চিন্তার জীবানুও থাকে মাধুরী। মহেন্দ্র মৃদু হেসে জবাব দিল।
হ্যাঁ কিন্তু রোগকে ওরা ঠেকাতে পারে না।
না, বরং এগিয়ে আনে বলে হাসলো মহেন্দ্র, পরে বললো কিন্তু গরীবের ঘোড়ারোগ ধরলে কাঠের ঘোড়ারই সন্ধান করতে হয়। তাছাড়া এসব বই নতুন পাওয়া যায় কম দেখছো না, সব পুরান আর উপপুরান
কি করবে ওগুলো পড়ে? মাধুরী প্রশ্ন করলো ও দিয়ে কি হবে তোমার?
অনেক হবে। বাংলার এই প্রাচীন সাহিত্য মন্থন করে অমৃত উঠাতে চাই। গরলও উঠতে পারে বলে মাধুরী যেন অপ্রসন্নভাবে ঘরের জিনিসগুলো গোছালো, চা তৈরী করে খাওয়ালো মহেন্দ্রকে। তারপরই বললো, চল খোলা হাওয়ায় বেড়িয়ে আনি তোমায়
এখানে বিস্তর খোলা হাওয়া মাধুরী–
এটা কলকাতার কনজেষ্টেড এরিয়া–নাও উঠে পড়। বা
ইরে যেতেই হবে?
অবশ্যই যেতে হবে, কারণ বড় মিলনটা বাইরেই হয়, আকাশ নীল আম বনের সবুজে, সাগরের নিলে আর মাঠের শ্যামলতায়–হাসছে মাধুরী।
ওকে কি ঠিক মিলন বলে মাধুরী? ও শুধু ছুঁয়ে থাকে, আকাশ থেকে আকাশেই, সাগর ঠিক থেকে যায়, ঐ মিলনের মধ্যে বিরাট শূন্যতা, ব্যাকুল হাহাকার! তার থেকে ঐ কার্নিসের কবুতর দুটোকে দেখো অতটুকু জায়গায় ওরা কেমন এক হয়ে গেছে–
মহেন্দ্র কথাগুলো শেষ করতেই দেখতে পেল, মাধুরী প্রদীপ্ত চোখ মেলে ওর পানে চেয়ে আছে। আরক্ত হয়ে উঠেছে মহেন্দ্র অকস্মাৎ। তার কবি মন আকস্মিকভাবে কার কাছে কি কথা প্রকাশ করেছে, এতক্ষণে যেন সেটা অনুভব করলো তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলাবার। জন্যে বললো কিন্তু বাইরের ওই মিলনটা ভালো মাধুরী।
কেন ভালো কেন হলো আবার? মাধুরীর কণ্ঠে ব্যাঙ্গোক্তি।
হ্যাঁ, ভালো চলো বাইরে যাই–ওর যে আকাশ আর বনের সবুজের মধ্যে বিরাট অবকাশ মহেন্দ্র কোটখানা গায়ে চড়াতে চড়াতে ভেবে নিল বলল
আকুলতা আর ব্যাকুলতা-–এসো বাইরে। ঘরে তালা দিতে হবে।
হু মৃদু হাসিটা মহেন্দ্রর মুখে লেগেই আছে, বেরিয়ে এলো। মহেন্দ্র তালা দিল ঘরে, তারপর চলতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে। মাধুরী বললো–
আকুলতা আর ব্যাকুরতার পর? বললো, শেষ কর তোমার কথা–
ওর আর শেষ নাই মাধুরী, ওটা অশেষ, অনন্তকাল থেকে ওরা এই ভাবে আছে, ওদের মিলনের আকুতিতেই মহামিলনের যন্ত্র ধ্বনিত হয়।
গাড়িতে উঠলো দু’জনে। মাধুরী কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল, আর মহেন্দ্র নির্বাক। ফেরা বেলায় মেসের দরজায় নামবার সময় মহেন্দ্র বললো। আমাকে দিনকতক একটু বেশি। করে পড়তে হবে মাধুরী একটা বড় কিছু লিখতে চাই।
বেশ তো পড়, ভাল করে খাবে আর রাত জেগে না।
মাধুরী চলে গেল, মহেন্দ্র দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, বাষ্প যতক্ষন বাষ্প থাকে ততক্ষণ ভেসে থাকে আকাশে, কিন্তু শীতলতার সান্নিধ্যে এলেই তাকে পড়তে হয় এসে সে সবুজ ঘাসে তা তপ্ত বালিতেও তো সে পড়তে পারে–
মাধুরী বায়না নিয়েছে, বাড়িতে তার অসুবিধা হচ্ছে অতএব যে কোন মেয়ে হোষ্টেলে গিয়ে থাকবে। কিন্তু বাড়িতে কেউ এই আনন্দ প্রতীমাকে বোডিং এ বিসর্জন দিতে চায় না। মাধুরীর বক্তব্য হচ্ছে যে ছোটদার বিয়ে আসন্ন ছোট বৌদি আসবে। কিন্তু মাধুরীর সঙ্গে তার বনিবনাও হবে না।
