নয়টার পর, বললো মহেন্দ্র। চাকরটা চলে গেল।
মাধুরীর এই মাতৃরূপ এই স্নেহশীল অন্তরটায় আবগাহন করতে চাইল মহেন্দ্রঃ দরিদ্র দীনাতিদীন এক পল্লী যুবকের প্রতি অহেতুক করুণায় বিগলিত হৃদয় একটি তরুণীর স্নেহসজল মাতৃত্বের অভিব্যক্তি ভগ্নিত্বের প্রকাশ এর বেশী নয় না, না এ বেশী কিছু নয় আর।
শীতের রোদপোহাতে মেম্বারদের অনেকে ছাদে উঠেছে, বসলো সব রোদে আজ ওদের বেগুন পোড়া মুড়ি খাওয়া হবে আনন্দে চোখে জল আসছে। এতো দুঃখের জীবনকে এমন সুখের করতে পারে এই মেসের লোক না দেখলে বোঝা যায় না। অতি সামান্য কিছুকে ওরা। অসামান্য করে গ্রহণ করে না হলে ওরা বাঁচতে পারতো না। তাই মাধুরীর আবির্ভাব ওদের। সরল সতেজ করে তুলছে এবং যাকে অবলম্বন করে মাধুরী আসে সেই মহেন্দ্র এক বিশেষ। ব্যক্তি ওদের কাছে।
আজ আসবে নাকি! অনিলবাবু প্রশ্ন করলো।
কে? মহেন্দ্র কথাটা বুঝেও যেন বুঝেনি, এইভাবে প্রশ্ন করলো।
ঐ যে, আসে সেই মেয়েটি?
নাও আসতে পারে, বলে মহেন্দ্ৰ কথা কটিয়ে দিতে চায় কিন্তু সতীনাথ বলল, মেসের জীবনের নিরামিশ আমরা, বাঁশপাতা চিবুই, কিন্তু আমাদের মাংসের দর বাজারে দিন দিন চড়েছে। মন্টা পাঁচটাকা সের আজকাল সবাই হাসলো, কিন্তু কথাটার অন্তর্নিহিত রস উপলব্ধি করতে সময় লাগে। সতীনাথ খুব বুদ্ধিমান ছেলে, ওর কথার ধরন কতকটা হেয়ালির মত কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সেই মহীন ঠিকই বুঝলো–ও সেগুলোকে পোলটি ফার্মে পালন করা হয়, মেসের গোয়ালে নয়। সবাই আরেক চোট হাসলো, এবং এই হাসাহাসির মধ্যে একজন বললো, ওরা কিন্তু জবাই করে।
ক্ষতি কি? গলায় দড়ি নিয়ে মরা আর জলে ডুবে মরার তফাৎ নেই।
বেশী আছে হে, তফাৎ আছে জলে ডুবতে যেতে হয় নদীতে, গলায় দড়িটা আমাদের ঘরেই জুটেছে, বললো সতীনাথ, দড়িটা সিল্কের বড় সরু আর শক্ত।
তাতে কি ক্ষতি? বললো একজন।
না, ক্ষতি নাই, লাভ, অনেকগুলো ঘাড় লটকানো যাবে তোমার আমার ওর।
এইসব তরল হাস্য পরিহাসে কিন্তু মহেন্দ্রর ওর মন তখন কোন সুদূর স্বপ্নের রাজ্যের বিচরণশীল। অনুভুতির তীব্র আলোকে অন্তরের কোন গোপন প্রকোষ্ঠ অবলোকন করতে চায়। মহেন্দ্র চুপচাপ বসে রইলো। অথচ ওকে দিয়েই এতগুলি লোক জটলা করছে।
মুড়ি বেগুন–পোড়া এসে গেল, ছুটির দিনের প্রাতঃকালনি জল খাবার। সবাই চিল শকুনীর মত পড়লো, সে যার ভাগে বেশী টানতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য মহেন্দ্র বসে থাকলেও দেখা গেল, সকলেই তার ভাগটা ঠিক করে ওর কাছে এনে দিল, এই যে মহীন বাবু আসুন।
এই সহানুভুতি সোনার কাঠি রয়েছে মাধুরীর চরণধ্বনিতে। এই ধুলি মলিন মেসবাড়ির হাওয়ার আর আলোতে ভরা দিব্য দুতি। মহেন্দ্র হাসলো একটু আপন মনে মুড়ির বাটিটা হাতে করে নিল।
আমি খাবো কাকু আহা কোথায় যেন ক্রন্দনাতুর বালক। না মহেন্দ্র আর খেতে পারবে না। এতোভাল খাদ্য মাধুরী খাওয়ালো কৈ, কেউ তো তার মনে এমন করে গুঞ্জন করেনি খোকন তো এই দু’মাস কিছু বলেনি তাকেও খাবারগুলো ওর রুচি নাই বুঝি! না ওগুলো বিদেশী খাদ্য, খোকন খেতে শেখেনি, কিন্তু বেগুন পোড়া মুড়ি একান্ত আপনার, খোকন অত্যন্ত ভালবাসে। মহীন মুড়ির বাটি নামিয়ে রাখলো।
কি হলো? খাবেন না?
