একটানা কথা বলে চলেছে মাধুরী, হাতের বাস্কেট থেকে ফলগুলো সাজিয়ে রাখছে। টিপটের লিকারটা বাইরে ফেলে দিয়ে এল তারপর আবার বললো–
বাজার করতে দেরী হয়ে গেল–তা অত, রাগবার কি হয়েছে?
রাগিনী মাধুরী, মহেন্দ্র হাসতে হাসতে বললো।
তবে কি অভিমান না অনুরাগ? হাসছে মাধুরী।
তোমার ভাষাটা একটু সংযত করলে ভাল হয় মাধুরী–
ও, আচ্ছা। চুপ করে থাকার প্রতিযোগিতা চলুক। মাধুরী ঘরটা নিঃশব্দে গোছাতে লাগলো। মহেন্দ্র উঠে কাপড় ছাড়লো, এবং একটা সবেদা খেতে খেতে বললো–কোথায় যেতে হবে?
তুমি হাসলে–চলো বেরোও। দরজায় তালা দিল মাধুরী।
মেসের বাবুর দল ভিড় করেছে, মাধুরী বললো ওদের মধ্যে বয়েজ্যেষ্ঠকে কাল আমি খাওয়াব আপনারা কোথায় খাবেন বলুন? কি খাবেন?
যেখানে ইচ্ছে। যা দেবেন তাই খাব।
বেশ আমাদের বাড়িতে খাবেন সব, আমি বাস রিজার্ভ করে আপনাদের নিয়ে যাব কাল রাত্রে ঠিক রইল তাহলে–
যে আজ্ঞে খুব আনন্দের কথা—
ঠাকুর চাকর সবাইকে যেতে হবে। আচ্ছা নমস্কার।
চলে এল মাধুরী, গাড়িতে উঠলো মহীনকে নিয়ে। মহেন্দ্র এতক্ষণে বলল। ওদের কেন খাওয়াবে মাধুরী?
একদিন ওরা একটু ভাল খাবে মহীনদা।
ওদের উপরে তোমার এই সহানুভূতির মানে বুঝতে পারছিনে—
ওর তোমায় ভালবাসে কিনা তাই। হাসলে মাধুরী নঃশব্দে।
মহেন্দ্র আর কিছু বললো না, অথবা বলতে পারলো না। দু’জনে চৌরঙ্গীর বড় একটা দোকানে ঢুকে গেল, নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ালো দীর্ঘ পথ গড়ের মাঠে, কিন্তু আশ্চর্য, কেউ কোন কথা বললো না। ওর বাক্য স্ত্রীতে যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে। নদী যেমন সমুদ্রে এসে মিশেছে, স্থির শান্ত, গভীর সমুদ্র। রাত নটা নাগাদ মহেন্দ্রকে মেসের দরজায় নামিয়ে বললো–চুপ করে থাকার প্রতিযোগিতায় এবার আমিই হেরে গেলাম মহীনদা–
মহীন তাকিয়ে রইলো গাড়ির ভেতর বসে থাকা মাধুরীর পানে, গাড়িটা চলে যাচ্ছে, মহেন্দ্র মনে মনে আবৃত্তি করলো–
এতো মালা নয় নয়গো–এ যে তোমার তরবারি—
ক্লান্ত পদে নিজের ঘরে এসে মহেন্দ্র কোন রকমে কোটখানা খুলে শুয়ে পড়লো। খেয়ে এসেছে, আর কিছু খাবে না ও। কিন্তু ওর সমস্ত হৃদয় মন জুড়ে যে মাধুরীর রাগিনী বেজে চলেছে, তার অসহনীয় আনন্দ ও ধরতে পারছে না। একি সুখ। নাকি বেদনা, কে জানে!
