: কি বলে তাহলে? প্রশ্নটা হাস্যদ্বারা রঞ্জিত।
: পূজা। শান্ত জবাব মহেন্দ্রের কণ্ঠ থেকে।
: পেশ পূজাই, যাও, হাতমুখ ধোও বেরুতে হবে।
: আমাদের পুরোনো এমন অনেক পূজার গল্প আছে মাধুরী, যার তন্ত্রঃ প্রভাব ইষ্ট দেবতা সইতে অক্ষম হয়েছেন–
: তুমি খুব ছোটলোক হয়ে যাচ্ছো মহীনদা, মাধুরী ক্রদ্ধকণ্ঠে বললো, আমার এ পূজা তো নয়ই সেবাও নয়, আমার পিতৃবন্ধুর পুত্রের প্রতি কর্তব্য যাও কাপড় ছাড়–
: কর্তব্য, Stem daughter of the voice of God মাধুরী সে শুষ্ক এতো সরস তো হয় না।
: আমি নারী, কর্তব্যকে সরস করিতে পারি, যাও—
: ওর চোখের কারুণ্য দেখতে পেলো না মাধুরী। মহেন্দ্র নিঃশব্দে কোণার কলে গিয়ে। মুখ হাত পা ধুলো তারপর ঘরে ঢুকে ধূতী পাঞ্জাবী বদলে ফেললো।
মাধুরী ততক্ষণে বইগুলো সেলফে গুছিয়ে রাখছে, পোষাক পরে মহেন্দ্র তৈরী হয়ে বললো এবার কি করতে হবে।
: তুমি বাইরে দাঁড়াও আমি আসছি।
মহেন্দ্র বাইরে ছাদে এসে দাঁড়াল। এখানে মেসের বাবুদের কয়েকজন ইতিমধ্যে উঁকি দিচ্ছে মাধুরীকে দেখার জন্য, মেসের বাবুরা এ সুযোগ কম পায়। কে ঐ মেয়েটি কোত্থেকে আসে মহেন্দ্রের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কি, এই নিয়ে ওকে দেখবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা ওরা করেছে, কিন্তু অতিশয় সাবধান, সরাসরি মহেন্দ্রকে প্রশ্ন করে জেনো নেয়া যায়, কিন্তু মহেন্দ্র এখনো নতুন, তবু আজ একজন জিজ্ঞেস করলো।
উনি কে আপনার? বিশেষ কেউ নিশ্চয়। হাসলো ছোঁকরা!
হ্যাঁ, বলে মহেন্দ্র আর কিছু বললো না। মুখে সামান্য হাসি।
রোমন্সের সুযোগ মেলে কম, ভাগ্যবান মহেন্দ্রের সে সুযোগ পেয়েছে, অতএব তাকে ঘিরে অল্পবয়সী থেকে অধিক বয়সী মেম্বারগণ পর্যন্ত বেশ একটি রোমান্টিক গল্প খাড়া করে নিলেন মনে মনে, কিন্তু মাধুরী তার পূর্বে ঘরে তালা দিয়ে মহেন্দ্রকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
গাড়ীতে চড়ে সটান এলো চৌরঙ্গতে। সেখানে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে বসলো মহেন্দ্রকে নিয়ে। ভাল ভাল কয়েকটা খাবার আনতে আদেশ করলো। মহেন্দ্র আস্তে বললো অত কি হবে।
–খেতে হবে, হেসে বললো মাধুরী ক’দিন যা খাচ্ছ তা বোঝা যাচ্ছে চেহারা খানা দেখেই, নাও খাও, মানুষকে বাঁচতে হবে মহীনদা।
: হ্যাঁ, কিন্তু লক্ষ লোক রেস্তোরাঁয় না খেয়েও বাঁচে মাধুরী ভাল ভাবেই বেঁচে থাকে।
তর্ক করো না মহীনদা, সতর্ক করে দিই তোমায়। আমার ইচ্ছে সপ্তাহে একটা দিন অন্ততঃ দুজন এক জায়গায় বসে খাব।
–মানে আমাকে খাওয়াবে, এই তো!!