না, থাক, আমি কথা আর বলতে পারবো না। তাড়াতাড়ি গিয়ে ঘরে ঢুকল মহেন্দ্র কিন্তু মেস মেম্বারগণ অত সহজে ছেড়ে দেবেন না, একজন বললো–
ফারপোহাতে ডিনার খাওয়া অভ্যাস, বেগুন পোড়া রুচবে কেন?
না, না তা নয়, ঐ শ্রীহস্তের পরিবেশন হলে ঠিক করবে!
থাক, থাক অত কথার কি দরকার যুগলবাবু বললেন ওনার রুচি না হয় খাবেন না। তবে অত বড় মানুষী চাল এ মেসে কেন ভাই গ্লান্ডে গেলেই পারতেন।
মহেন্দ্র কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ছবিখানার কাছে পঁড়িয়ে, মহীনকে ওরা অহংকারী ধনীমাত্র ঠাওরেছে কিন্তু মহীনের অন্তর যদি কেউ দেখতে পেত ও মুহর্তে। ছবিখানার পানে চাইল মহেন্দ্র বললো–
ইচ্ছা হয়েছিল মনে মাঝারে—
ছিলি আমায় পুতুল খেলার প্রভাতে শীবপূজার বেলায়।
তোরে আমি ভেঙ্গেছি আর গড়েছি!
ঝর ঝর করে জল পড়ছে মহীনের চোখ থেকে। নিঃশব্দে মাধুরী দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছে ওকে মহীন কিছুই জানতে পারেনি। অকস্মাৎ মাধুরী বললো, মায়ের রূপটা আমার মধ্যে বেশী, না তোমার মধ্যে বেশী মহীনদা।
এসে মহীনের চোখের জলটা মুছে ফেললো।
আমার কথার জবাব দাও।
জানি না মাধুরী।
বিশ্বজোড়া সন্তানদের বেদনার্ত হাহাকার কে জানে কোন পরম জননীর প্রাণকে ব্যথিত করে? কার অন্তরে তিনি বেশী প্রকাশমান কে জানে? কিন্তু তোমার ব্যথাটা খোকনের জন্যই–
না মাধুরী, ওকে অবলম্বন করে পৃথিবীর অগণ্য খোকুখুকুকে দেখি আমি তাদের মা, বাবা কাকার অন্তরকে অনুভব করি, কে কোথায় তার শিশুর মুখে স্বাস্থ্যকর খাদ্য দিয়ে অপরাগ তার বেদনা তুমি বুঝতে পারবে না, মাধুরী।
বুঝতেই পারবো না। বিস্মিত মাধুরী আহত হলো, নাগিনীর মত বেণীটা ঘুরিয়ে বললো, তোমার স্পধ্যা বড় বেশী মহীনদা। পুরুষ হয়ে তুমি বুঝবে আর আমি মেয়ে হয়ে বুঝব না! ভাল বুঝি কিনা একদিন দেখতে পাবে। মাধুরী ঘরের মধ্যে এলো।
বাইরে যারা এতক্ষণ কথা বলছিল, তারা স্তব্ধ হয়ে গেছে, কথাগুলোও শুনেছে, কিন্তু কেউ বিশেষ কিছু বুঝতে পারলো না, মহীন বেরিয়ে এলো। মাধুরী ঘরের মধ্যে কি সব রাখছে সাজিয়ে। মহেন্দ্রের চোখের কোন তখনো ভিজে। প্রকাশবাবু প্রশ্ন করলো অকস্মাৎ
