–আজ্ঞে মাপ করবেন, ওগুলো আমাদের বদ অভ্যাস, তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিল খোসাটা।
শুধরে নেবে, বলে মাধুরী আবার ঘরে ঢুকে নিজের কাজে মন দিল। মহেন্দ্র এসে পড়লো। ও জানে মাধুরী আসবে কাজেই কিছু মাত্র ব্যস্ত না হয়ে নিঃশব্দে জামা কাপড় খুলছে।
নাও শীঘ্রী কাপড় ছাড়া বেরুতে হবে।
–কোথায়?
এত খোঁজে কাজ কি? যা বললাম কর।
মাধুরী ফুলগুলো সাজিয়ে রাখলো, একটা প্লেটে কিছু লেবু আর পেঁপে কেটে মহেন্দ্রর সামনে রেখে দিল। মহেন্দ্র কোট গায়ে দিতে দিতে বললো
–ওটা কি? সেতার?
–হ্যাঁ—
–তোমার নিজের সেতারটাই আনলে মাধুরী?
–নিজেরটাই তো দান করে আনন্দ মহীনদা।
–কিন্তু ওটা তোমার হাতের জিনিস।
: বেশ তো তোমার হাতে বাজবে। মাধুরীর মুখ ফিরালো অন্য দিকে।
: মাধু। মহেন্দ্র গম্ভীরকালো চোখে আনন্দ বিষাদ একসঙ্গে বাম্পময় হয়ে উঠেছে।
: বলো। মাধুরী হেসে তাকালো ওর পানে।
: না কিছু না, সব কথা বলা যায় না মাধুরী।
: থাক, না বলা কথাটা আমার বেশী ভাল লাগে।
মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি, ফলের টুকরোগুলো গিলতে আরম্ভ করছে। সন্দেশটা গেলা যাচ্ছে। মাধুরী হেসে বললো অত তাড়া কেন? আস্তে খাও চাকরী তো আর ছুটে যাবে না।
: না কোথায় যেতে হবে বললে?
: হ্যাঁ, তার দেরী আছে, মাধুরী হাতের ঘড়িটা দেখলো–যাব ‘জ্যু’ দেখতে।
: ‘জ্যু’ কেন? মহেন্দ্র বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো।
: সব কেনোর উত্তর থাকে না মহীনদা চলো। মাধুরী উঠলো। বেরিয়ে গাড়ীতে চড়ে মাধুরী বললো। এ ক’দিন কি লিখলে, শোনাবে এসে আমায়?
তোমাকে শোনাতে আমার ভয় করে মাধুরী?
কেন? কড়া সমালোচনা করি বলে?
হ্যাঁ।
ভালো তো ঢের লোকই বলে থাকে? আমার ভালো না লাগায় কি তোমার বয়ে গেল? মহেন্দ্র একটু চুপ করে রইল, মাধুরীর ভাল না লাগায় কি কার ক্ষতি কি করে বলবে? পরে বলবো–
কে কোথায় ভাল বলে না বলে, আমি তো শুনতে যাইনে, যারা পরিচিত তারা যদি পড়ে ভাল বলে, তবেই না লেখা সার্থক।
ভাল না লাগলেও ভাল বলতে হবে নাকি? আচ্ছা এখন থেকে ঐ রকম খোশামোদের কথাই না হয় বলা যাবে। কিন্তু সে মিছে কথা, এ তোমায় জানিয়ে রাখছি, বলে মাধুরী ওর। মুখপানে একটু চেয়ে বললো আবার, শোন তোমার লেখার প্রশংসা বহু লোক করে, নিন্দেও করে অনেক কিছু তোমার কাছে আমার পরিচিত সবাই বলবে, বেশ লিখেছেন, আমাকে কি তুমি সেই দলে ফেলতে চাও। তা যদি চাও তো তোমার কোন লেখা আর আমায় শুনিও না। আমি না শুনেই বলবো চমৎকার ব্যাখ্যা সাহিত্য দ্বিতীয় নাস্তি। আর যদি আমাকে। তোমার সাহিত্যিক বন্ধু মনে করো তবে কোনটা ভালো লাগলো, তোমার নাই বা বললাম। কোনটা মন্দ লেগেছে এবং কেন মন্দ লেগেছে তাই শুধু আমি বলব। তোমার ক্রটি যদি কিছু থাকে তো সেটা ধরিয়ে দেওয়াতেই আমার স্বার্থকতা।
তাই বলে মাধুরী তবে তোমার ভাষাটা বড় তীক্ষ্ণ। মহীন হাসল।
তীক্ষ্ণ না হলে তোমার খেজুরে কবি বৃদ্ধির রস ঝরে না। কবি আর খে জ্বর গাছ একই পদার্থ, শীতকালে যখন সমস্ত প্রকৃতি জড় হয়ে থাকে, সেই সময় খে জ্বর বুকে ক্ষত করে তার রস ঝরাতে হয়–
মহীন নিঃশব্দে শুনে গেল কথাগুলো। গাড়ীটা সবেগে চলেছে গড়ের মাঠের উপর দিয়ে। সোজা রাস্তা পিচঢালা মাধুরী হেসে বললো–
আমাদের এটা প্রমোদ ভ্রমণ একসঙ্গে মহীনদা।
কেন? প্রয়োজনটা কিসের?
