ঈশ্বর মানুষকে স্বর দিয়েছেন ভাষা দিয়েছেন সে কি চুপ করে থাকার জন্য? না, তার জন্যই তো প্রতিযোগিতা চালানো হচ্ছে। কে কতক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে দেখা যাক আরম্ভ হোল ওয়ান, টু থ্রী।
এক মিনিট এর কি পুরস্কার? বরুণ প্রশ্ন করলো।
এক মাত্র পুরস্কার, যিনি জয়ী হবে, তাকে এই মালা দান করবো বলে মাধুরী আঁচল থেকে একরাশ জাপানী চন্দ্র মল্লিকা বের করে টেবিলে রাখলো তারপর সুচ সুতো বের করে একটা ফুল নিয়ে গাঁথতে গাঁথতে বললো, আরম্ভ হোক ওয়ান, টু থ্রী–
মেজবৌদি, হাসছে বড়বৌদিও, কুমার এবং মেজদাও হাসছে কাণ্ড দেখে কিন্তু বরুণবাবু নিতান্তই নবাগত, বিশেষ এখনো কিছু জানে না। মাধুরী সম্বন্ধে। ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল বেচারা। কিন্তু চুপ করে আছে সবাই। একটা ঘরে চার পাঁচজন লোক অথচ কারো মুখে কথা নেই এ যে কী অবস্থা তা বর্ণনাতীত। কিন্তু মাধুরীর মালার প্রতি লোভ ওদের তিনজনেরই সমান অতএব কথাও কেউ কইছে না। মেজবৌ বললো মালাটা গাঁথা শেষ পর্যন্ত তো কমপিটিশান?
মাধুরী জবাব দিল না, শুধু সামনের কাগজে পেন্সিল দিয়ে লিখলো মেজবৌদি আউট। লেখাটা পড়ে মেজবৌ বললো–বাপরে। বাচলাম কথা না করে কি মানুষ থাকতে পারে?
যা বলেছ বলে মেজদাও কথা কইল, সঙ্গে সঙ্গে মাধুরী লিখলো মেজদা আউট। ওরা দেখলো এবং চলে যাচ্ছে দু’জনেই। এখন আছে সুশীল কুমার বরুণ এবং মাধুরী–এই সময় এলো মহেন্দ্র। সে কিছুই জানে না কিন্তু মেজবৌদি জানিয়ে দিল
কথা বলো না। ঠাকুরপো এখানে চুপ থাকার কমপিটিশন চলছে। যে জয়ী হবে। মাধু তাকে ঐ মালাটা দেবে দেখ যদি পারতো।
ওর উদ্দেশ্য তো ভাল না বৌদি। মহেন্দ্র গম্ভীর কণ্ঠে বললো ও চায় যার গলায় ও মালা দেবে সে চিরদিন চুপ করেই থাকবে তার নি। বলবার অধিকার থাকবে না এরকম প্রতিযোগিতায় যোগদান আহাম্মকি ছাড়া কি আর–
ঠিক। আমি উইথড্র করছি বলে সুশীল চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো।
আমিও। এমন একটা সাংঘাতিক কৌশল ওর মধ্যে আছে, কে জানতো। বরুণ। উঠলো। রিয়েলি, এ প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়া আহাম্মকি বলে কুমার আসন ত্যাগ করলো।
মাধুরীর মালা গাঁথা প্রায় শেষ হয়েছে। ধীরে ধীরে পেন্সিল দিয়ে সবার সামনে পাশে লিখলো আউট, আউট, তারপর মালার সুলতায় প্যাঁচ দিয়ে বললো আমি জয়ী হয়েছি অতএব আমার মালা আমিই পরলাম, চলে যাচ্ছে মাধুরী। আমরা তো যোগ দিলাম না প্রতিযোগিতায় বললো বরুণ।
নিশ্চয়ই দিয়েছিলেন, মহীনদা না বুদ্ধি দিলে দুপুররাত পর্যন্ত আপনাদের বোবা বানিয়ে রাখতাম।
কিন্তু মালা তো গাঁথা শেষ হয়েছিল কুমার বললো।
ও মালা কোনদিন গাঁথা শেষ হতে না সারা জীবন গাঁথাই চলতো চলে গেল মাধুরী। তিনজন প্রতিযোগিই পরিস্কার বুঝলো মাধুরী ওদের কারো হবে না।
মহেন্দ্র আজ এখানে বিশেষ একটা স্থান লাভ করল এমন কি কুমারের কাছেও ওর বুদ্ধি এবং বিনয় ব্যবহার সকলেরই প্রশংসা অর্জন করে কিন্তু কোথায় মাধুরী? রাত্রি এগারোটা পর্যন্ত গান গল্প খাওয়া সেরে মেসে ফেরার সময় মহেন্দ্র তাকে দেখতে পেল না অবশ্য কাউকে ওর কথা জিজ্ঞাসাও করেনি সে। মেসে ফিরে এলো এবং শুলো।
সোমবার থেকে সমস্ত সপ্তাহ যথারীতি অফিস করলো মহেন্দ্র মাধুরীর কোন খবর এল। ফোন করে অবশ্য সে খবর জানতে পারতো, কিন্তু কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ হয়। কেন এ সঙ্কোচ মহেন্দ্র নিজেই যেন ঠিক বুঝতে পারে না। মাধুরী কেন ফোন করলো না এই কয়দিন?