সকালেই ঘুম ভাঙ্গলো চোখ মেলে মহেন্দ্র দেখতে পেল, মেসের বাবুর দল তার। জানালায় দাঁড়িয়ে ডাকছে–অনেক বেলা হয়েছে স্যার, উঠুন না। দরজা খুলে বাইরে আসতেই ওরা সমস্বরে প্রশ্ন করলো–
বাস কটায় আসবে।
তাতো জানি না সন্ধ্যা নাগাদ আসবে হয়তো।
আপনি জানেন না সে কি! অবাক হয়ে গেল বাবুর দল, কিন্তু মহেন্দ্র ওদের কেমন করে বোঝাবে যে সে সত্যি জানে না। মুখে জল দিতে দিতে বললো–
বাস ঠিক সময় আসবে ও ব্যবস্থায় কোন ভুল হয় না।
বাবুরা আর কোন কিছু শুধোলো না, মহেন্দ্র অতঃপর কি যে করবে, ভেবে পাচ্ছে না, নিজের সম্বন্ধে মহীনের ভয় লাগছে, অহেতুক ভয় না হেতু কিছু আছে, কি সেটা। মহেন্দ্র যেন ইচ্ছা করেই ভাবতে চাইছে না, সেটা কি। অত খানা পাবার যোগ্যতা নাই ওর, প্রত্যাশা ও নাই কিন্তু মানুষের মন এমন আশ্চর্য পদার্থে গঠিত যে, মনের অজ্ঞাত আশাকে অকস্মাৎ সামনে দেখলে চমকে উঠে অথচ ওটা তারই মনের কথা। মহেন্দ্রের ঠিক সেই অবস্থা। কিন্তু মানুষের মনের সত্য অনেক আছে, যাতে সচেতন মনের স্বাক্ষর দিতে সে ভয়–মাত্র এড়িয়ে যায়, অগ্রাহ্য করে–
এই কয়েকদিন মহেন্দ্ৰ দুখানা গল্প লিখেছে একটি উপন্যাসও লিখতে শুরু করেছে, আর কিছু টাকা যোগাড় করে দাদাকে পাঠিয়েছে, যদি সে টাকা অতি সামান্য মাত্র কুড়ি টাকা।
কিন্তু টাকা সে রোজগার করতে পারবে তার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। মাইনের টাকা কয়টা ছাড়াও রোজগার ওর কম হবে না। যুদ্ধের বাজারে বাংলা বইয়ের কাটতি বেড়েছে। এবং আজ লেখকের আদর যথেষ্ট! গল্প লিখে টাকা এর পূর্বে কম লোকই অর্জন করেছে। লেখক হিসাবে নাম করে ফেলতে পারলে চাকরি হয়তো ছেড়েই দেবে মহেন্দ্র, কিন্তু জীবনের একটা জটিলতা ওকে অতিষ্ট করে তুলেছে এখানে সে অসহায়।
ঠিক সময় বাস এলো এবং মেসের মেম্বারদের তুলে নিল। খালি বাড়ি পাহারা দেবার জন্যে মাধুরী দুজন গুর্খা দারোয়ান পর্যন্ত পাঠিয়ে দিয়েছে। চমৎকার ব্যবস্থা ওর মহীনকে নিয়ে সবাই হৈ হুল্লা করতে করতে গিয়ে পৌঁছিল। অভ্যর্থনা করলেন স্বয়ং উমেশবাবু এবং মাধুরী।
মাধুরী ওদের আনন্দের জন্য প্রচুর ব্যবস্থা করে রেখেছে। নৃত্যনাট্য, মুক অভিনয় এবং ম্যাজিক দেখালো বেশ কয়েকজন বান্ধবীকে নিয়ে তারপর খাইয়ে দিল সবাইকে এবং ফেরবার সময় প্রত্যেককে দিল একগোছা করে রজনীগন্ধা ফুল। নমস্কার করে বললো সকলকে–
অতিথি হিসেবে আপনাদের তো ডাকিনী আমি আত্মীয় ভেবেই ডেকেছি। সুযোগ পেলে আবার ডাকবো আসবেন তো?
নিশ্চয় একসঙ্গে সবাই বললো ওরা তারপর শুধালো–
আমাদের ওখানে আপনি কবে খাবেন?
যে কোনদিন সুবিধে মত খাব গিয়ে। আমি আর ভোজ খেতে যাব না, আপনারা কেমন খান দেখতে যাব। হাসলো মাধুরী।
ওরা সকলে বাসায় ফিরলো, সঙ্গে মহেন্দ্র। মেসের জীবনে এরকম উৎসব কমই ঘটে। এর জন্যে মহেন্দ্রকে ওরা ধন্যবাদ দিচ্ছে।
উর্বশী, উত্তর এবং আরো কয়েকটি পত্রিকায় গল্প লিখেছে মহেন্দ্র। কিন্তু ওতে তার মন ভরে না বড় একটা কিছু করবার ইচ্ছায় কতকগুলি বই কিনে আনলো পুরানো বইয়ের দোকান থেকে, পড়া আরম্ভ করে দিল। পরবর্তী শনিবার মাধুরী যথাসময় এল এবং বইয়ের গাদাটা দেখে বলল–ওতে অনেক রোগ জীবানু থাকে মহীনদা।