হ্যাঁ তাই। মাধুরী রেগে শুধালো, তোমাকে খাওয়াবার আমার অধিকার আছে, বলল নেই।
–আছে, নিশ্চয়ই আছে বলে মহেন্দ্র কথাটাকে জোরালে করলো এবং নিঃশব্দে খেতে লাগলো। ওর মুখের হাসিটা লক্ষ্য করছে মাধুরী। গম্ভীর হয়ে বললো, হাসছো যে।
মানুষ যখন নিজেকে অপরের চোখে দেখে মাধুরী, তখন তার হাসিটা হার মানার হাসি?
ধন্যবাদ। হার মানলে তাহলে। বলে মাধুরীও হাসলো।
এরপর খাওয়া শেষ করে ওরা গেল নিউ এম্পায়ারে শঙ্করের নৃত্য দেখতে, সামনের আসনে বসলো দু’জনে। নৃত্য আরম্ভ হোল। অপূর্ব বাজনা! অনস্বাদিত এক সৌন্দর্য রসের পরিবেশন, কিন্তু কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি লেগে রয়েছে মহেন্দ্রের অন্তরে। মাধুরী শুধালো?
–তোমার ভাল লাগলো না মহীনদা?
–সে কি। একি ভালো না লাগবার বিষয়?
–তবে মুখোনা অত গম্ভীর কেন?
কারণটা ঠিক বুঝতে পারবো না মাধুরী। কোথায় যেন একটু অতৃপ্তি হয়ে গেল, যেন পেলাম না, দেবতা এসেছিলেন, আলো জ্বেলে দেখা হয়নি।
: কেন মহীনদা এরকম কেন মনে হচ্ছে?
: বোঝানো যাবে না মাধুরী। ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয় যখন অতীন্দ্রিয়তে আঘাত করে তখন সে থাকে অনুভূতির কোঠায়, ভাষায় তাকে রূপ দেয়া যায় না?
মাধুরী কথাটা বিশেষ বুঝলো না। নিঃশব্দে মেসের দরজায় মহীনকে নামিয়ে দিয়ে ফিরলো। রাত তখন দশটারও বেশী।
মেসের লোকগুলি কেরানী হলেও ভদ্রসন্তান এবং প্রায় সকালেই শিক্ষিত, এই কয়দিনেই মহেন্দ্রকে ওরা ভালবেসে ফেলেছে, তার প্রধান কারণ মাধুরী। মেস জীবনে নারীর স্নেহের স্পর্শ কদাচিৎ ঘটে, কিন্তু যদি কোন ভাগ্যবান মেম্বারের ভাগ্যে তা ঘটে তাহলে অপর সকলেরও যে কিছু ভাল হয়, অতল সৈকতে বাড়িবিন্দুর মত, ঈর্ষার সুযোগ এখানেই নেই, অসুয়া এখানে আসে না, অহেতুক অনুরাগ, এ মেসেও তাই ঘটলো। সমবয়সী সকলেই মহন্দ্রেকে নিয়ে বেশ আনন্দের পরিমণ্ডল গড়ে তুললো।
সেদিন মাধুরী এসে ওর ঘরখানাকে সাজিয়েছে চমৎকার করে, আজ আবার শনিবার, সে নিশ্চয়ই আসবে আশা করে মেম্বারগণ যে যতটা সম্ভব শীঘ্র ফিরলে ঐ অপরূপাকে একবার দেখতে পাব।
ঠিক আড়াইটার সময় এলো মাধুরী। হাতে ঘেরাটোপ জড়ানো সেতার। শান্তি নিকেতন ঝোলানো ঝোলানো আরো কতগুলি কি বস্তু। সটান উপরে উঠে গেল একটা চাবি ওর কাছে আছে, ঘর খুললো গিয়ে, জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখবে এবার।
মেসে ছোঁকরা মেম্বার ক’জন তখন কেউ তেলে ভাজা মুড়ি চিবুচ্ছে, কেউবা দু’পয়সার বিস্কুট আর চা খাচ্ছে, একজন খাচ্ছিল কমলালেবু সে মাধুরীকে দেখাতে চায় যে সেই এখানে কমলালেবু খায়, অতএব সে খোসাটাকে ছুঁড়ে ফেললো মহেন্দ্রের ঘরের সম্মুখে, মাধুরী এসে বলল।
–মেস মানে ভেড়ার গোয়াল নয়, ভদ্রলোকের থাকবার আস্তানা।
