না আসাই ভাল মাধুরীর। মহেন্দ্র নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে ভাবলেও কিন্তু সান্ত্বনা এতে পাওয়া যায় না। মন তার অশান্ত হয়ে উঠেছে। যে একটি মাত্র আশ্রয়কে অবলম্বন করে মহেন্দ্র এই বিশাল নগরীর বুকে ভেসে বেড়ায় সে নৌকা বুঝি ঘাটে বাহির হয়ে গেল। যাক মাধুরী ভাল হোক, সে রাজরানী হোক মহেন্দ্র নিজেকে সংযম করতে চাইল, নিজের অন্তরকে তিরস্কার করলো নিজের আত্মাকে ধিক্কার দিল তারপর খোকনের কথা ভেবে আপনাকে। আত্মস্থ করলো।
একবার বাড়ি যাওয়া উচিত। অনেকদিন এসেছে বাড়ি থেকে। কিন্তু ছুটি পাওয়া কঠিন। কারণ চাকরীতে খুব বেশি দিন ঢোকেনি সে। সামনে চৈত্র সংক্রান্তি পয়লা বৈশাখে ছুটি আছে ক’দিন আর একটা রবিবার ঐ সঙ্গে। মহেন্দ্র বাড়ি ঘুরে আসবে। বড়বাবুকে বললো কথাটা আনন্দ সম্মতি দিলেন। অতঃপর একবার মাধুরীকে এবং তাদের বাড়ির লোককে বলা উচিত কিন্তু বলবে কি করে? অথচ ভেবে দেখলো ফোন করে, অথবা অফিসে ফিরতে ওখানে গিয়ে বলে আসতে কোনই বাধা নাই, তবুও মহেন্দ্র কিছু করতে পারল না। এই সঙ্কোচ এই শঙ্কা ওকে আরও সঙ্কুচিত করে তুলেছে? দূরে হোক? কিই বা দরকার ওদের জানাবার? বড়লোক বড়লোকের মতই থাকে মহেন্দ্রের সঙ্গে ওদের কতটুকু যোগ। যে মাধুরী প্রতি সপ্তাহে আসতো, এসে ঘর ঝাট দিত পর্যন্ত সে আজ কিনা বিশ পঁচিশ দিন আসেনি এতেই বুঝা যায়, কিছু একটা ঘটেছে। ওর এখানে আসার সম্বন্ধে হয়তো কোন কথা উঠেছে কিংবা কোন অপমান–কথাটা ভেবে শেষ করতে পারলো না মহেন্দ্র। ফোন করে আর ওদের বিড়ম্বিত করবে না সে, বিপন্ন করবে না মাধুরীকে। বেশ বোঝা যাচ্ছে যে মাধুরী কাটতে চায় তার সংসর্গ। ভাতগুলো খেয়ে মহেন্দ্র অফিসে বেরুলো। ট্রামে সে যায় না পয়সা বাঁচায়–হেঁটেই চলছে। খাওয়ার পরই এই পরিশ্রম ওকে কাতর করে, কিন্তু পয়সা খরচ করতে ওর ইচ্ছে হয় না। মনে হয়, একটা পয়সার জন্য তার খোকন কেঁদেছে দু’পয়সার বাঁশি মহীন তাকে কিনে দিতে পারেনি।
অফিসে কাজ করছে অকস্মাৎ টেলিফোন ডাক। মহীন গিয়ে শুনলো বড়দা বলছে।
–আজ সন্ধ্যায় এখানে এসো মহীন মাধুরীকে দেখতে আসবেন রামপুরের জমিদার। বাবার চেনা বন্ধুর ছেলেটি ভাল। শুনলাম ডাক্তারী পড়বার জন্যে বিদেশে যাবে।
–বেশ তো যাব। মহেন্দ্র বললো সাতটা নাগাদ পৌঁছাব আমি। বড়দা ফোন ছেড়ে দেবার পর মহেন্দ্র ভাবলো, এই তো মাধুরীর যোগ্য বর জমিদার ছেলে সুন্দর, শিক্ষিত, অভিজাত খুব ভাল হবে। যাক বাঁচা গেল–মহেন্দ্র সম্বন্ধে কোন খারাপ কিছু ও বাড়িতে আলোচনা হয়নি তাহলে। মহেন্দ্র ওখানে তেমনি আপনজন হয়েই আছে প্রমাণ বড়দার আজকেই এই আহ্বান। আনন্দ হচ্ছে মহীনের, মাধুরীর বিয়ে হবে যেন তার ছোট বোনের বিয়ে। খুব ভাল। মনের আনাচে কানাচে কোথাও কোন মেঘ নাই তো, অন্তরে নিলাকাশ জুড়ে মাধুরীর জন্য আশিসধারা ঝরেছে। মহেন্দ্র আনন্দিত হল পরিতৃপ্ত হল। আবার ফোন, মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি গিয়ে ফোন ধরে শুনলো, বড়বৌদি কথা বলছেন। শোন মহীন, তোমার বড়দার ভুলো মন। যে কথাটা বলার জন্যে তোমার ডাকা, সেইটিই উনি বলেননি। মাধুরীকে নিয়ে আসতে হবে তোমার।
কোত্থেকে? মহেন্দ্র অতি বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো সে কোথায় গেল বৌদি?
