হলো কি স্যার?
কিছু না, বলে মহেন্দ্র তার ভাগের বাটিটা তুলে নিয়ে আবার ভেতরে গেল। মাধুরী একটা চামচ দিয়ে কতটা তুলে নিয়ে নিজের মুখে নিয়ে বললো খোকনের অকল্যাণ করো না, মহীনদা খাও।
আর কিছু বলতে হলো না, মহীন নিঃশব্দে খেতে লাগলো এবং মাধুরীও দু’চার চামচ খেল ওর সঙ্গে। বাইরে বসা বাবুরা দেখলো ওদের এক বাটিতে খাওয়া এর পর ঝালটা যে কোথায় গিয়ে ছাড়াবে, আন্দাজ করতে পারছি না। কিন্তু কি যায় আসে?
তোমার মেসে আজ ভাল রান্না হচ্ছে দেখে এলাম, মাধুরী বললো—
হ্যাঁ রবিবার কিছু উন্নত খাদ্য হয় উত্তরে বললো মহেন্দ্র।
বেশ আমিও খাবো এখানে, বলে দিও ঠাকুরকে।
তুমি। কেন! তুমি কেন খাবে এখানে মাধুরী।
আমার খুশী খাব! বলে মাধুরী চুপ করে রইলো, একটুক্ষণ পরে বললো তুমি যেখানে খাও সেখানে আমিও খেতে পারি থাকতে পারি এইটুকু জানাতে, মাধুরীর কণ্ঠস্বর গভীর এবং দৃষ্টি বাইরের দিকে।
মাধুরী মহেন্দ্র, কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল।
বলো–প্রশ্ন করলো মাধুরী।
কিন্তু মহেন্দ্র কিছুই বলতে পারলো না। নিঃশব্দে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলো, মাধুরী ইতিমধ্যে ঘরখানা পরিষ্কার করে সব গোছালো। কয়েকটা নতুন আনা জিনিস রাখলো, বিছানাটা ঝেড়ে পেতে ঠিক করলো। এখানে বাবুদের ক্ষুধিত দৃষ্টির সম্মুখে খাওয়া যাবে না। মহীনদা আধপেটা থাকতে আমার ইচ্ছে নেই। বাড়ি যাচ্ছি, তুমি বিকালে যেও রাত্রে ওখানে খাবে। মহেন্দ্রকে কোন কথা বলার অবকাশ না দিয়েই মাধুরী তর তর করে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। নীচের তলায় দু’তিনজন বাবু তাদের একজন বললো, চলে যাচ্ছেন যে! খাবেন বলেছিলেন–
না, আজ আর হলো না? খাব আর খাওয়াব, আপনারা যেদিন সুবিধে, দিন ঠিক করবেন, নমস্কার মাধুরী গাড়িতে উঠলো গিয়ে।
মেসের বাবুদের সে খাওয়াবে, এ অত্যন্ত সুসংবাদ তাদের কাছে, কথাটা তৎক্ষণাৎ প্রচারিত হয়ে গেল সকলের কাছেই শুধু মহেন্দ্র জানালো না, কারণ ও নিশ্চয় জানে ভেবে কেউ ওকে জানাতে আসেনি।
মহেন্দ্র বসেই আছে কত দীর্ঘক্ষণ ও জানে না।
ও বাড়ির কেউ চায়নি যে মহেন্দ্র অন্যত্র গিয়ে চাকরি নেবে কিন্তু কার্যত যখন তাই। ঘটলো, তখন দেখা গেল যে বাড়ির সকলেই কিছু ক্ষুণ্ণ হয়েছে অথচ সর্বস্তরে ও করছে, মহেন্দ্রকে নিজের অফিসে চাকরি দিতে ভরসা করছিল না ওরা এবং মহেন্দ্রও কোনদিন মুখ ফুটে বলেনি সে কথা। বললে অবশ্য ব্যাপারটা কিছু সহজ হতো, কিন্তু মহেন্দ্র যখন নিজেই। চাকরি যোগাড় করে চলে গেল তখন ক্ষুণ্ণ হওয়া ছাড়া আর কিছুই ওদের করবার রইল না। কিন্তু মহেন্দ্র জানে এই ক্ষুণ্ণতেই মানুষের ম র্যাদা বাড়ে।
মহেন্দ্র চলে যাওয়ার পর বাড়ির সকলেই দৃষ্টি পড়লো মাধুরীর উপর। এই দুই আড়াই মাসে মাধুরী যেন অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে। যেন সে মাধুরী পরিবর্তিত হয়ে গেছে, সাগর তরঙ্গিনীর মত অচপল, স্থির সে।
বড়বৌদির, ভাই বরুণ এসছে গত সন্ধ্যায়, জমিদারের ছেলে, বিলাত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকার বড় অফিসার। সকালেই তার সঙ্গে মাধুরীর দেখা হবার কথা কিন্তু মাধুরী বেরিয়ে গিয়েছিল। কোথায়? ফিরে এলো বেলা এগারোটা নাগাদ এবং এসেই নিজের ঘরে ঢুকলো। বড়বৌদি আন্দাজ করেছে মাধুরী গিয়েছিল মহীনের মেসে, কিন্তু বাড়ি ফিরে সে নিশ্চয়ই বরুণের সঙ্গে আলাপাদি করবে, এই আশা সবাই করছিল। কিন্তু দেখা গেল, মাধুরী বেরুলোই না। নিজের ঘরেই বসে। এরকম কাজ ও কখনো করে না কিন্তু। অবশেষে বড়বৌদি এসে প্রশ্ন করল। তো হোল কিরে ছোড়দি? সারাদিন বেরুসনি?
