অপমানের কথা ভুলে গিয়ে উমেশবাবু ওকে কোলে নিলেন, বললেন তোকে যোগ্যপাত্র দিয়ে আমি নিশ্চিত হতে চাই মা–
আমার সম্বন্ধে চিন্তার কি আছে বাবা, আমাকে কেন এত দুর্বল মনে করছ? আমি নিজের ভার নিজেই সইতে যথেষ্ট সক্ষম। বিয়ে ছাড়া কি মানুষ বাঁচে না বাবা। পৃথিবীতে কুমারী মেয়ে বিস্তর রয়েছে–
আচ্ছা মা তোকে বিয়ে দেবার চেষ্টা আর করবো না থাক, তোর যেমন ইচ্ছে থাক। বলে মাধুরীর চোখ মুছে দিলেন তিনি।
তুমি খুব ভাল ছেলে বাবা বলে হাসলো মাধুরী। অম্লান হাসিয়া বললো আমার বিয়ের খরচের টাকা গুলো আমাকে দিয়ে দাও। আমি ঐ টাকায় দমদমার বাগানে একটা গোশালা করি
গোশালায় কি হবে রে, হাসলেন উমেশবাবু।
দুধ হবে, ঘি হবে, মাখন হবে, দেশের ছেলেরা খাবে আর আমিও পয়সা পাব। গরীবদের দুধ মাখন বিলাবো। মা যশোদা হয়ে যাব বাবা।
কিন্তু গরু পোশা বড় ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার মা, ওসব চাষ শিখতে হয়।
আচ্ছা বাবা তাহলে ফুলের চাষ করবো ওখানে, তাও যদি না চাও তো কচুর চাষ– কচু, বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠলো উমেশবাবুর।
হ্যাঁ বাবা, কচু খুব ভাল জিনিস, কালি কচু, ধলি কচু–সার মান কচু, জল কচু, কলম কচু।
ওতে কি রোজগার হবে–
রোজগারের জন্যে তো আমি যাচ্ছি না বাবা, আমি দেখিয়ে দিতে চাই যে মানুষ মেয়ে হোক বা ছেলে হোক, কীটপতঙ্গ নিয়ে তাদের খুঁটিনাটি খুঁজেও হাজার বছর কেটে যায় বাবা, নেশা খুব ভাল নেশা, যাকে বলে সাধনা। মাধুরী যেন তার বাবাকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বাবা বললেন, আচ্ছা তোর যা ইচ্ছা করিস, বলে আবার হাসলেন তিনি। অতঃপর আর কোন কথা না বলে মাধুরী বেরিয়ে গেল ওখান থেকে। মহেন্দ্রও অন্য দরজা দিয়ে এল ভিতরে। বৌদিরা মাধুরীর উপর রেগে আছে, কিন্তু মাধুরী ওদের গ্রাহ্যই করে না। সটান এসে বললো বড়বৌদিকে, খেতে দাও কিছু, আর শোন, হোষ্টেল থেকে বাড়ি ফিরে আসবো কাল। পরশু থেকে দমদমার বাগানে তপস্যা আরম্ভ করবো।
তপস্যা! কিসের তপস্যা ছোটদি। বড়বৌদি হাসলো।
প্রজাপতিরা কেমন করে ঘর বাধে, কি খায়, কতদিন বাঁচে, তার হিসেব রাখার তপস্যা, বুঝলে?
ভাই, ও জেনে কি হবে? ওরা সৃষ্টির সুন্দর জীবন ওদের জানলে চিরসুন্দরকে জানা যায়, আর এক পিস পুডিং দাও, ব্যস, বড়দাকে বলো কাল এসে দেখা করবো। চলো মহীনদা আমার পৌঁছে দাও, বলে উঠলো মাধুরী।
আগে পতি, তারপর প্রজা হয়, জানিস। বড়বৌদি বললো।
ওটা তোমার জন্যে, আমার জন্যে শুধুই প্রজা, আমি স্বয়ং তাদের পত। চলো মহীনদা
মহেন্দ্র ওকে নিয়ে বাড়ির গাড়িতেই চললো। রাস্তায় কোন কথা হল না, নামবার সময় মাধুরী বললো, সোনায় বাঁধা মোয়া আমি পারলাম না মহীনদা।
লোহার শেকল বড্ড ভারী হয় মাধুরী।
হোক, আমি বইতে পারবো, চলে যাচ্ছে মাধুরী, মহেন্দ্র বললো আবার ঐ শেকল তোমার গলায় ফুলের মালা হয়ে উঠুক।
চণ্ডীপুরে মেলা হয় চৈত্র সংক্রান্তির সময়, খোকনের উৎসাহের অন্ত নাই, সবার বড় কথা কাকু আসবে।
কাকু আসবে আর সব কিছু তুচ্ছ হয়ে গেল। মাকে বললো
আজ তো সোমবার মা কাকু তাহলে কবে আসবে?