কেন হবে না? সব দাদা আর বৌদিরা ওকে ঘিরে প্রশ্ন করলো।
কারণ সে ধনীর একমাত্র সুন্দরী সঙ্গীতজ্ঞা মেয়ে।
তুই ধনীর সুন্দরী মেয়ে এ বাড়িতে একমাত্র মেয়ে আর সঙ্গীতজ্ঞা।
শোন ভাই ছোটদা, মাধুরী বললো, আমার যেন মনে হচ্ছে ওর সঙ্গে আমার কিছুতেই মিলবে না। কেন অনর্থক অশান্তি–
শোন ছোটদি, রতীন বললো, তোর সঙ্গে যার মিল না হবে, এ বাড়িতে তার জায়গা। হবে না তা সে লক্ষ্ণৌঠুংরি হোক আর মাদ্রাজ কথাকলিই হোক।
এ বিয়ে বন্ধ করে দাও বড়দা মাধুরীকে চাইবে, সে আসবে বৌ হয়ে–সবাই পরস্পরের মুখপানে তাকালো। মাধুরী হেসে বললো–
বেশ আসুক সেই লক্ষ্ণৌঠুংরী তারপর দেখা যাবে।
ওর সম্বন্ধে কেন তোর এত ভয় মাধুরী। রতীন প্রশ্ন করলো–
ভয় নাই ছোট দা, ভাবনা, ওর সেতারের ঢাকনাটার মধ্যে আড়াই হাজার মণি মুক্তা আছে–ওর বাগানের গোলাপ নাকি ছয় ইঞ্চি চওড়া হয়।
মেজবৌদি হেসে পালিয়ে গেল। বড়বৌদি হাসছে, কিন্তু মাধুরী তেমনি গম্ভীর। বললো হাসছো কি? ওকে ঘরে এনে পোষা বিলেতী কুকুর পোষার থেকে বেশি। তোর জন্যে একগাছা শেকল আর একটা চাবুক এনে দেব, তুই যথেষ্ঠ ব্যবহার করিস তার সঙ্গে বলে চলে যাচ্ছে ছোটদা আবার ফিলে বলল।
শোন মাধু এই পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যার জন্যে তোকে আমরা পর করতে পারি। তোকে যে সইতে পারবে না আমরা কেউ তাকে সইবো না, চলে গেল রতীন।
অতঃপর ব্যাপারটা এইখানেই ইতি হয়ে যেতো হোষ্টেলে যাওয়া হতো না মাধুরীর, কিন্তু বলে রাখলো, দরকার বোধ করলে সে যাবে। আগামী সাতই মাঘ রতীনে বিয়ে। শীতকালে লক্ষৌ এ বিয়ে দিতে যাবার ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই যেতে পারলো না। মহেন্দ্র গেল না। যথাকালে রতীন বিয়ে করে ফিরলো। বৌভাতের রাত্রে মাধুরী আবার মেসশুদ্ধ সকলকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়ে দিল কিন্তু সে এখন কম আসে মেসে। দু’এক শনিবার বাদ যায়। মেসের একজন সেদিন প্রশ্ন করলো–
আপনি আজকাল আর যান না বড়?
সামনে পরীক্ষা বলে কাটিয়ে দিল মাধুরী।
মাধুরী খেয়ে এসে বললো ভাগ্যিস মহীন এখানে এসেছির, তাই মধ্যে মধ্যে ভাল ভোজ জোটে ওদের।
৬. মাধুরী নিজের পড়াশুনা নিয়ে
মাধুরী নিজের পড়াশুনা নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যেন। প্রতি শনিবার মহেন্দ্রের মেসে আসা আর হয়ে উঠে না, ফোন করে মহেন্দ্রকে অফিসেই জানিয়ে দেয় কোন। একটা নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে। মাধুরী সেখানে যায়। দু’জনায় কোনো ভাল রেষ্টুরেন্টে খায়, কিছুক্ষণ বেড়ায়, তারপর মহীনকে মেসের গলির মোড়ে নামিয়ে দিয়ে মাধুরী বাড়ি ফেরে। মেসের বাবুরা শনিবার তার অপেক্ষায় বসে হয়রান হয়ে এখন আশা ছেড়ে দিয়েছে। কেন যে মাধুরী মেসে আসে না মহীনও জানে না। এমন কি মাসখানে হতে মাধুরী দুটো শনিবার মহীনের সঙ্গে দেখাই করলো না। হল কি ওর? মহীন চিন্তিত হচ্ছে, কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করতে ওর কেমন যেন বাধে।