সকালেই তো আড়াই গ্যালন পেট্টল পুড়িয়ে এলাম বৌদি।
হ্যাঁ–তবে বাড়ির কেউ তোকে দেখেনি আজ।
কেউ মানে থেমে গেল মাধুরী তারপর বললো সন্ধ্যায় একটা আসর করব তখন দেখা হবে। যখন যা তা বেশে কি আর সবার সামনে বেরুনো যায় বৌদি? তাছাড়া তোমার ভাইটি বিলেতী আপেল, দেশী পেয়ারা হলেও বা কথা ছিল হেসে ফেললো মাধুরী। আপেল খুব মূল্যবান ফল জানিস।
নিশ্চয় আমি কি বলছি যে তিনি আম?
আম হলে যখন তখন দেখা করতিস?।
অবশ্য কারণ আমের বোল থেকে আটির খেট্ট পর্যন্ত আপন। আপেলের সঙ্গে পরিচয় করতে সময় লাগে বেশি, কিছু মনে করো না ভাই হাসলো মাধুরী। না বোনটি, মনে কি করবো? তুই আপেল আতা, আনারস, আম যা ইচ্ছে নে, তোকে সুখী দেখলেই আমার আনন্দ, বড় বৌদি সস্নেহে ওর মাথায় হাত দিল। তাহলে নিশ্চিত থাক আমি সুখী হবোই।
অতঃপর বড়বৌদি চলে গেল, জেনে গেল যে সন্ধ্যায় মাধুরী গানের আসর বসাবে এবং যেখানে বরুণের সঙ্গে ওর দেখা হবে। বরুণ বড়বৌদির ছোট ভাই। মাধুরী তাকে জীবন সাথী রূপে গ্রহণ করলে খুবই খুশি হয় বড়বৌদি, কিন্তু মাধুরী সে কাজ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলে তবে তো। বিশেষ কোন আশা করে না বড়বৌদি ও সম্বন্ধে–কারণ মাধুরীর মনের গঠন ওর জানা। সেইজন্যে নিজে প্রত্যক্ষভাবে বলেওনি কোন কথা। তবু অন্তরে একটা সুপ্ত আশা। জেগে আছে, যদি হয় তো ভাল হয়। মেজবৌদি বোম্বাই থেকে ফিরেছে পরশু, আজ বোধ। হয় কুমারও আসবে এখানে অতএব যা হোক একটা কিছু স্থির হতে পারে ভেবে বড়বৌদি নিজের কাজে আত্মনিয়োগ করলো।
সন্ধ্যায় কিন্তু সঙ্গীতের আসর বসালো না মাধুরী সাহিত্যেরও না। ভালো রকম সাজপোশাক করে টয়লেট সেরে দাদাদের কাছে এসে নমস্কার করলো বরুণাবাবুকে। কুমার সুশীল এবং মেজবৌদিও ছিল ওখানে। বড়বৌদি ওদের চা দিচ্ছে এই আমাদের ছোড়দি, বললো বরুণ। মাধুরী হাত জোড় করেই ছিল, আবার কপালে ঠেকালো! আজ কি প্রোগ্রামঃ প্রশ্ন করলো কুমার বাহাদুর। চুপ করে থাকার প্রতিযোগিতা মাধুরী জবাব না দিয়ে চুপ করে বসলো।