পরশু বুধবারে সকালেই এসে যাবে তোর কাকু।
অতঃপর ভাতগুলো গিলে স্কুলে চলে গেল। পাঠ্য মুখস্ত করছে দিন রাত কোথাও যেন ভুল না হয়। বড় পাঠ বৃষকেতুর অভিনয়। খোকন দর্শকদের কাঁদিয়ে ছেড়ে দেবে। কাকু এলে আরও ভাল করে শিখে নিতে হবে।
কিন্তু পরশুর এখনো অনেক দেরি আর সেদিনই তো যাত্রা হবে, তাহলে শিখবে কখন? তারপর সং আছে, তাতেও খোকনের অংশটা আছে একটা। সং এ ওকে ‘বর’ করা হবে, কনের বয়স চল্লিস, খোকন তার কোলে চেপে বিয়ে করবে ইত্যাদির কথা ভাবছে খোকন।
পরশু এসে পড়লো, এবার কাকু এলেই হয়, অবশেষে কাকুও এল, কিন্তু খোকন এখানে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছে না। এই কয় মাসে খোকন যেন অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে, কোলে চাপা কি আজ ঠিক হবে কিন্তু কাকু ধরেই কোলে নিল, এবং ঠিক তেমনি আদর করতে লাগলো, অতএব খোকন বড় হয়নি।
কলকাকলি ছুটিয়ে দিল কাকুর সঙ্গে। ঘন্টাখানেক বিরামহীন বাক্যশ্রোত, কত যে বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনা করলে তার লেখার যোগ্য নেই। অবশেষে অর্পণা বললো এবার ছাড় দেখি কাকুকে, জলটল খেতে দেই
হ্যাঁ মা দাও না তুমি জল খেতে–কোলে চড়েই বললো খোকন। খোকনকে সঙ্গে নিয়ে জলযোগ করলো মহীন, তারপর ওকে সঙ্গে নিয়ে বেরুলো পাড়ায়। গ্রামের সকলেই খবর নিল ওর কাজকর্ম কেমন, মাইনে কত উন্নতির আশা কতখানি আছে ইত্যাদি। কয়েকমাস পরে গ্রামখানা যেন কেমন নতুন লাগছে, কিন্তু ঐ সঙ্গে একটা বিশেষ ব্যাপার মনে পড়ছে, যার নিরা করণ মহেন্দ্র করতে পারলো না। ব্যাপার এই–দিন চার পাঁচ আগে মহেন্দ্র শ্যামবাজারে গিয়ে বললো যে সে একেবারে বাড়ি যাবে। উমেশবাবু সপরিবারে বাইরে। যাবেন গ্রীষ্মটা কাটাতে মাধুরীও যাবে। অকস্মাৎ মাধুরী বললো–মহীনদার সঙ্গে ওদের বাড়ি ঘুরে আসি না বাবা।
তা কি করে হবে মা, ওতো কয়েক দিন পরেই ফিরবে, তুই থাকবি কোথায়। কলকাতায় তো কেউ থাকবে না?
ফেরার পথে মহীনদা আমায় পৌঁছে দিয়ে আসবে তোমার কাছে।
হ্যাঁ, তা হতে পারে উমেশবাবু বললেন। কিন্তু মহীনের আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল। গরীবের বাড়িতে এই ধনীকন্যার সম্মান হয়তো ক্ষুণ্ণ হবে। পল্লীর আচার ব্যবস্থা সম্বন্ধে মাধুরীর কোন ধারণা নেই। তারপর এতবড় অবিবাহিতা মেয়ে দেখে লোকে হয়তো ওর সম্মুখেই কিছু খারাপ কথা বলে ফেলতে পারে–মহেন্দ্র এই সব কথা ভাবছে। মাধুরী ওর পানে চেয়ে বললো তোমার বোধহয় নিয়ে যাবার ইচ্ছা নেই, না মহীনদা? অনিচ্ছার কথা নয় তুমি সেখানে থাকতে পারবে কিনা ভাবছিলাম। আচ্ছা সে আমি বুঝবো বলে মাধুরী আবার বলল, বাড়িতে খবর দিও না। হঠাৎ গিয়ে পৌঁছাব বলে চলে গেল।