ভেবে দেখলো সেদিন বিকালে মাধুরী মেসে বসেছিল ওর সঙ্গে খাবে বলে ছিল, খায়নি। সেদিন অকস্মাৎ চলে গেছে এবং তারপর থেকেই মহেন্দ্রের সঙ্গে মাধুরীর আর কথা হয়নি? সেদিন কি কথা হয়েছিল মনে করতে চেষ্টা করল মহেন্দ্র ঠিকঠাক মনে পড়ে না কিন্তু কোন রকম ঝগড়ার কথা তো হয়নি এবং সেদিনই মহেন্দ্ৰ সন্ধ্যায় গিয়েছিল ওখানে।
আজ আবার শনিবার হয়তো মাধুরী আজ আসবে, নিশ্চয় আসবে, ভাবতে ভাবতে মহেন্দ্র অফিসে কাজ শেষ করে মেসে ফিরছে। তার একটু দেরী হল, হয়তো ইচ্ছে করেই দেরী করলো মহেন্দ্র। মাধুরী এসে তার ঘরে অপেক্ষা করবে আশায় কিন্তু পৌঁছে দেখলো মাধুরী আসেনি।
মেসের অন্যান্য মেম্বারের অবস্থা দেখে কিন্তু মহেন্দ্র অনুভুতিশীল অন্তরে একটা ঝঙ্কার উঠলো আহা বেচারা! দেখলো, ওদের প্রায় সকলেই যথাসাধ্য যত্নে সাজ পোশাক পরছে। কেউ দাড়ি কামাচ্ছে, কেউ বা তার সব থেকে ভাল জামা কাপড় পরে এদিক ওদিক ঘুরছে। আর কেউ বা আগে ভালো ভাবে নিজেকে সজ্জিত করে গুণ গুণ করে গান ধরেছে, কিন্তু। সবাই যে, মাধুরীর আসার প্রতীক্ষায় এটা বুঝিতে কিছুই দেরী হয় না। মহেন্দ্র হাসলো মনে মনে। নিজের ঘরে এসে দেখলো মাধুরীর কোকো, ওভালটিন, দুধ এখনো প্রচুর রয়েছে, খেলেই হয় কিন্তু কেমন যেন অভিমান জাগলো অন্তরে। অতগুলো খাবার জমা করে রেখে গেলেই কি যথেষ্ট হোল? থাক মহেন্দ্র খাবে না ওসব।
উনি কি আসবে না আজ? প্রশ্ন করলো অনিল নামে একজন তরুণ মেম্বার। কে? মাধুরী। হ্যাঁ।
কি জানি হয়তো আসবেন না। মহীন উত্তর দিল। চেয়ে দেখলো এবং অন্য সকলের মুখের ভাব করুণ বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে।
অনিল বললো, আপনি যাবেন তাহলে?
না আমার ও তো যাবার কিছু কথা নেই, বলে মহীন গরম জলে চা ছেড়ে দিল। ঘেরাটোপরে সেতারখানা এক কোণে রয়েছে, এইটাকে নিয়েই সেদিনকার কথা মনে পড়লো মহিনের। অন্য দিন সে সন্ধ্যায় বাজায় ওটা, আজও হয়তো বাজাতো কিন্তু কেমন যেন অনিচ্ছা জাগছে, ঐ সেতারটায় আঙ্গুল বুলিয়ে যাবার এক উদগ্র ক্ষুধা ওকে পেয়ে বসেছে। হাত বাড়ালো ওটা নিতে কিন্তু তখনি হাত সরিয়ে নিল, না ওটাকে ছোবে না মহেন্দ্র। কেমন একটা অবসাদ পেয়ে বসেছে, না কেমন জ্বর, একটা জ্বালা যেন না কেমন একটা কান্নার ঢেউ বুকে ঠেলে উঠতে চায়, মহেন্দ্র মাধুরীর আনা নরম জোড়া বালিশে মাথা গুজলো। ওঠো মহীনদা ওঠো মহীনদা। স্নেহ সজল সুকোমল কণ্ঠে ঝংকার, কতক্ষণ চা ছেড়েছ। এ্যা। এ আর খাওয়া যাবে না, ঠাণ্ডা জল হয়ে গেছে। নাও, কাপড় পর, বাইরে গিয়ে চা খাব ওঠো ওঠো ওঠো—