ওমা? তুমি জান না? সে পরীক্ষার পড়ার জন্যে হোষ্টেলে গিয়ে সিট নিয়েছে, আমহাষ্ট্রস্ট্রীটের ছাত্রী নিকেতন থাকে। পরীক্ষা হয়ে গেছে, তবু মেয়ের বাড়ি ফেরার নামটি নেই। বিয়ের কথা শুনলে আসবেই না তুমি ভাইটি কোনো কিছু বলে ভুলিয়ে বাড়ি নিয়ে এস ছটার মধ্যে বুঝলে। হ্যাঁ বৌদি আচ্ছা বলে মহেন্দ্র কথা শেষ করলো।
কিন্তু চিন্তার আকুল সমুদ্রে ভাসছে সে, একি ব্যাপার মাধুরীর কেন সে হোস্টেলে এল, আর মহেন্দ্রকে জানালো না কেন আমহাষ্ট্রস্ট্রীটের ছাত্রী নিকেতন মহেন্দ্রের মেস থেকে আট দশ মিনিটের পথ অথচ একদিনও মাধুরী এল না মহেন্দ্রের বাসায়। মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত।
কিন্তু ভেবে কিছু বোঝা যাবে না। মহেন্দ্র পাঁচটার সময় বড়বাবুকে বলে মেসে ফিরলো, কাপড় বদলে গেল, ছাত্রী নিকেতনে মাধুরীকে খবর পাঠাল।
ও, তুমি। কী খবর মহীনদা? মাধুরী এসে প্রশ্ন করলো হাসিমুখে।
তুমি এখানে কেন মাধুরী? কদিন এসছে? কেনই বা এসছো?
হোষ্টেল বাসে দুঃখের একটা বিশেষ আনন্দ আছে মহীনদা। সেটা ভোগ করতে চাইছি। হাসলো মাধুরী কথাটা বলে।
স্বেচ্ছায় দুঃখ বর্ণনা এক প্রকার বিলাসী মাধুরী, দুঃখের নির্মমতা ওতে থাকে না। ও যেন ধনীর রৌদ্রের হাতের সোনা বাঁধানো মোয়া, গহনার কাজ হয়। কঠিন তিরস্কারে মাধুরী নিভে গেল একেবারে। আধ মিনিট থেমে বললো, আর কারণ আছে মহীনদা। কিন্তু যাক সে কথা। কি খবর বল?
বাড়ি চল, বড়বৌদি কি সব রান্নাবান্না করেছেন, খেতে ডাকলেন।
অনেকদিন ভাল কিছু খাইনি, তুমি তো আর খাওয়াতে যাচ্ছা না? আচ্ছা আমি কাপড় বদলে আসি।
মিনিট কয়েক পর দু’জনে বেরুলো। মাধুরী পরেছে একখানা কালো পাড়ে সাদা শাড়ি তাতের। কানে দু’টি কুমারী মাকড়ী ছাড়া আর কোনো সোনার গহনা নাই গায়ে। হাতে কাঁচের চুড়ি। এ বেশে মাধুরীকে কোনদিন দেখিনি মহেন্দ্র। কিন্তু কিছু বললো না, ট্যাক্সি করে শ্যামবাজার পৌঁছাল।
