দ্বার পালদের বেশভুষা বদলে গেছে আজ। ধোলাই কোটি পাজামা পরা বড় দারোয়ান ফেজু সিং সালাম জানালো ওদের। মাধুরী বললো–ব্যাপার কি ফৈজু। হঠাৎ বাবু হয়ে গেলি যে! দিদিরানীকে সাদি হোগি আওরহাম বাবু নাহি বনেগা? বলে হাসল ফৈজু।
মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝতে পারলে মাধুরী, মহেন্দ্রের পানে তাকালে অগ্নিময় দৃষ্টিতে, পর মুহূর্তেই শান্ত হাসি হেসে বললো আস্তে,
সব চক্রান্তকারীর দল, আচ্ছা। গেল ভেতরে একলাই।
মহেন্দ্র নেমে এল বসবার ঘরে। ওখানে উমেশবাবু, বড়দা, মেজদা এবং আরো কয়েকজন রয়েছেন। জমিদার মশাই এখানে আসেননি। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসে পড়লেন। এসেই বললেন, সন্ধ্যালগ্নেই আমি মেয়ে দেখতে চাই, সময়টা ভাল আছে।
মেজদা গেল মাধুরীকে আনবার জন্য, কিন্তু আট দশ মিনিট অতীত হল মেজদা ফিরলো না, এদিকে জমিদার মশাই তাড়া দিচ্ছেন, সময় পার হয়ে যাবে। অতঃপর বড়দা গেল দেখতে কিন্তু আশ্চর্য বড়দাও ফিরছে না হোল কি? অবশেষে স্বয়ং উমেশবাবু মহীনকে গিয়ে দেখতে বললেন। মহীন গিয়ে দেখলো মাধুরী তার ঘরটায় খিল দিয়ে খাটে বসে আছে, চোখের জলে গড়াচ্ছে গণ্ড। বাইরে বাড়িশুদ্ধ লোক অনুনয় বিনয়, তর্জন, গর্জন করছে। মাধুরী নির্বাক। অবশেষে বললো আমি কি সং নাকি আমাকে দেখতে আসবে? আমি যাব না, যার যা ইচ্ছে করতে পারে। বলে শুয়ে পড়লো।
সং তুমি ছিলে না মাধুরী, এইবার সং সেজেছ! ভদ্রলোকদের এখানেই ডেকে আনি, দেখে যান বলে মহেন্দ্ৰ কঠিন কণ্ঠে আবার বললো, আমাদের বাড়ী শুদ্ধ সবাইকে অপমান করা বুঝলে।
আমি যদি বিয়ে না করতে চাই, মাধুরী উঠে বললো।
তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ বিয়ে দিচ্ছে না! দেখা দিলেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। তারা যখন এসেছে একবার গিয়ে দাঁড়াতে দোষ কি?
আচ্ছা চলো বলে খিল খুলে বেরিয়ে এলো মাধুরী।
কাপড় বদলে নে–বড়বৌদি বলল।
না, মাধুরী ধমক দিয়ে উঠলো শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি না।
গিয়ে প্রণাম করবি বুঝলি? মেজবৌদি বলল!
প্রণাম করার কথা তুমি শেখাবে, ভুতের মুখের রাম নাম।
বলে মাধুরী সটান চলে এল পিছনে বড়দা, মেজদা মহেন্দ্র এবং তার পিছনে বাড়ির মেয়েরা সব। মাধুরী ঘরে ঢুকে তিনজন অতিথিকেই প্রণাম করলো এবং তারপর বাবাকে। প্রণাম করে বসলো সামনে। বৃদ্ধ জমিদার দেখে বললেন।
বাঃ বেশ মেয়ে।
তোমার নাম কি মা?
মাধুরী ভট্টচার্য সহজ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, মাধুরী।
বৌদিরা অন্তরালে গুঞ্জন করলো মুখপুড়ী আর কি? মাধুরী লতা দেবী বলবি না, শুধু ভট্টাচার্য।
জমিদার মুচকি হাসছিলেন–ভাব দেখে বোঝা যায়, তার খুব পছন্দ হয়েছে মাধুরীকে। আর একবার তার আপাদমস্তক দেখে পুনরায় প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা মা, তুমি রান্না বান্না কিছু জান?
জানি।
কি জানো?