আলোর হাওয়ার, আনন্দের যার অভাবে কেরানি জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? ঠিক কথা। মাধুরী দিনে আলো জ্বেলে অফিসে কাজ করতে হয়, আঠারো ফিট লম্বা ছয়খানা টেবিল, রাশীকৃত কাগজ আর স্তুপাকৃত আবর্জনা। বাড়ি ফিরেও ওদের না আছে আলো না আছে হাওয়া বাংলার মধ্যবিত্ত এই কেরানীগুলো ধ্বংস হতে চলেছে মাধুরী। অশান্তি আর অস্বাস্থ্য ওদের চিরসাথী।
কথাগুলোতে ব্যথা বেদনা যেন মুর্ত হয়ে উঠলো। মাধুরী ওটাকে এড়াবার জন্য বললো। থাক মহীনদা, মানুষের দুঃখের মহাসমুদ্রে তুমি আমি নিতান্ত তুচ্ছ বুদ্ধদ। ওর কোন প্রতিকারই করা সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে।
প্রতিরোধ করার চিন্তাটাও করা ভাল মাধুরী, তোমার আমার মধ্যে তাতে কিছু মনুষ্যত্ব জাগবে।
মাধুরী আর কিছু বললো না।
নিজেকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মহেন্দ্র আতঙ্কিত হয়ে উঠলো, কোথায় সে এ কোন অমৃতসাগরে কিন্তু ওখানে তার ঠাই নাই। কে যেন ঠেলে ওর মত একটা নগণ্য মানুষকে ঊর্ধ্ব আকাশে তুলে দিয়েছে, তাই বলে নিজেকে নক্ষত্র মনে করা ওর দারুণ ভুল হবে। গভীর রাত্রে মাধুরীর আনা সেতারখানা বাজাতে বাজাতে ভাবছিল মহেন্দ্র, এই সেতারে যার পেলব আঙ্গুলের পরশ লেগে আছে, তার স্নেহ তার সহানুভুতি ওর জীবনে অক্ষয় হয়ে রইল, কিন্তু, তারপর?
মহেন্দ্র মধ্যরাত্রে বেহাগ রাগিনী ধরললা–
আমায় কোথায় আনিলি
আনিয়ে তরঙ্গমাঝে তরী ডুবালে—
গানটা শেষ হবার পর মহেন্দ্র বুঝতে পারলো দীর্ঘক্ষণ ধরে ওর চক্ষে জল গড়াচ্ছে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে সেতারখানা রাখলো, তারপর শুয়ে পড়লো। সকালে উঠতে দেরী। হয়েছে, আজ রবিবার, তাড়ার কিছুই নাই কিন্তু দেখতে পেল চাকর ওর জন্যে চায়ের জল গরম করে এনেছে। এরকম কোনদিন হয় না। বললো, কি ব্যাপার, চাইতে চায়ের জল?
আজ্ঞে, কাল দিদিমনি বলে গেছেন, আর বকশিশ দিয়েছেন। বলেছেন আবার দেবেন।
মহেন্দ্ৰ বুঝলো ব্যাপারটা, চা তৈরী করে খাবে, রাম বললো যে আবার জল গরম করে। অভালটিন না হয় কোকো করে দিতে বলেছেন, কখন দেব?
