লাগলো। কিন্তু মানুষের অন্তর চিরদিন আশাকে আশ্রয় করে। মহেন্দ্রও করলো।
সকালেই ডাকল দরজায়, মাধুরীর মধুর কণ্ঠ, মহীনদা। দরজা খুলে বেরিয়ে এল মহীন। স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সুন্দরী সম্মুখে।
কত কথা তোমার সঙ্গে আছে আমার মহীনদা, বলতে বলতে ঘরে ঢুকে বসলো মাধুরী একটা চেয়ারে। মহেন্দ্র মুখ হাত ধুয়ে বাইরে গেল। ফিরে দেখলে মাধুরী গরম জলে চা ছেড়ে রুটিতে মাখন লাগাচ্ছে। মহেন্দ্র ঘরে ঢুকতেই ওর পানে চেয়ে মাধুরী প্রশ্ন করলো তোমায় যেন কিছু শুকনো দেখাচ্ছে মহীনদা, শরীর ভাল?
হ্যাঁ, যথাপূর্ব। বলো তোমার কি অনেক কথা–
মাধুরী চা তৈরী করতে আরম্ভ করলো, বোম্বাই, সিংহল এবং মালয় ভ্রমণ কাহিনী। খুব ধীরে বসিয়ে বলছে চা খেতে খেতে শুনছে মহীন। অকস্মাৎ মাধুরী কথা থামিয়ে বললো।
দেশ দেখার আনন্দ তোমাকে জানাতে আসিনি মহীনদা, নিজেকে খুঁজে বেড়াবার দুঃখটা জানতে চাইছি–
নিজেকে খুঁজেতে তো দেশে দেশে ঘুরতে হয় না মাধুরী, নিজের মধ্যেই খুঁজতে হয়।
না, নিজের মধ্যে নিজেকে খোজা অধ্যাত্মসাধনা, সেটা আত্মকেন্দ্রিক, আর বিশ্বের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করা বিশ্বকেন্দ্রিক, সেটা প্রেমের সাধনা মহীনদা।
মহীন কিছু বললো না, মাধুরীর মুখপানে তাকিয়ে রইল। মাধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে তার নিজের কথাটা ভাবলো তারপর বললো আবার
মানুষকে দেখলাম বহু দেশে বহু অবস্থায় থেকে আরম্ভ করে বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীলতা সব ঐ একটা বস্তুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে আমার মনে হয়, বিশ্বে যা কিছু উপজীব্য একমাত্র প্রেম। তুমি একদিন বলেছিলে তোমার ক্ষেত্রে অনন্তের চারণভূমি তখন এটা বুঝিনি। মহেন্দ্র এবারও কিছু বললো না, চা খাওয়া শেষ করলো। মাধুরী বললো, আজ রবিবার তোমার ছুটি, বিকালে যাবে ওখানে। আজ বড়বৌদির খোকার জন্মদিন, একটা খেলনা নিয়ে যেও। উঠলো মাধুরী, তোমার হয়তো খেয়াল হবে না বলে খেলনার কথাটা জানিয়ে দিলাম। যাচ্ছি। চলে যাচ্ছে মাধুরী।