ডাল, ভা, তরকারী, শাক ভাজা, মাছ–মাংস ডিম–চা। কাটলেট, স্যাণ্ড উইচ, টোষ্ট, পান তামাক সাজা–
তামাক সাজাটাও কি তাহলে রান্নার মধ্যে পড়ে, বাঃ বেশ মা এমনি সপ্রতিভ মেয়েই চেয়েছিলাম, বলতে বলতে হাসতে লাগলেন। ঘরের সবাই হাসছে ও দিকে ভিতরেও হাসি, মাধুরী গম্ভীর মুখে। বৃদ্ধ জমিদারবাবু সস্নেহে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন—
তোমাকে আমার ঘরে যেতে হবে মা, আমার মা হতে হবে, কেমন?
না, কারুর মা বাপ হওয়া আমার চলবে না, আপনি মাপ করবেন, বলে উঠতে উঠতে আপনাকে দুঃখ দিলাম, তাই আবার মাপ চাইছি, প্রণাম হই। প্রণাম কথাটা উচ্চারণ করে উঠে পড়ুর মাধুরী এবং কোন দিকে না চেয়ে সটান ভেতরে চলে গেল।
আকস্মিকতার আঘাতে ঘরে যেন বজ্রপাত হয়ে গেছে। উমেশবাবু লজ্জিত নতমুখে বসে আছেন, এবং অন্যান্য সকলেই তদবস্থা। কিন্তু জমিদারবাবু বললেন ওরকম হয়েই থাকে আজকালকার মেয়েরা। বিয়ের নামে জ্বলে উঠে, আবার বিয়ে হলেই ঠিক হয়ে যায়। মেয়ে। আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। আপনি কবে ছেলে দেখতে যাবেন বলুন।
উমেশবাবু যেন বাচলেন, মেয়েদের স্বভাবের দোষ দিয়েই এ যাত্রা রক্ষা হলো, কিন্তু তার মেয়েকে তিনি তো জানেন, বললেন, ধীরে ধীরে, বড় মেয়ে ওর মতটা আমি নিজে একবার জেনে আপনাকে জানাবো
আমার ঐ একটি মাত্র বোন, ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা কিছু করতে পারব না কাকা বাবু মাপ করবেন, বললো বড়দা বিনীত ভাবে।
মেজদা বললো বিয়ের ভয়ে ও হোষ্টেলে পালিয়েছে, অথচ ঘরে ফিরে ওকে না দেখতে পেলে আমাদের মনে হয় সারা বাড়িটা খালি–
বিয়ে তো দিতে হবে বাবা, বললেন, জমিদারবাবু।
হ্যাঁ দিতে অনিচ্ছা নাই, কিন্তু ওর মত না হলে দিতে পারবো না, ওকে খুশি করতে আমরা তিন ভাই সর্বস্ব দিতে পারি। ওযে আমাদের কত স্নেহের ধন তা বলে বোঝানো যায় না কাকাবাবু বড়দা বললো। তা তো বটেই? মেয়েও খুব ভাল, আমার স্ত্রী ওকে দেখেছে ওদরে পিকনিক পার্টিতে তারই ইচ্ছে বৌ করে নিয়ে যাওয়া। বেশ ওর মত নাও তোমরা। জলযোগ সেরে তিনি উঠলেন। যাবার সময় আবার বললেন–
আমার ছেলেকে দেখলে ওর পছন্দ না হবার কারণ নেই। যদি মনে কর তো তার ব্যবস্থা হতে পারবে। মাকে আমার খুবই ভাল লেগেছে। ছেলের বাপ হয়েও তাই এতকথা বলছি। আমার বাড়িতে ও লক্ষীর আসন পাবে!
ওরা চলে গেলেন। এমন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এতটা নামলেন তিনি মাধুরীকে পুত্রবধু করবার জন্য অথচ মাধুরী যে ব্যবহারটা ওর সঙ্গে করলো, অন্য বাড়ি হলে এ রকম মেয়ের অদৃষ্টে কি যে লাঞ্ছনা হতো বলা যায় না। কিন্তু এখানে ওসব কিছু হবার যো নাই! বেরাি জানে, মাধুরীকে কিছু বললে দাদারা সহ্য করবে না। যদি কিছু বলে তো দাদারাই বলুক। মেজবৌ বড়বৌ ছোটবৌ সব বিরক্ত হয়ে গেল! দাদাও চলে গেল, বসে রইলেন উমেশবাবু একা। মহেন্দ্র ও কি করবে ভাবছে ও দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ দেখতে। পেল মাধুরী এসে দাঁড়ালো তার বাবার কাছে উনি গড়গড়া টানছিলেন। মাধুরীর চোখে জল! আচলে মুছে বাবার পা তলে বসলো। পায়ে হাত দিয়ে বললো, তোমাকে বড় দুঃখ দিলাম। বাবা, কিন্তু কি করবো। কেন তোমরা আমাকে এমন অবস্থায় ফেল।
